সর্বশেষ

ফিচার

১১১ তম মৃত্যু অতল বার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

যুগান্তরের প্রধান নেতা বিপ্লবী বাঘা যতীন

লিটন আব্বাস
লিটন আব্বাস

বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৮:৪৭ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
১. সংস্কৃতিনগরী কুমারখালী। এ মাটির সদাগন্ধে মাতোয়ারা হয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সহ অনেক মনীষীদের আগমন ঘটে এখানে। বাউল সম্রাট লালন শাহ, কথা সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন, গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ঐতিহাসিক ‘গ্রামবার্ত্তা’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার, ওহাবী আন্দোলনের নেতা কাজী মিয়াজান, ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী ও কৃষক প্রজা পার্টির নেতা, অবিভক্ত বাংলার তিনবারের মন্ত্রী মৌলভী শামসুদ্দিন আহমেদ, কবি ভোলানাথ মজুমদার, সাংবাদিক জলধর সেন, কথাশিল্পী আকবর হোসেন, যোবেদা খানম, ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, লোক কবি গগন হরকরা সহ অসংখ্য গুণী মনীষীদের জন্মভূমি। এ নগরীর একটি গ্রাম কয়া। এটি সাধারণ কোন গ্রাম নয়।
বাঘা যতীন

এ গ্রাম জন্ম দিয়েছিল বিট্রিশ বিরোধী যুগান্তরের নেতা বিপ্লবী বাঘা যতীনকে। বালেশ্বরের যুদ্ধ যদি অপরিকল্পিত না হতো, যদি এ যুদ্ধ ব্যর্থ না হতো, বাঘা যতীন যদি তার বিপ্লবী কর্মসূচীর বাস-বায়ন ঘটাতে পারতেন, তাহলে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতে পারতো, যে ইতিহাস হতো বাঘা যতীন নির্ভর। এই মহান বিপ্লবীর জন্ম এই গ্রামে, ১৮৭৯ সালের ৮ ডিসেম্বর। মা শরৎশশী দেবী, বাবা উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন ঝিনাইদহের সাধুহাটির রিশখালি গ্রামের ছেলে। এটি বাঘা যতীনের মামার বাড়ি। কিন্তু, এ বাড়িতেই তিনি জন্মেছেন, বেড়ে উঠেছেন, নিজেকে তৈরি করেছেন। তার ৩৬ বছরের জীবনের জন্মের পর শিশুবয়সে বাবার বাড়িতে কেটেছে মাত্র ৪ বছর। এর পরের জীবন এখানে। তারপর যশোর, চুয়াডাঙ্গা, কৃষ্ণনগর, কলকাতা আরো বিভিন্ন স্থনে। বিপ্লব সফল করার লক্ষে দেশের বাইরেও তিনি ছুটে গেছেন। পড়ালেখা করেছেন কয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, কৃষ্ণনগরের এভি স্কুলে এবং সেন্ট্রাল কলেজে। এ গ্রামের সাথে তার সম্পৃক্ততা ছিল জীবনের সর্বপর্যায়ে। তার মা এখানে থেকেছেন, বোন বিনোদবালা এখানে জন্মেছেন, বড় হয়েছেন। শিক্ষার জন্য, চাকুরির জন্য বাইরে অবস্থন করলেও সময় পেলেই এখানে ছুটে আসতেন। এগ্রামের মানুষকে নিয়ে একটি পরিবারের মতো করে সময় কাটাতেন, ব্রিটিশ তাড়াতে উজ্জীবিত করতেন।এভাবে নিজেও হয়ে উঠেছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে মহীয়সী এক নারী। মা শরৎশশী দেবী যে দৃঢ়তায়বাঘা যতীনকে তৈরি করেছিলেন, সেই একই দৃঢ়তা ছিল বিনোদবালার মধ্যেও। ফলে বিনোদবালা বোন হয়েও বাঘা যতীনের কাছে ছিলেন মায়েরই প্রতিচ্ছবি। এই বোন বাঘা যতীনকে বলতে পেরেছিলেন, ‘সিংহ যেনোপিঞ্জরাবদ্ধ না হয়’।

এই সিংহ ছিল বাঘা যতীন।বাঘা যতীনরা ছিলেন তিন ভাই এক বোন। বড় ভাই খোকাও ছোট ভাই সুরেন্দ্রনাথ দু’তিন বছরের বেশি আয়ু পাননি। তারা এ গ্রামেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন।বিস্ময়কর ঘটনা হলো, এই দু’সন্তানের মৃত্যুর পর কিশোর যতীনকে যেখানে মায়ের আগলে রাখার কথা, এ মা যেন তার উল্টো। দশ বৎসরের শিশু যতীনকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকামী বীরমাতা শরৎশশী দেবীসন্তানকে বলে, “যুদ্ধ কর যতীন! নিজেকে তৈরি কর, তোকে ব্রিটিশ তাড়াতে হবে। ব্রিটিশরা এদেশের মানুষের উপর যে অত্যাচার করছে, এদেশের মানুষকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে, আমাদের শত শত বছর পরাধীন করে রেখেছে, তা থেকে এ দেশকে মুক্ত করতে হবে।’’ সেকারণে শিশু যতীন যখন স্রোতের সাথে যুদ্ধে হাঁপিয়ে উঠলেও মা শরৎশশী দেবী তাকে ক্ষ্যান- দিতেন না।একটু বিশ্রাম করিয়ে নিয়ে আবার স্রোতে নামিয়ে দিতেন : এই হলেন মা। অন্য মায়েরা এই দৃশ্য দেখে বলতেন, চাটুর্জ্জে বাড়ির মেয়ে নিজের ছেলেকে স্রোতে ছেড়ে দিয়ে যে কী পাগলামি করে! আঁচলের গিটটা যদি খুলে যায়, তাহলে এই ছোট্ট ছেলেটার কী হবে! একথা ভেবেই অন্য মায়েদের যখন বুক কেঁপে ওঠার দশা, তখন শরৎশশী হাসতেন, আর বলতেন, ‘‘দেখে নিয়ো একদিন এই জ্যোতিই ব্রিটিশ তাড়াবে। রাতে বিছানায় শুয়ে অন্য মায়েরা যখন ছোট্ট ছেলে- মেয়েকে রূপকথার গল্প শোনাতেন, শরৎশশী দেবী ছোট্ট যতীন আর বিনোদবালাকে শোনাতেন বিপ্লবীদের জীবনকাহিনী। যতীনকে কোলের মধ্যে নিয়ে ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসিদের গল্পের পরিবর্তে কি করে ব্রিটিশদের এ দেশ থেকে বিতাড়িত করা যেত সেই গল্পই করতেন, ‘‘ ওরা হচ্ছে শিয়ালের থেকেও ধূর্ত জাতি। ব্যবসা নামে দেশে দেশে ঢুকে সুকৌশলে সে দেশের সম্পদ লটুতে থাকে বেনিয়ার জাত। যতীন ঘুমিয়ে পড়লে এই মা নিজেও লিখতেন। লিখেছেন ‘শ্মশান,’ ‘সংসার’, ‘স্বামীর স্বর্গারোহন’ কাব্যগ্রন্থ। কবি হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। জ্যোতি’ বাঘা যতীনের ছোটবেলার নাম। মা আদর করে জ্যোতি ডাকতেন, তার বিখ্যাত মামারাও এই নামেই ডাকতেন। জ্যোতি মানে আলো- এমন আলো তিনি ছড়িয়ে গেলেন, যে আলোয় গোটা ভারতবর্ষ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, ছিনিয়ে আনলো...।

২.
যতীন বাড়ির আঙিনায় খেলছে। একটি কুকুর যতীনের কাছে আসতেই ভয়ে মায়ের কাছে দৌঁড়ে এসে যখনই বললো, ‘মা, কুকুর!’ ভয়ে তখনও বাঘা যতীন কাঁপছে। মা তাকে কোলে নিলেন না, আদর করলেন না, কাছেও ডাকলেন না, একটা চ্যালা কাঠ হাতে তুলে দিয়ে ভর্ৎসনা করে বললেন,‘‘ কুকুর দেখে ভয় পাস লজ্জা করে না। ভয়কাতুরে ছেলের মা আমি নই।’’ এই হলেন বাঘা যতীনের মা-এই গ্রামে প্রায় দেড়শ বছরের অধিককাল আগে জন্ম নেয়া অসামান্য সাহসী এক মেয়ে। বাঘা যতীন জীবনে এই একবারই ভয় পেয়েছিলেন। তবে কুকুরটা তিনি মায়ের দেয়া চেলাকাঠ দিয়ে তাড়া করার আগেই পালিয়েছিল। কয়া গ্রামের একজন সাধারণ যতীনের ‘বাঘা যতীন’ হয়ে ওঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার বিখ্যাত মামাদের। কলকাতার গভর্ণমেন্ট পিস্নডার ও কলকাতার ল’ কলেজের প্রফেসর বসন-কুমার চট্টোপাধ্যায়, ডা. হেমন- কুমার চট্টোপাধ্যায়, অনাথবন্ধু চ্যাটার্জ্জি, সুসাহিত্যিক ললিতকুমার চট্টোপাধ্যায় এ বাড়ির সন্তান। বাঘা যতীনের মামা। লেখক ও আইনবিদ ললিতকুমার চট্টোপাধ্যায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাঘা যতীনের পড়ালেখা থেকে শুরু করে বিপ্লবী হওয়ার পেছনে মামারা সবসময় তাকে সহযোগিতা করেছেন। শুধু সহযোগিতা নয় বাঘা যতীনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তাদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছিল। একই আদর্শের ধারক ছিলেন। এ কারণে মামাদের জেল খাটতে হয়েছে, ব্রিটিশ সৈন্যদের কাছে নির্যাতিত হতে হয়েছে। তবুও বাঘা যতীনের প্রতি বিন্দুমাত্র স্নেহ-মমতা কমেনি, মামারাও চেয়েছিলেন, তাদের এই ভাগ্নে পরাধীন ভারতবর্ষকে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীন করবে। কয়া গ্রামে বিখ্যাত মামাদের বাড়ি ছিল বাইশ বিঘা জমির উপর। এই বাড়িটি ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এক দূর্গভূমি।

৩. সাহসী ও মানবিক যতীন বৃদ্ধা মহিলা ধানের বোঝা মাথায় নিয়ে রাসত্মা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে । যতীন সে পথ দিয়ে যেতে যেতে বৃদ্ধা মহিলার মাথা থেকে ধানের বোঝা নিজের মাথায় নিয়ে হাঁটা শুরু করল। বৃদ্ধা মহিলা তার পিছু পিছু হেঁটে যায়। একবার কয়া গ্রামের জঙ্গলে বাঘ ঢুকেছে বলে কছু লোকজন এদিক ওদিক ‘বাঘ-বাঘ’ বলে চিৎকার করতে করতে ছোঁটাছুঁটি করতে থাকে। লোকজনের চোখে মুখে আতংক-গ্রামের জঙ্গলে বাঘ এসেছে বলে।যতীন ছোরা নিয়ে, ‘কোথায় বাঘ?’ বলে একাই ছুটতে থাকে জঙ্গলের দিকে। এই্ যতীন বাঘ মেরেই ‘বাঘা’ উপাধি পেয়েছিলেন। কয়া গ্রামে বাঘ মেরে গোটা ভারতবর্ষে রীতিমতো হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। বাঘের সাথে লড়াই করে নিজেও ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিলেন। তার ডান পা কেটে ফেলার সিদ্ধান-ও নিয়েছিলেন ডা. সুরেশ সর্বাধিকারী। কিন' মেজো মামা ডা. হেমন-কুমার বললেন, যতীনের প্রচুর প্রাণশক্তি আছে। ওর পা কাটতে হবে না। ও সুস' হয়ে উঠবে। উঠলেনও তাই। ছ’মাস ক্রাচে ভর করে হাঁটলেন, তারপর ধীরে ধীরে সুস' হয়ে উঠলেন। ডা. সুরেশ সর্বাধিকারী তাঁর অবিশ্বাস্য এই কৃতিত্ব নিয়ে লিখলেন ‘দি নেমরুড বেঙ্গুলি’। সুরেশ সর্বাধিকারী আদর করে তাকে উপাধি দিলেন ‘বাঘা’ শব্দটি। প্রবন্ধটি প্রকাশের পর গোটা ভারতবর্ষ নড়ে উঠলো। পরাধীন ভারতের যুবসমাজ তেজোদীপ্ত হয়ে উঠলো, তারা বলতে লাগলো, আমরা বাঘ মারতে পারলে ব্রিটিশও মারতে পারবো। বিপ্লবে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা। এখানে একটি তথ্য  উল্লেখ করা দরকার, কয়া এলাকার মানুষ এ ঘটনার পর যতীনকে ‘বাঘা যতীন’ উপাধি দেন। উল্লেখ্য বাঘা যতীন চুয়াডাঙ্গায়ও একটি বাঘিনী মেরেছিলেন। সেই বাঘিনীর দুটি বাচ্চা অনেকদিন তিনি নিজ বাড়িতে রেখেদিয়েছিলেন। আবার অন্যদিকে যখন একটি পাগলা ঘোড়া রাসত্মায় শিশুটির  দিকে তেঁতে আসছে। যতীন সেটা দেখে। পাগলা ঘোড়াটিকে দাবড়িয়ে বশীকরণ করে। অবশেষে শিশুটির জীবন রক্ষা পায়। আবার যখন বাঙালি মেয়েরা স্টেশন দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল ব্রিটিশদের মধ্যে একজন বাঙালি মেয়েদের দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটতে দেখে ব্রিটিশ রাজপুত্রকে ঠাস ঠাস করে চড় মারেন। ব্রিটিশ সৈন্যরা যতীনের দিকে এগিয়ে আসলে তিনি একাই তাদের পেটাতে শুরু করে এবং আহত সৈন্যদের ঘোড়া গাড়িতে চড়িয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিলেন। শিলিগুঁড়ি রেল স্টেশনে একবার তিনি ব্রিটিশের এক লেফটেন্যান্ট ও চার গোরা সৈন্যকে একাই পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন। এ জন্য মামলা হয়েছিল। বাঘা যতীনকে ডেকে মি. হুইলার পুরো ঘটনা জানতে চান। বাঘা যতীন ঘটনাটি বলার পর হুইলার বললেন, ‘তুমি ক’জনের সাথে লড়তে পারো?’ যতীন তার  উত্তরে দৃঢ়চিত্তে স্পষ্টভাবে বললেন, ‘আমি লোলোক একজনের সাথেও লড়তে পারি না।’ এরপর বাঘা যতীনের উপর হুইলারের ভালোবাসা আরো বেড়ে যায়। এ ঘটনার সময় তিনি বঙ্গীয় সরকারের অধীনে চাকরি করতেন। মিস্টার হুইলার ছিলেন বঙ্গীয় সরকারের প্রধান। দেশের স্বাধীনতার জন্য বাঘা যতীন গোপনে
গোপনে বিপ্লবী হতে শুরু করেন।


যতীন ইতোমধ্যে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলেছে তা তার পরিবার জানতে পারে। যতীন পরিবার থেকে বিদায় নেওয়া শুরু করে। তার স্ত্রীর চোখ দিয়ে অবিরাম ফোটা ফোটা জল গড়ায়। দুই ছেলে মেয়ে মুখের দিকে তাকায় যতীন। ঘর থেকে বের হয়ে আসে। সে সময় বোন বিনোদবালা ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে যতীনকে বলে,‘ ব্রিটিশদের হাতে তুমি ধরা পড়, সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুকে বেছে নাও, কিন্তু ওদের বন্দিত্ব তুমি শিকার করবে না। ’ যতীনের স্বাধীনতাকামী চোখ কোটর থেকে যেন ফুটে বের হয়ে আসলো। বাড়ির আঙিনা থেকে হাঁটা শুরু করলেন তিনি। ছোট্ট মেয়েটি দৌড়ে ‘বাবা-বাবাৎ বলে ডাকতে ডাকতে যতীনের কাছে ছুঁটে গিয়ে কোলে চড়ে বসে। যতীন মেয়েটিকে কোলে তুলে নেয়। মেয়েটিকে শেষবার আদর করেন। তারপর বউয়ের দিকে তাকান। বউ তখনো কাঁদছে নিরবেই। বোনের চোখে কোনরকম জল না থাকলেও স্পষ্ট প্রতিবাদী কন্ঠস্বর কাঁপিয়ে দেয়। বিনোদবালার এ কথার মধ্যে স্বা্ধীনতার স্বপ্ন স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, এই হলেন বিনোদবালা, এই হলো কয়া গ্রামের মেয়ে। এরকম একটি বোন বাঘা যতীন পেয়েছিলেন বলেই তার বিপ্লবী হয়ে ওঠা অনেকখানিই সহজ হয়ে গিয়েছিল।

৫.
কয়েকজন ব্রিটিশ সৈন্য ও কয়া বাজারের কিছু নিরীহ কৃষকদের ব্রিট্রিশ সৈন্যরা বলপূর্বক তাদের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার আহবান জানায়। ভয়ে নিরীহ কৃষকরা দৌড়ে পালায়। ব্রিট্রিশ সৈন্যরা ২/৩জন নিরীহ গোবেচারা কৃষককে ধরে নিয়ে এসে জোর পূর্বক তাদের সঙ্গে পাঞ্জা খেলায়। একজন বাঙালি একজন ব্রিটিশদের সঙ্গে পাঞ্জা খেলতে গিয়ে হাত ভেঙে যায়। ব্রিটিশ সৈন্যরা বীরদর্পে হাসাহাসি করতে থাকে। খবর পেয়ে যতীন কলকাতা থেকে কয়ায় চলে আসেন। ছদ্দবেশে ইংরেজদের আহবান জানান পাঞ্জা লড়বার। কেননা যতীন যে ইতোমধ্যে বিপ্লবী
সংগঠন গড়ে সারা ভারতবর্ষের বিপ্লবীদের একত্রিত করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। কয়েকজন ব্র্রিটিশ সৈন্য,বাজারের লোকজন এবং ছদ্দবেশী যতীন। বিট্রিশদের সাথে পাঞ্জা লড়বেন এ খবর বাজারে চাউর হয়ে গেছে যে একজন বাঙালির সঙ্গে ব্রিটিশদের পাঞ্জা খেলা হবে। ব্রিটিশ সৈন্যরা হাসতে হাসতে বাজারে চলে আসে। শুরু হয় পাঞ্জা খেলা। ছদ্দবেশী বাঘা যতীন একাই চার/পাঁচজন বিট্রিশের পাঞ্জার মাধ্যমে হাত ভেঙে দেয়। ব্রিটিশ সৈন্যরা ভয়ে পালিয়ে যায়। যতীন তাদের উদ্দেশ্য বলে, ‘দ্যা, ব্লাডি বাস্টার্ড.. উড নট কাম দ্যাট আওয়ার কয়া.. নেভার এগেইন..’। এ খবর শুনে একজন বিট্রিশ কর্মখর্তা হুইলারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, হি ইজ দ্যাট ক্রিমিনাল, ড্যাম  সিওর যতীন মুখার্জী আর এন্টিস্যোসাল। হি ইজ দ্যাট কিলার। হুইলার তার প্রতিউত্তরে বলেন, দ্যাট ম্যান ওয়াজ কনফিডেনশিয়াল। উই লাভড হিম। বাট হি ওয়াজ ক্রিয়েটেড দ্যা ক্রাইসিস। লেটস গো, সি দ্যা গাই।

৬.
বাঘা যতীন ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরি করে তাদের বিরুদ্ধেই অত্যন- গোপনীয়তার সাথে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। বাঘা যতীন ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের অত্যন- স্নেহের ছিলেন। যখন তারা জেনেছেন, তাদের বিরুদ্ধে যেসব বিপ্লব সংঘটিত হচ্ছে তার মূলহোতা বাঘা যতীন। ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের প্রথমে তা বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু ১৯০৭ সালে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকারি উকিল আশুতোষ বিশ্বাস আলীপুরের আদালত প্রাঙ্গণে খুলনা জেলার শোভনা গ্রামের চারুচন্দ্র বসুর গুলিতে নিহত হলে প্রধান সন্দেহভাজন হয়ে ওঠেন  বাঘা যতীন এবং এ হত্যাকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্তাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হাওড়া মামলায় বাঘা যতীনকে যখন আসামী করা হলো তাকে চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর ছাড়া পেয়ে বিপ্লবী অতুল কৃষ্ণকে দায়িত্ব দিয়ে যশোর চলে আসেন। বিপ্লবীকর্মপন্থা পরিবর্তন করেন তিনি। ১৯০৮ সালে ৩০ এপ্রিল মজঃফরপুরে কিংসফোর্ড সাহেবকে হত্যার জন্য ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্লকুমার চাকী গাড়িতে বোমা মারেন।
ভুলক্রমে বোমাটি মারা হয় মি. কেনিডির গাড়িতে। মানিকতলার ৩২ নং মুরারিপুকুর রোড থেকে ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকীকে কিংসফোর্ডকে হত্যা করার দায়িত্ব দেয়ার আগে বিপ্লবীরা গোপন একটি মিটিং করেন। এ মিটিংএ যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের প্রধান ছিলেন বাঘা যতীন। এ মিটিং থেকেই ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকীকে কিংসফোর্ডকে হত্যা করার দায়িত্ব দেয়া হয়।
এমন একটা সময় ছিলো ভয়ে কেউ বাঘা যতীনের নাম মুখে আনতেন না। শুধু নামই মুখে আনা নয় তার সঙ্গে কারো সম্পর্ক আছে এটা প্রকাশ পেলেও তাকে কঠিন মূল্য দিতে হতো। বাঘা যতীন হয়ে উঠেছিলেন ব্রিটিশদের আতঙ্ক। ব্রিটিশদের সতর্কচোখ তখন খুঁজে বেড়াচ্ছে, বাঘা যতীনের সাথে কার সম্পর্ক আছে? এর খেসারত দিতে হলো বাঙালি খ্যাতিমান বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহাকে। তার পরীক্ষা বাতিল করে দেয়া হলো। মেঘনাদ সাহা এতে কোনো কষ্ট পেলেন না। কারণ পরীক্ষার থেকে বাঘা যতীন ছিলেন তার কাছে এক মহামূল্যবান সম্পদ। গোয়েন্দা বিভাগের ইন্সপেক্টর সামসুল আলম বিপ্লবীদের চরম শত্রুতে পরিণত হয়। বিপ্লবীদের কাজে প্রতি পদে পদে তিনি বাধা তৈরি করতে থাকেন। এ কারণে বিপ্লবীদের সব পরিকল্পনা শুরুতেই ভেসে- যেতে শুরু করে। ফলে বাধ্য হয়ে বিপ্লবীরা তাকে হত্যা করে। বীরেন্দ্রনাথ সামসুল আলমকে হত্যা করলেও পুলিশের অত্যাচারের কারণে তিনি বাঘা যতীনের নাম বলে দেন। ফলে ১৯১০ সালের ২০ জানুয়ারি বাঘা যতীনকে গ্রেফতার করে। একই সাথে তার মামা বিখ্যাত লেখক ললিতকুমারকেও গ্রেফতার করা হয়। বাঘা যতীনকে গ্রেফতার করার পর তার বিপ্লবী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নানা তথ্য উদঘাটনের জন্য তাকে পুলিশবাহিনী লোভনীয় নানা প্রস্তাব দেয়। গ্রেফতারের পর পুলিশ সার্জেন্ট এবং বাঘা যতীন একটি শ্বেত পাথরের টেবিলের দুপাশে বসে মুখোমুখি কথা বলছিলেন। হঠাৎ সার্জেন্ট বাঘা যতীনকে বললেন,‘তুমি যদি সমস- কথা বলিয়া দাও তাহলে ভালো ভালো স্ত্রীলোক পাইবে।’ ‘শার্ট-আপ ইউ রাস্কেল’-বলে ভীষণ চিৎকার করে উঠে বাঘা যতীন টেবিলের উপর প্রচণ্ড ঘুষি মারেন। শ্বেত পাথরের টেবিল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। সার্জেন্ট বাঘা যতীনের অগ্নিমূর্তি দেখে দ্রুত পালিয়ে যান।

৭.
ব্রিটিশ সৈন্যরা গ্রামবাসীকে এই পথ দিয়ে ডাকাত যেতে পারে বলে মিথ্যা তথ্য দিতে থাকে। একশ্রেণীর লোক বাঘা যতীনকে ডাকাত বলে অভিহিত করে। হ্যাঁ, এ কথা সত্য, বাঘা যতীন ডাকাতি
করেছেন। এই ডাকাতি ছিল ‘রাজনৈতিক ডাকাতি’। বিপ্লব পরিচালনা করার জন্য রাজনৈতিক ডাকাতি করেছিলেন তিনি। সেই ডাকাতির টাকার সাথে নিজের টাকা যোগ করে দুঃস্বাহসিক সহকর্মীদের পরিবারের খরচ  যুগিয়েছেন, বিপ্লবের প্রয়োজনে সেই টাকায় সহকর্মীদের দেশের বাইরেও পাঠিয়েছেন। একটি তথ্য মতে, বাঘা যতীন মোট ১২টি রাজনৈতিক ডাকাতি ঘটিয়েছেন। এতে তারা পনের হাজার পাঁচশ নব্বই টাকা লুট করেছিলেন। এই পুরো টাকাই বিপ্লবী কাজে ব্যয় হয়েছিল। এই টাকা ছিল পুঁজিপতিদের। ভারতবর্ষকে মুক্ত করার জন্যই নিরূপায় হয়ে রাজনৈতিক ডাকাতি সংঘটিত করেছিলেন।


৮. বাঘা যতীনের সাথে সর্বপ্রথম বিট্রিশদের সম্মুখ যুদ্ধ
জার্মান থেকে আসা ম্যাভরিক জাহাজে অস্ত্র ও গোলাবারুদ খালাস করবার জন্য যতীন তার চার সহযোদ্ধা নিয়ে গোপনে এসেছিলেন। এই অস্ত্র নিয়ে পরিকল্পিত ভাবে যুদ্ধ করবে বলে। কিন্তুন বিধিবাম। এ ঘটনা বিট্রিশরা জানতে পারে। তারা চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে জঙ্গল। ভারতের কাপ্তিগোদা বালেশ্বরের বুড়িবালাম নদীর চাষখণ্ড জঙ্গলে বাঘা যতীন তাঁর চার সহযোগী কিশোরযোদ্ধা চিত্তপ্রিয়, মনোরঞ্জন,নীরেন ও জ্যোতিষকে নিয়ে শুরু হয় শতশত বিট্রিশ সৈন্যের সঙ্গে মাত্র পাঁচ জন দেশপ্রেমিকের যুদ্ধ। ভীষণ গোলাগুলি শুরু হয়। চিত্তপ্রিয় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থ'লেই মারা যান। বাঘা যতীন বগলে ও পেটে গুলিবিদ্ধ হন। ইংরেজদের হাতে বন্দি হন তারা। বাঘা যতীন(সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তোদের তিনজনকে রেখে যাচ্ছি। তোরা মরবার আগে দেশের লোকদের এই কথাটা ভালভাবে বুঝিয়ে বলিস যে, আমরা কোনোদিনই ডাকাত ছিলাম না। আমরা যে ব্রত নিয়েছি তা আমরা অপূর্ণ রেখে গেলাম। দেশের লোক যেন তার কথা জানতে পারে, যাতে ভবিষ্যৎ-বংশীয়েরা এই অপূর্ণ ব্রতকে পূর্ণ করে তুলতে পারে।’ এই হলো বাস্তবতা। ১৯১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর বালেশ্বরের কাপ্তিপোদায় মাত্র সতের থেকে তেইশ বছরের চার কিশোর যোদ্ধারা হলেন মাদারীপুরের চিত্তপ্রিয়, মনোরঞ্জন ও নীরেন এবং কুষ্টিয়ার জ্যোতিষ -এই চার কিশোর-যোদ্ধাকে নিয়ে সাড়ে চার হাজার ব্রিটিশ সৈন্যের বিশাল বাহিনীর সঙ্গে যে মরণযুদ্ধ করেন, তা ছিল অভিনব এবং ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম সংঘবদ্ধ সম্মুখযুদ্ধ। এই যুদ্ধ ছিল অপরিকল্পিত। পরিসি্থতি তাঁকে এই যুদ্ধে যতোটা ঠেলে দিয়েছিল, তার চেয়ে বড় ছিল ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানো। এবং তাই-ই দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। তিনি জানতেন এতে মৃত্যু অনিবার্য। ইচ্ছে করলে পালিয়ে জীবন রক্ষা করতে পারতেন তিনি। তাঁর সহযোদ্ধারা তাঁকে পালিয়ে জীবন রক্ষা করতে অনুরোধও করেছিলেন। তিনি তা গ্রাহ্য করেননি। মৃত্যু ঈগল পাখির মতো প্রতিমুহূর্তে ছোঁ মারছে জেনেও তিনি বলতে পেরেছিলেন , ‘তোমরা তো আমাকে চেনো, আমি তোমাদের এভাবে ফেলে রেখে চলে যেতে পারি না।’ গুলিবিদ্ধ যতীন সেলাই-ব্যাণ্ডেজ অবস্থয় হাসপাতালে। বাঘা যতীনও ছাড়ার পাত্র নন। পরদিন অর্থাৎ ১০ সেপ্টেম্বর ১৯১৫- আজ থেকে ৯৭ বছর আগের ঠিক এই দিনে টেগার্ট, ডেনহাম, ব্যর্ড, রাদার্সফোর্ড, মেজর ফ্লিথ আসেন হাসপাতালে। মি. আর জি. কিলভি আরো অগেই এসেছিলেন। সার্জনের অনুমতি নিয়ে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী প্রধান টেগার্ট বাঘা যতীনের রুমে ঢোকেন। তাদের দেখে বাঘা যতীন মৃত্যু মুহূর্তে রসিকতা করে বললেন, ‘ গুড মর্নিং মি. টেগার্ট... ...তোমাদের সঙ্গে
দেখা হলো, ভালোই হলো। আমি তো চললাম। এরপরই বাঘা যতীন গম্ভীর হয়ে যান। একটু পরই আবার বললেন,‘আমি চললাম, যারা রইল তারা নিরাপরাধ। আমার দোষেই তারা এভাবে ধরা পড়ল। দেখো, এদের ওপর যেন অন্যায় অত্যাচার না হয়। টেগার্ট বিচলিত হয়ে পড়লেন। বললেন,‘ ‘টেল মি যতীন মুখার্জ্জি, হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ?’ বাঘা যতীন শান্ত-স্বরে উত্তর দিলেন, ‘নো থ্যাঙ্কস! অল’স ওভার. গুড বাই..’ টেগার্টের সামনেই বাঘা যতীন তার নিজের শরীরের সমস্ত- সেলাই টেনে ছিঁড়ে ফেলেন। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে আসে। ডাক্তার-
নার্স ছুটে আসে। আবার ব্যান্ডেজ সেলাই দেয়ার চেষ্টা চলে। কিন্তু তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মহান এই বিপ্লবী গোটা ভারতবর্ষকে কাঁদিয়ে চির বিদায় নেন।

কিন্তু রেখে যান ভারতকে স্বাধীন করার অমূল্য এক মন্ত্রবীজ। টেগার্ট মাথা থেকে ক্যাপ খুলে বললেন, If Jatin were an English Man, Then the English People would have built his statue next to Nelson’s at Trafalgar Square.। বাঘা যতীন অধ্যায় কাপ্তিপোদার যুদ্ধে শেষ হলেও তাঁর আন্দোলন প্রক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতবর্ষে। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হতে থাকে একের পর এক সংঘবদ্ধ সশস্ত্র আক্রমণ। ১৯১৭সালে পাবনার তেলিজানা গ্রামে বিপ্লবীদের সঙ্গে পুলিশের সশস্ত্র আক্রমণ, ১৯১৮ সালে গৌহাটিতে  বিপ্লবীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ১৯৩০ সালে সূর্যসেন-এর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণ, একই বছরে ব্রিটিশ সরকারের আস্তানা রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণ করেন বিনয়, বাদল ও দীনেশ; পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাবে ১৯৩২ সালে ২৩ সেপ্টেম্বর সংঘবদ্ধ আক্রমণ করেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। এসবই সংঘটিত হয়েছিল বালেশ্বরে কাপ্তিপোদায় বাঘা যতীনের দলবদ্ধ যুদ্ধ-প্রেরণায়। কাপ্তিপোদার যুদ্ধের প্রায় ছাব্বিশ বছর পর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বাঘা যতীনের বিপ্লবী কর্মসূচী হুবহু অনুসরণ করে তা আরো সমপ্রসারিত করেছিলেন।

৯. মূল্যায়ন
বাঘা যতীন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ায় সবার চোখে কমবেশী জল লক্ষ্য করা যায়। বাঘা যতীনের সহকর্মী বিখ্যাত বিপ্লবী এম. এন. রায় (মানবেন্দ্রনাথ রায়, স্বদেশী যুগের নরেন্দ্র ভট্টাচার্য) তাঁকে সান্ ইয়াৎ-সেন, লেনিন, ট্রট্স্কি প্রমুখ মহামানবদের উর্ধ্বে স্থন দিয়েছেন। এসব বিশ্বখ্যাত নেতার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসেও তিনি তাঁর একসময়ের নেতা বাঘা যতীনকে ভুলতে পারেননি। তিনি বলেছেন, ‘সান্ ইয়াৎ-সেন, লেনিন, ট্রট্স্কি এঁরা সবাই মহামানব; যতীনদা ছিলেন ভালোমানুষ এবং তাঁর চেয়ে ভালো মানুষ  আমি এখনো খুঁজে পাইনি। কোনো একটি যুগের গণ্ডিতে বাঁধা যায় না যতীনদাকে, তাঁর অন-রের মূল্যবোধ ছিলো ষোলো আনাই মানবীয় এবং ফলত দেশ-কালের সীমানার উর্দ্ধে।’ ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় বাঘা যতীন সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘প্রত্যেক দেশের অবস্থার সহিত সামঞ্জস্য রক্ষা করিয়াই সেই দেশের মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করিয়া থাকেন।..যতীন্দ্রনাথও তেমনি বাংলাদেশে একটি বিশেষ সময়ে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন।’ এ সংখ্যাতেই অন্য একটি প্রবন্ধে হরিকুমার চক্রবর্তীর বক্তৃতার অংশ উল্লেখ আছে এভাবে: ‘যতীন্দ্রনাথকে ব্যক্তিবিশেষ মনে করা ভুল হইবে। রামমোহন হইতে বিবেকানন্দ পর্যন্ত- বাঙালি জীবনে যে ভাবধারা প্রবাহিত হইয়াছিল, যতীন্দ্রনাথ ছিলেন তাহারই প্রতীক।’ বিখ্যাত বিপ্লবী অরবিন্দ বাঘা যতীন সম্পর্কে বলেছেন: ‘তিনি ছিলেন অভিনব ব্যক্তি। মানবতার অগ্রভাগে ছিল তাঁর ঠাঁই; এমন সৌন্দর্য ও শক্তির সমন্বয় আমি দেখিনি, আর তাঁর চেহারাই ছিল যোদ্ধার অনুরূপ।’ বিপ্লবী অতুল কৃষ্ণ বলেছেন, ‘শিবাজীর মতো রণকুশলী ও চৈতন্যের মতো হৃদয়বান একাধারে পেলে আমরা পাই বাঘা যতীনকে।’ বিখ্যাত বিপ্লবী ডা. যাদুগোপালের ভাষায়: ‘বিদেশী এক প্রবল রাজশক্তির বিরুদ্ধে বালেশ্বরের চাষাখন্দের যুদ্ধে ফিরে দাঁড়িয়ে যতীন্দ্রনাথ বীরশ্রেষ্ঠ সেনানায়করূপে যুদ্ধ করে প্রাণ দিতে শিখিয়ে গেলেন।’ বাঘা যতীনকে নিয়ে এরকম মূল্যায়ন আছে অনেক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে নিয়ে ‘অগ্রণী’ শিরোনামে কবিতা লিখেছেন। কেঁদেছেন তার মৃত্যুতে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁকে নিয়ে ‘নব-ভারতের হল্দিঘাট’ কবিতা লিখে জেল খেটেছেন,  বাজেয়াপ্ত হয়েছে তাঁর ‘প্রলয়-শিখা’ কাব্য। নজরুল বাঘা যতীনকে সম্রাট নেপোলিয়নের সাথে তুলনা করেছেন।

বাঘা যতীনকে নিয়ে সেসময় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দৈনিক বাঘা যতীনকে ভারত-স্বাধীনতার ‘পাইওনিয়ার’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ১৯৪৭ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড’ পত্রিকায় বাঘা যতীনকে নিয়ে বিখ্যাত সম্পাদকীয় রচনা করা হয় ‘পাইওনিয়র ও পাইওনিয়র’। দেশের রাজনীতি যখন ক্ষুদ্রস্বার্থে ঘুরপাক খায়, তখন বাঘা যতীনদের কুণ্ঠাহীন দেশপ্রেম থেকে শিক্ষাগ্রহণ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। বাঘা যতীনেরা কখনো ব্যক্তি বা ক্ষুদ্রস্বার্থকে গুরুত্ব দেননি। দেশের বৃহৎস্বার্থ ছিল তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড়। বাঘা যতীন যখন ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার জন্য মৃত্যুকে নিত্যসঙ্গী করে দেশে-বিদেশে বিপ্লব সংগঠিত করছেন, তখন তাঁকে অনেকেই তাঁর স্ত্রী-পুত্র-সংসারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, যতীন তুমি কি পাগল হয়ে গেলে! তোমার স্ত্রী-পুত্র আছে। তোমার কিছু হয়ে গেলে ওদের কি হবে একবার ভেবেছো? সেসব শুনে তিনি হাসিমুখে বলতেন, ‘সমষ্টির হিতকামনায় ব্যক্তিগত স্বার্থ উপেক্ষা করতে হবে।’ বাঘা যতীনের মধ্যে সন্দেহাতীতভাবে যে দেশপ্রেম ছিল এই সময়কালেও তা ভীষণভাবে প্রয়োজন রয়েছে।’ ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষের অগ্নিযুগের মহানায়ক বাঘা যতীন দেশ-কালের উর্ধ্বে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত এক ব্যক্তিত্ব। প্রায় একশ তেত্রিশ বছর আগে জন্ম নেয়া আমাদের এই বিপ্লবী ভবিষ্যৎ- বাঙালির জন্য যে ইতিহাস রচনা করে গেছেন তা বাঙালি হিসেবে আমাদের অহংকারের একটি বড় জায়গা। বর্তমান প্রজন্ম সবসময়ই অতীত অভিজ্ঞতা থেকে নিজস্ব মূল্যবোধ তৈরি করে নেয়। এই মূল্যবোধ তৈরিতে বাঘা যতীনেরা সর্বকালের দেশপ্রেমের আলোকচ্ছটায় হীরকদ্যুতির ন্যায় উজ্জ্বল। বাঘা যতীন নিছক কোনো ব্যক্তি বা সাধারণ মানের কোনো বিপ্লবী ছিলেন না। তিনি ছিলেন অগ্নিকালের প্রতিনিধি। তিনি গোটা ভারতবর্ষের মানুষকে সর্বপ্রকারে মুক্ত করে রাষ্ট্র ও সমাজের হীন দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে অর্থনৈতিক শ্রেণীবৈষম্য দূর করতে চেয়েছিলেন। এ লক্ষেই তিনি বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন বিপ্লবী সংগঠনগুলোকে একত্রিত করে ‘যুগান্তর দল’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অসম সাহসিকতায় নতুন আন্দোলনে রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর আন্দোলনের কৌশল ও দূরদর্শিতাগুণে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। আর তিনি হয়ে ওঠেন সর্বভারতীয় নেতা এবং এম.এন. রায়ের মতে, সম্ভবত তিনিই ভারতের সর্বপ্রথম আধুনিক জাতীয়তাবাদী নেতা। আমরা তাকে আগলে রাখতে পারেনি। কয়া কলেজের নামকরণ বাঘা যতীন কলেজ (বাঘা যতীনের সম্পত্তিতে স্থাপিত) কয়ায় প্রতি বছর জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী রাষ্ট্রীয়ভাবে করতে না পারা, দেশপ্রেমিক বিপ্লবী সন্তানকে অগ্নিযুগের মহানায়করূপে আখ্যায়িত করতে জাতিই ব্যর্থ হয়েছে। যে জাতি তাঁর অতীত ইতিহাস ঐতিহ্যবে প্রাপ্য সম্মান দিকে কৃপণতা করে। অবজ্ঞা ও অবহেলা করে সে জাতির ধবংস অনিবার্য। সে জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস ও মর্যাদা রাখে না। অতীত ইতিহাসকে ছেঁটে ফেললে শেকড়কে সম্মান না করলে জাতির কলংক ঘুচবেনা। 


(২০১৪/ তথ্যসূত্র : ‌‌‌‌সাধক যতীন্দ্রনাথ’;-পৃথীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, বিপ্লবী বাঘা যতীন –ড. রকিবুল হাসান।)

লেখক : নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক।

১৩০ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
ফিচার নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন