সর্বশেষ

সাহিত্য

ধুলোমাটির মহাকাব্য ও ব্রাত্য-বিপ্লবের নন্দনতত্ত্ব: নজরুলের অনির্বাণ অভিজ্ঞান

গাউসুর রহমান
গাউসুর রহমান

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২:৪২ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
নজরুল-পূর্ব বাংলা সাহিত্যের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে ব্রাত্য বা প্রান্তিক মানুষের অবস্থান ছিল বড়জোর করুণার পাত্র হিসেবে। পল্লী-প্রকৃতির মায়ায় কিংবা অভাবের বর্ণনায় তাঁরা এসেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁরা ছিলেন মূলত করুণার উপজীব্য। কিন্তু নজরুল এলেন এক ভিন্ন ধাতুতে গড়া মানুষ হয়ে। তাঁর লেখনীতে ব্রাত্যজনরা কেবল শোষিত বা অবহেলিত চরিত্র হয়ে রইলেন না, বরং আবির্ভূত হলেন ইতিহাসের এক অজেয় ও রুদ্র শক্তি হিসেবে।

গাউসুর রহমান

নজরুলের সাহিত্য পাঠ করতে গেলে প্রথমেই ‘ব্রাত্য’ শব্দটির চিরায়ত অর্থের এক অভিনব রূপান্তর চোখে পড়ে। প্রাচীন শাস্ত্রীয় সংজ্ঞায় ‘ব্রাত্য’ ছিলেন তাঁরাই, যাঁরা আর্য আভিজাত্য ও সংস্কারের গণ্ডির বাইরে ছিটকে পড়েছিলেন। তাঁরা ছিলেন ব্রতচ্যুত, অপাংক্তেয়, এবং সামাজিক পঙ্ক্তি থেকে নির্বাসিত। এক অর্থে তাঁরা ছিলেন ‘অশুচি’। নজরুল এই প্রাচীন ও নেতিবাচক ধারণাকে আমূল বদলে দিলেন। তিনি যেন বলতে চাইলেন, ব্রতচ্যুত মানেই তো মুক্তির আস্বাদ পাওয়া। যিনি কোনো কৃত্রিম শৃঙ্খলে আবদ্ধ নন, তিনিই তো আদি এবং অকৃত্রিম। নজরুলের চোখে ব্রাত্যজন হলেন সভ্যতার সেই মূল কারিগর যাঁদের হাতের পেশিতে কুলি, মজুর, কিষাণ, জেলে আর ডোমের ঘাম লেগে থাকে। যাঁদের শ্রমে আধুনিক অট্টালিকা মাথা তুলে দাঁড়ায়, অথচ ইতিহাসের পাতায় তাঁদের নামটুকু পর্যন্ত সযত্নে মুছে ফেলা হয়।

নজরুলের এই জীবনদর্শনকে যদি আধুনিক সমাজতত্ত্বের আয়নায় দেখা যায়, তবে আন্তোনিও গ্রামশির ‘সাবাল্টার্ন’ বা নিম্নবর্গীয় তত্ত্বের এক আদি সংস্করণ সেখানে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। গ্রামশি বলেছিলেন, নিম্নবর্গের মানুষের নিজস্ব কোনো ইতিহাস লেখা হয় না, কারণ তাঁরা সবসময় শাসক শ্রেণির আধিপত্যের তলায় পিষ্ট হয়ে থাকেন। নজরুল ঠিক সেই কাজটাই করেছিলেন তিনি সেই ‘অধীনস্থ’ বা ‘নিভৃত’ মানুষদের একটি স্বতন্ত্র আত্মপরিচয় ও প্রতিবাদের ভাষা জুগিয়েছিলেন। নজরুলের সাম্যবাদী দর্শনের কেন্দ্রে কোনো বিমূর্ত অর্থনৈতিক ফর্মুলা ছিল না, ছিল জ্যান্ত মানুষের রক্ত-মাংসের হাহাকার। তিনি যখন উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন "মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান" তখন তিনি আসলে হাজার বছরের সমস্ত ধর্মীয় আর সামাজিক শ্রেণিবৈষম্যের ভিত নাড়িয়ে দেন। এই পঙ্ক্তিটি কেবল একটি জনপ্রিয় কবিতা নয়, এটি আসলে এক অমর দার্শনিক ইশতেহার। এটি ইমানুয়েল কান্টের মানবতাবাদের সীমা ছাড়িয়ে এক লৌকিক ও আধ্যাত্মিক ভ্রাতৃত্বের দিকে ধাবিত হয়।


নজরুল যখন ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় চিত্রিত করেন যে, এক বাবু সাহেব রেলে চড়া কুলিকে নিচে ঠেলে ফেলে দিলেন, তখন সেই দৃশ্যটি কেবল একটি বিশেষ ঘটনার স্থিরচিত্র হয়ে থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে পুঁজিবাদের সেই চিরকালীন নিষ্ঠুর নখরের বহিঃপ্রকাশ, যা আজ ২০২৬ সালেও কেবল ছদ্মবেশ বদলে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। আজকের পৃথিবীতে ডিজিটাল ডিভাইড বা প্রযুক্তিগত বৈষম্য এক নতুন ধরনের ব্রাত্য শ্রেণি তৈরি করেছে। যারা হয়তো রেলের কুলি নয়, কিন্তু তারা গিগ ইকোনমির অদৃশ্য শ্রমিক, যারা অ্যালগরিদমের নির্দেশে রাতদিন এক করে কাজ করে যাচ্ছে, অথচ বিনিময়ে পায় না কোনো সামাজিক নিরাপত্তা বা মানসিক আশ্রয়। নজরুলের সেই কুলির আর্তনাদ আজ এই ডিজিটাল শ্রমিকদের দীর্ঘশ্বাসে মিশে গেছে।

নজরুল হয়তো কোনোদিন মার্ক্সীয় তত্ত্বে পাণ্ডিত্যের তকমা লাগাননি, কিন্তু জীবন তাঁকে যে পাঠ দিয়েছিল, তা পুঁথির চেয়ে ঢের বেশি গভীর। তাঁর জীবনলব্ধ অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছিল যে, এক মুঠো ভাতের জন্য যে হাহাকার, তার কোনো সীমানা নেই। তাঁর সম্পাদিত ‘লাঙল’ বা ‘গণবাণী’ পত্রিকার প্রতিটি পৃষ্ঠা ছিল শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের এক একটি রণক্ষেত্র। তিনি বুঝেছিলেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতার চেয়েও বড় স্বাধীনতা হলো মানুষের পেটের ক্ষিধে থেকে মুক্তি এবং আত্মমর্যাদা। উপমহাদেশে যখন স্বাধীনতার সূর্য যখন পশ্চিমের দিগন্তে দেখা দিচ্ছে, নজরুল তখনো চিন্তিত ছিলেন এই ভেবে যে, সাদা চামড়ার প্রভুর বদলে বাদামি চামড়ার কোনো নব্য-সামন্ত এসে সাধারণ মানুষকে আবার গোলাম বানাবে কি না। তাঁর এই দূরদর্শিতা আজ আমাদের সমাজের স্তরে স্তরে সত্যি প্রমাণিত হচ্ছে।

নজরুলের ব্রাত্য ভাবনার সবচেয়ে দুঃসাহসিক এবং বৈপ্লবিক দিক হলো ‘বারাঙ্গনা’ বা তথাকথিত সমাজ-নিষিদ্ধ নারীদের মানবিক অধিকারের স্বীকৃতি দান। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সেই পচা-গলা দ্বিমুখী নৈতিকতাকে তিনি যেভাবে আক্রমণ করেছেন, তা আজও বিস্ময় জাগায়। যে সমাজ দিনের আলোয় নারীদেহকে ঘৃণা করে আর রাতের অন্ধকারে সেখানে গিয়েই তৃপ্তি খোঁজে, সেই সমাজের মুখে নজরুল চড় কষিয়ে বলেছিলেন "কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে দেয় থুতু ও-গায়ে? / হয়তো তোমারি স্তন্য দিয়াছে কোনো এক ঋষি মায়ে।"

এই পঙ্ক্তিটি কেবল আবেগ নয়, এটি একটি সমাজতাত্ত্বিক বিস্ফোরণ। এখানে নজরুল জাঁ-পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদের সেই বিখ্যাত তত্ত্বকেই যেন প্রতিধ্বনিত করছেন যেখানে মানুষের অস্তিত্ব তার অর্জিত পরিচয়ের চেয়ে অনেক বড়। সমাজ যাকে ‘পতিতা’ বলে দাগিয়ে দিয়ে একঘরে করে রাখে, নজরুল তার মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন শাশ্বত মাতৃত্বের সুধা। এই দৃষ্টিভঙ্গি অপরাধতত্ত্বের চিরায়ত পাঠকেও চ্যালেঞ্জ জানায়। নজরুলের কাছে চোর বা ডাকাত জন্মগতভাবে অপরাধী নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার করাল গ্রাস তাদের অন্ধকার পথে ঠেলে দেয়। তাঁর ‘চোর-ডাকাত’ কবিতায় তিনি এক রূঢ় সত্য তুলে ধরেছেন প্রাসাদে বসে যারা রাজকোষ লুণ্ঠন করে, তারা সমাজপতি; আর যে ক্ষুধার জ্বালায় এক টুকরো রুটি চুরি করে, সে অপরাধী! এই চিরন্তন শ্লেষ আজও আমাদের শাসনব্যবস্থার দিকে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন ছুঁড়ে দেয়।


ভাষাশৈলী ও শব্দচয়নের ক্ষেত্রে নজরুল যা করেছেন, তাকে এক প্রকার ‘লিঙ্গুইস্টিক সাবভার্সন’ বা ভাষাগত বিদ্রোহ বলা চলে। নজরুলের আগের বাংলা কাব্যভাষা ছিল মূলত তৎসম শব্দবহুল, একটু বেশিই পরিশীলিত এবং তথাকথিত আভিজাত্যের ভারে ভারাক্রান্ত। নজরুল সেই অভিজাত বলয়কে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিলেন। তিনি বুক ফুলিয়ে বাংলা ভাষার মূল ধারায় জায়গা করে দিলেন আরবি, ফারসি এবং এদেশের মাটির খাঁটি গ্রাম্য শব্দগুলোকে।

যখন তাঁর কবিতায় ‘খুন’, ‘খালাস’, ‘ইনকিলাব’ বা ‘মজিদ’-এর মতো শব্দগুলো রণসংগীতের মতো বেজে ওঠে, তখন তা কেবল শব্দ হিসেবে থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে প্রান্তিক মানুষের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রতীক। এডওয়ার্ড সাইদ বর্ণিত সেই ‘অরিয়েন্টালিজম’-এর আধিপত্যবাদী কাঠামোর বিরুদ্ধে নজরুলের এই শব্দচয়ন ছিল এক প্রবল প্রতিরোধ। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, ধ্রুপদী ছন্দেও প্রান্তিক মানুষের হৃদস্পন্দনকে নিখুঁতভাবে ধারণ করা সম্ভব। তাঁর ভাষার এই অবারিত প্রবাহ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নদী যেমন কোনো বাধা মানে না, মহৎ সাহিত্যও তেমনি নির্দিষ্ট কোনো আভিজাত্যের ছাঁচে নিজেকে আটকে রাখে না।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যখন নজরুল গর্জে উঠেছিলেন, তখন তাঁর শত্রু ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সাম্রাজ্যবাদের রূপ আমূল বদলে গেছে। এখন কোনো ভিনদেশি সেনাবাহিনী এসে দেশ দখল করে না, বরং ডিজিটাল কলোনিয়ালিজম আর অর্থনৈতিক অসমতার জাল মানুষকে এক অদৃশ্য দাসত্বের দিকে ঠেলে দেয়। আধুনিক পৃথিবীতে আজ যে শরণার্থী সমস্যা, যে বর্ণবাদ কিংবা যে চরম জাতিগত বিদ্বেষ আমরা দেখি, তার শ্রেষ্ঠ প্রতিষেধক আজও নজরুলের কবিতাতেই আছে।

তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি কি কেবল ব্যক্তিগত অহমিকার প্রকাশ? একেবারেই নয়। এটি বিশ্বমানবের হয়ে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত হুঙ্কার। "মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত / আমি সেই দিন হব শান্ত, / যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না" এই যে চিরন্তন অঙ্গীকার, এটি ২০২৬ সালের প্রতিটি অধিকারবঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে নতুন করে স্পন্দিত হওয়ার দাবি রাখে। নজরুল ব্রাত্যজনকে কেবল মমতা দেখাননি, তিনি তাদের মধ্যে এক ‘বিদ্রোহী’ সত্তার জন্ম দিয়েছিলেন। তিনি শিখিয়েছিলেন যে, অনুগ্রহের জন্য হাত পাতা নয়, বরং নিজের অধিকারকে বজ্রমুষ্টিতে ছিনিয়ে নিতে হয়।

সাহিত্যিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে নজরুলের ব্রাত্য চেতনার সাথে মিচেল ফুকোর ‘পাওয়ার-নলেজ’ বা ক্ষমতার জ্ঞানতত্ত্বের এক অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়। ফুকো ব্যাখ্যা করেছিলেন, কীভাবে ক্ষমতার কাঠামোগুলো সুস্থতা-অসুস্থতা কিংবা বৈধতা-অবৈধর সংজ্ঞা নিজেদের মতো করে তৈরি করে। নজরুল এই সংজ্ঞায়নের বিরুদ্ধেই আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তথাকথিত সমাজ যাকে ‘পাগল’ বলে, নজরুল তার ভেতরে দেখেন ঐশ্বরিক উন্মাদনা। রাষ্ট্র যাকে ‘বিদ্রোহী’ বা ‘অপরাধী’ বলে কারারুদ্ধ করে, নজরুল তার জবানবন্দিতে খুঁজে পান মহাজাগতিক সত্য।

তিনি যখন জেলের ভেতর বসে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ দেন, তখন তিনি আসলে রাষ্ট্রের সেই জাঁকজমকপূর্ণ মুখোশটিকেই খুলে দেন, যা সত্যকে শৃঙ্খলিত করতে চায়। ব্রাত্যের মুক্তি নজরুলের কাছে কোনো বাহ্যিক পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল এক মানসিক স্বাধীনতা। এক গভীর আধ্যাত্মিক উত্তরণ, যেখানে মানুষ নিজের ক্ষুদ্র অস্তিত্বকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিশালত্বের সাথে মিলিয়ে দেয়।

নজরুলের মহত্ত্বের একটি বড় কারণ হলো তাঁর জীবন আর সাহিত্য ছিল এক সুতোয় গাঁথা। তিনি নিজে দারিদ্র্যের আগুনে পুড়ে সোনা হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ‘দুখু মিয়া’, তিনি ছিলেন রুটির দোকানের সেই সাধারণ কর্মী, আবার তিনি ছিলেন যুদ্ধের ময়দানের সৈনিক। ফলে তাঁর কাব্যে যে প্রান্তিক মানুষেরা ভিড় করে, তারা কেউ কল্পনাবিলাসী ড্রইংরুমের তুলির টান নয়। তারা তাঁর আপনজন। তাঁদের গায়ের ঘামের গন্ধ নজরুল নিজের নাকে নিয়েছিলেন।

সেই কারণেই যখন তিনি লেখেন "রাজার প্রাসাদ মোদের তরে গড়ল যারা কায় / আজো কি তারা পড়বে ধুলোয়, রবে কি অসহায়?" তখন সেই প্রশ্নটি কেবল কাগজে থাকে না, তা তীরের মতো আমাদের বিবেককে বিদ্ধ করে। একবিংশ শতাব্দীর এই তৃতীয় দশকের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও আমাদের রাষ্ট্রকাঠামো এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। নজরুলের সাহিত্যে প্রান্তিক মানুষরা আর কোনো ট্র্যাজিক পার্শ্বচরিত্র নয়, বরং তাঁরাই হয়ে উঠেছেন মূল ইতিহাসের প্রকৃত রচয়িতা।

কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বাংলা সাহিত্যের একজন জনপ্রিয় কবি নন, বরং তিনি ছিলেন এক আলোকবর্তিকা। তিনি এমন এক মহাকাব্য রচনা করেছেন যার কালির নাম শ্রমিকের ঘাম আর যার ছন্দের নাম বিদ্রোহ। তাঁর ব্রাত্য দর্শন কোনো নির্দিষ্ট যুগ বা ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৬ সালের এই অতি-আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতেও যখন আমাদের মানবিক মূল্যবোধগুলো যখন শুকিয়ে যেতে বসেছে, তখন নজরুলের ‘মানুষ’ কবিতাই হতে পারে আমাদের শেষ আশ্রয়।

নজরুল আকাশের নক্ষত্র পেড়ে এনেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেগুলো সাজিয়েছিলেন রাস্তার ধুলোয় পড়ে থাকা মানুষের কুটিরে। তিনি সেই ধ্রুবতারা, যিনি ব্রাত্যজনকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে মাথা উঁচু করে রাজপথ দিয়ে হেঁটে যেতে হয়। এই যে জয়যাত্রা তিনি শুরু করেছিলেন, তা কোনোদিন থামার নয়। তিনি নিজেই তো বলেছিলেন "আসিছে শুভদিন, / ঋণে ঋণে মোরে হয়েছে ঋণী, দিতে হবে সব ঋণ।" ব্রাত্যজনদের সেই শতবর্ষের ঋণ শোধ করার দায়ভার আজ আমাদের প্রজন্মের কাঁধে।

তবে কি আমরা সেই ঋণ শোধ করতে পারব? হয়তো পারব, হয়তো বা এক দিন এই কৃত্রিমতার ধোঁয়াশা কাটিয়ে আমরা আবার মাটির কাছাকাছি ফিরে আসব। নজরুলের সাহিত্য সেই অনিশ্চিত প্রত্যাশারই এক অবিনশ্বর পাথেয়। নজরুলের নাম নিলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক রুক্ষ-কেশ বিদ্রোহী যুবকের ছবি, যার এক হাতে বাঁশের বাঁশরী আর অন্য হাতে রণতূর্য। আর তাঁর পায়ের তলায় ধুলোবালির সেই পৃথিবী, যাকে তিনি ভালবেসেছিলেন সমস্ত হৃদয় দিয়ে। ব্রাত্যের সেই সিংহাসন আরোহণই হলো নজরুলের সাহিত্যের শেষ কথা যেখানে প্রতিটি মানুষ তার নিজের সত্যে হবে অপরাজেয়। যতদিন এই ধরণীতে একজন মানুষও অবহেলিত থাকবে, ততদিন নজরুলের গান বাতাসের আর্তনাদ হয়ে আমাদের ঘুম ভাঙাবে। আর সেই আর্তনাদের ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে আগামীর কোনো এক রাঙা ভোরের স্বপ্ন। কবির সেই চিরকালীন আশাবাদকে মনে রেখেই আজ আমাদের পথ চলা যেখানে ধুলোমাটি আর মহাকাশ এক হয়ে মিলে যায়।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।

১২৭ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০