৯/১১ হামলার ২৫ বছর: যে দিন বদলে যায় বিশ্ব
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:৫০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। নিউইয়র্কের ব্যস্ত কর্মদিবসের স্বাভাবিক সকাল। হঠাৎ ছিনতাই করা দুটি যাত্রীবাহী বিমান আঘাত হানে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে। একই সময়ে আরেকটি বিমান আঘাত করে পেন্টাগনে। চতুর্থ বিমানটি যাত্রী ও ক্রুদের প্রতিরোধের পর পেনসিলভানিয়ায় বিধ্বস্ত হয়। কয়েক ঘণ্টার এই সমন্বিত হামলায় নিহত হন ২ হাজার ৯৭৭ জন। ২৫ বছর পরও ৯/১১ নামে পরিচিত সেই দিনটি বিশ্ব রাজনীতি, নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী নীতির ইতিহাসে এক গভীর ছাপ হয়ে আছে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করা চারটি বাণিজ্যিক বিমান ছিনতাই করেন ১৯ জন আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসী। বিমানগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সমন্বিত হামলা চালানো হয়।
সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১ নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে আঘাত করে। ভবনের ওপরের অংশে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে অনেকে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা মনে করলেও ১৭ মিনিট পর সেই ধারণা বদলে যায়।
সকাল ৯টা ৩ মিনিটে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭৫ সাউথ টাওয়ারে আঘাত করে। এর পর স্পষ্ট হয়ে যায়, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়; যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সমন্বিত হামলা চলছে।
টুইন টাওয়ারে তখন হাজার হাজার মানুষ ছিলেন। হামলার পর অনেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করেন। অন্যদিকে দমকলকর্মী, পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীরা আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন। ৯/১১ মেমোরিয়ালের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার কমপ্লেক্সে আনুমানিক ১৬ হাজার ৪০০ থেকে ১৮ হাজার মানুষ ছিলেন। তাদের বিপুলসংখ্যক নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।
নিউইয়র্কে যখন উদ্ধারকাজ চলছিল, তখন হামলার আরেকটি অংশ ঘটে ওয়াশিংটনের কাছে। সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭৭ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনে আঘাত করে।
এরপর আসে ফ্লাইট ৯৩-এর ঘটনা। ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের এই বিমানের যাত্রীরা অন্য হামলাগুলোর খবর জানতে পেরে বুঝতে পারেন, তাদের বিমানটিও সম্ভবত একটি লক্ষ্যবস্তুর দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কয়েকজন যাত্রী ও ক্রু ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
সকাল ১০টা ৩ মিনিটে পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের কাছে একটি খোলা মাঠে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। ধারণা করা হয়, বিমানটির লক্ষ্য ছিল ওয়াশিংটন ডিসির কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। যাত্রী ও ক্রুদের প্রতিরোধের কারণে বিমানটি নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেনি।
এদিকে নিউইয়র্কে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সকাল ৯টা ৫৯ মিনিটে সাউথ টাওয়ার ধসে পড়ে। এর ২৯ মিনিট পর সকাল ১০টা ২৮ মিনিটে নর্থ টাওয়ারও ধসে যায়।
বিমানের আঘাতে ভবন দুটির কাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। একই সঙ্গে বিমানের জ্বালানি থেকে সৃষ্ট তীব্র আগুন ভবনের কাঠামোকে আরও দুর্বল করে দেয়। শেষ পর্যন্ত টুইন টাওয়ার দুটিই ধসে পড়ে এবং আশপাশের এলাকাজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি হয়।
৯/১১ হামলায় মোট ২ হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন। এর মধ্যে নিউইয়র্কে ২ হাজার ৭৫৩ জন, পেন্টাগনে ১৮৪ জন এবং ফ্লাইট ৯৩-এ ৪০ জন ছিলেন। নিহত ব্যক্তিরা ৯০টি দেশের নাগরিক ছিলেন।
তবে হামলার ক্ষয়ক্ষতি শুধু সেদিনের প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে অংশ নেওয়া বিপুলসংখ্যক উদ্ধারকর্মী, পুলিশ, দমকলকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও অন্য কর্মী পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত সমস্যার মুখোমুখি হন।
৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানও ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানসহ পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে ৯/১১-এর সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয়।
তবে ১১ সেপ্টেম্বরের স্মৃতি শুধু ধ্বংস ও প্রাণহানির গল্প নয়। এটি স্বজন হারানো পরিবারগুলোর বেদনা, মানুষের জীবন বাঁচাতে ছুটে যাওয়া উদ্ধারকর্মীদের দায়িত্ববোধ এবং ফ্লাইট ৯৩-এর যাত্রী ও ক্রুদের সাহসের কথাও মনে করিয়ে দেয়।
আজ নিউইয়র্কের সেই স্থানে টুইন টাওয়ার নেই। সেখানে রয়েছে ৯/১১ মেমোরিয়াল ও মিউজিয়াম। নিহত ব্যক্তিদের নাম দুটি বিশাল স্মৃতিফলকে খোদাই করা হয়েছে।
৯/১১-এর ইতিহাস তাই শুধু কীভাবে হামলা হয়েছিল, তার বিবরণ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হামলার আগের প্রেক্ষাপট, সেদিন মানুষের প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্ব রাজনীতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস।
১১ সেপ্টেম্বর ২০০১-এর কয়েক ঘণ্টা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের পাশাপাশি বদলে দিয়েছিল বিশ্বের নিরাপত্তা, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথ। ২৫ বছর পরও সেই দিনের প্রভাব ও স্মৃতি বিশ্বজুড়ে আলোচিত।
১১৩ বার পড়া হয়েছে