সর্বশেষ

সাহিত্য

কালান্তরের ধ্রুবতারা: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও এক মায়াবী গদ্যের মানচিত্র

গাউসুর রহমান
গাউসুর রহমান

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৬:২৯ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
২০২৬ সালের এই ঝকঝকে সেপ্টেম্বরের সকালে, যখন রোদের রঙে সামান্য বিষণ্ণতা মেশানো থাকে, তখন স্মৃতির গলিঘুঁজি বেয়ে একজন মানুষের কথা খুব মনে পড়ে। তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ক্যালেন্ডারের পাতায় সময় এগিয়ে চলে নিজের নিয়মে, কিন্তু কিছু মানুষের পায়ের ছাপ সময়ের বালুচরে এমনভাবে রয়ে যায় যে, ঢেউ এলেও তা মুছে দিতে পারে না। আজ থেকে কয়েক দশক আগে কলকাতার ফুটপাতে যে তরুণটি বুক পকেটে কবিতার খাতা নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, তিনি কি জানতেন যে একদিন তিনি একাই হয়ে উঠবেন আস্ত একটি প্রতিষ্ঠান? বাংলা সাহিত্যের আকাশে তিনি কোনো ক্ষণস্থায়ী ধূমকেতু ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন এক শান্ত অথচ প্রখর ধ্রুবতারা, যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে অন্তত তিনটি প্রজন্মের আবেগ, প্রেম আর বিদ্রোহ।

গাউসুর রহমান

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মানে কেবল একরাশ বইয়ের নাম নয়, তিনি ছিলেন এক চলন্ত ইতিহাস। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের টালমাটাল সময়টা যখন দাঙ্গা আর রাজনৈতিক অস্থিরতায় থমথমে, তখন একঝাঁক তরুণ শব্দের শরীরে আগুন জ্বালিয়েছিলেন। ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা ছিল সেই আগুনের উৎস। সেখানে সুনীল ছিলেন প্রধান কারিগর। তাঁর সেই সময়কার কবিতা পড়লে আজও মনে হয়, শব্দগুলো যেন জীবন্ত, যেন স্পর্শ করা যায়। তিনি কবিতাকে ড্রয়িংরুমের আভিজাত্য থেকে বের করে নিয়ে এসেছিলেন রাজপথে। চোরবাগানের অন্ধকার গলি, সস্তা মদের দোকান কিংবা ট্রামের ঘড়ঘড়ানি সবকিছুই হয়ে উঠল কবিতার বিষয়। তাঁর লেখায় ছিল এক অদ্ভুত ‘একাকীত্ব’, যা আসলে সমকালীন মানুষেরই মনের প্রতিচ্ছবি। "উত্তরাধিকারের কোনো সত্ত্ব নেই আমার, আমি একাই এসেছি" এই যে দর্পিত উচ্চারণ, এটা কেবল অহংকার ছিল না, বরং ছিল একজন আধুনিক মানুষের নিজের সত্তাকে খুঁজে পাওয়ার আকুতি। এখানে হয়তো কোথাও ফরাসি অস্তিত্ববাদের ছায়া ছিল, কিন্তু তার গন্ধ ছিল এদেশের মাটির।

প্রেমের কথা বললে ‘নীরা’র নাম আসবেই। বাঙালির জীবনে নীরা কোনো রক্ত-মাংসের মানবী মাত্র নয়, সে এক চিরন্তন বিরহ আর স্বপ্নের প্রতীক। দান্তের বিয়াত্রিচ বা জীবনানন্দের বনলতা সেনের মতো নীরাও এক অধরা মায়াবিনী। নীরাকে যখন তিনি বলেন, "তোমার জন্য একশ বছর নীল আকাশ চাই," তখন সেই চাওয়াটা কেবল প্রেমিকের থাকে না, হয়ে ওঠে পৃথিবীর সমস্ত সুন্দরের প্রতি এক গভীর তৃষ্ণা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতিটি পাঠক যখন নীরার কবিতা পড়েন, তখন তাঁরা সেই মায়াবী অবয়বের মাঝে নিজের প্রিয়তমাকেই খুঁজে পান। এই যে ব্যক্তিগতকে সর্বজনীন করে তোলার ক্ষমতা, এটাই তো একজন প্রকৃত সাহিত্যিকের প্রধান পরিচয়।

তবে সুনীলের কলম কেবল কবিতার ছোট আঙিনায় থমকে থাকেনি। তিনি যখন গদ্য লিখতে শুরু করলেন, তখন দেখা গেল তাঁর ভেতরের এক মহাকাব্যিক বিস্তার। তাঁর উপন্যাসের তেরঙা ঝিলিক ‘সেই সময়’, ‘প্রথম আলো’ আর ‘পূর্ব-পশ্চিম’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনটি স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ইতিহাস আর কল্পনার এমন মিশেল খুব কম লেখকের কলমেই ধরা দিয়েছে। ‘সেই সময়’ পড়তে বসলে মনে হয় না যে আমরা কোনো ইতিহাসের বই পড়ছি। উনবিংশ শতাব্দীর কলকাতা, নবজাগরণের জোয়ার, বিদ্যাসাগরের গাম্ভীর্য কিংবা মাইকেল মধুসূদনের সেই অস্থিরতা সব যেন চোখের সামনে চলচ্চিত্রের মতো ভেসে ওঠে। তিনি ইতিহাসকে ধুলোবালি ঝেড়ে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে এসেছিলেন। বড় বড় নামের আড়ালে যে মানুষগুলো রক্ত-মাংসের আবেগ নিয়ে বেঁচে ছিল, তাদের তিনি পরম মমতায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

আবার যখন ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাসের পাতা ওল্টানো হয়, তখন সেখানে দেশভাগের সেই কাঁটাতারের ক্ষত, ভিটেমাটি হারানোর যন্ত্রণা আর শেকড়বিচ্ছিন্ন মানুষের আর্তনাদ সেখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে। কলকাতা আর ঢাকা দুটি শহরই তাঁর হৃদয়ের খুব কাছে ছিল। হয়তো সেজন্যই দুই বাংলার মানুষ তাঁকে নিজের ঘরের লোক বলে মনে করতেন। তিনি জানতেন, ভূগোল মানুষকে আলাদা করতে পারলেও অনুভূতি আর ভাষার টানকে ছিঁড়ে ফেলা অসম্ভব। এই উপন্যাসে তিনি কেবল একটা গল্প বলেননি, একটা জাতির বিবর্তনকে ধরে রেখেছেন নিপুণ হাতে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখক সত্তার মধ্যে এক অদ্ভুত দ্বৈততা ছিল। একদিকে তিনি গম্ভীর ঐতিহাসিক আখ্যান লিখছেন, অন্যদিকে ‘নীললোহিত’ ছদ্মনামে তিনি হয়ে উঠছেন এক ভবঘুরে যাযাবর। নীললোহিত মানেই তো চিরতরুণ এক সত্তা, যার পকেটে টাকা নেই কিন্তু চোখে আকাশ দেখার স্বপ্ন আছে। মধ্যবিত্ত জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে মানুষ বারবার নীললোহিতের কাছে ছুটে গেছে। সে কোনো জটিল তত্ত্ব কথা বলে না, সে কেবল পথ হাঁটতে শেখায়। এই যে ঘরছাড়া হওয়ার এক গোপন বাসনা প্রতিটি মানুষের মনে থাকে, তাকেই প্রশ্রয় দিয়েছেন নীললোহিত। অনেক সময় মনে হয়, নীললোহিত কি আসলে সুনীলের নিজেরই ভেতরের সেই বালকটি ছিল না, যে বড় হতে চায়নি?

ছোটদের জগতেও তিনি ছিলেন একচ্ছত্র সম্রাট। ‘কাকাবাবু’ বা রাজা রায়চৌধুরীকে চেনেন না, এমন বাঙালি কিশোর খুঁজে পাওয়া দায়। শারীরিকভাবে সামান্য সীমাবদ্ধতা থাকলেও তাঁর অদম্য মানসিক জোর আর বুদ্ধির দীপ্তি তরুণদের শিখিয়েছে প্রতিবন্ধকতা কখনো পরাজয় হতে পারে না। কাকাবাবুর অভিযানগুলো কেবল রহস্যের সমাধান ছিল না, তা ছিল ইতিহাসের পাঠ আর অজানাকে জানার এক তীব্র নেশা। ক্রাচ বগলে নিয়ে পাহাড়-জঙ্গল চষে বেড়ানো সেই মানুষটি শিখিয়েছেন যে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো জ্ঞান আর সাহস।

সুনীলের গদ্যশৈলী ছিল একদম ঝরঝরে নদীর মতো। কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোনো শব্দের কচকচানি নেই। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্যের ভাষা হওয়া উচিত মানুষের হৃদস্পন্দনের মতো স্বাভাবিক। তাঁর ছোটগল্পগুলোতে জীবনের এমন সব মুহূর্ত ধরা দিত, যা খুব সাধারণ মনে হলেও তার গভীরতা অনেক। সমাজের উঁচু তলার মানুষের অন্তঃসারশূন্যতা থেকে শুরু করে ফুটপাতে শুয়ে থাকা মানুষের জীবনযুদ্ধ সবকিছুই তিনি দেখেছেন এক নির্লিপ্ত কিন্তু দরদী চোখে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে চলচ্চিত্রের যোগসূত্রটাও বেশ গভীর। সত্যজিৎ রায়ের মতো জহুরি তাঁর গল্পের হিরে চিনতে ভুল করেননি। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ যখন পর্দায় এল, তখন দেখা গেল নাগরিক জীবনের মুখোশ পরা মানুষগুলো বনের অন্ধকারে কীভাবে নিজেদের আসল রূপ বের করে ফেলে। এই মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন সুনীলের লেখনীর এক বড় সম্পদ। তাঁর লেখায় সবসময় এক ধরনের দৃশ্যধর্মিতা থাকে। বর্ণনা পড়তে পড়তে পাঠক নিজেই যেন সেই দৃশ্যের অংশ হয়ে যান।

ব্যক্তিগত জীবনে সুনীল ছিলেন অত্যন্ত উদার আর আড্ডাপ্রিয় মানুষ। তাঁর চারপাশে সবসময় মানুষের মেলা লেগে থাকত। তিনি কেবল লিখতেন না, নতুন লেখকদের উৎসাহিত করতেও পিছপা হতেন না। কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের ছায়ায় নিজেকে বন্দি রাখেননি কোনোদিন, কিন্তু তাঁর কলমে বারবার শোষিত মানুষের গান বেজে উঠেছে। তাঁর কাছে মানবধর্মই ছিল সবার ওপরে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ। আর এই বিশ্বাস থেকেই তিনি লিখে গেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

আজকের এই অতি-যান্ত্রিক যুগে, যখন মানুষের হাতে সময় খুব কম, যখন সোশ্যাল মিডিয়ার নীল আলোয় আমাদের চোখ ক্লান্ত, তখনও কি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রাসঙ্গিক? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে পাঠকদের ভালোবাসায়। আজও যখন কোনো তরুণ প্রথম প্রেমে পড়ে নির্জন দুপুরে নীরাকে চিঠি লেখে, কিংবা যখন কোনো প্রবীণ মানুষ স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে ‘অর্ধেক জীবন’ খুলে বসেন, তখন বোঝা যায় সুনীল মরে যাননি। তিনি বেঁচে আছেন তাঁর প্রতিটি লাইনে, প্রতিটি শব্দে।

তাঁর সাহিত্যের এক বিশেষ গুণ হলো বিষাদ। কিন্তু সেই বিষাদ মানুষকে ভেঙে ফেলে না, বরং তাকে পরিণত করে তোলে। জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে যখন মানুষ পেছনে তাকায়, তখন সেই যে একটা হাহাকার তৈরি হয়, তাকেই তিনি ভাষায় রূপ দিয়েছেন। তাঁর লেখায় প্রকৃতি আর মানুষের সম্পর্ক খুব নিবিড়। সেই যে ঘাসের ওপর শিশির পড়া, কিংবা মেঘলা আকাশে নিঃসঙ্গ চিল উড়া এসবের মাঝে তিনি খুঁজে পেয়েছেন পরম দর্শন।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন সেই আলোকবর্তিকা, যিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মাটির টানে বেঁচে থেকেও নক্ষত্রকে ছোঁয়া যায়। তিনি ছিলেন এক আধুনিক মহাকবি, যাঁর গদ্যও ছিল কবিতার মতো ছন্দময়। বাংলা সাহিত্য যতকাল থাকবে, তিল তিল করে গড়ে তোলা এই শব্দের অট্টালিকা ততকাল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে।

পথ চলতে চলতে মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়াতে হয়। তখন মনে হয়, হয়তো দূরে কোথাও কোনো এক রাস্তার মোড়ে সেই পরিচিত ছাতাটা হাতে নিয়ে নীললোহিত হেঁটে যাচ্ছেন। তাঁর মুখে সেই চিরচেনা হাসি, যেন বলতে চাইছেন "জীবন মানে তো কেবল ফুরিয়ে যাওয়া নয়, জীবন মানে তো এক অন্তহীন যাত্রা।" সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেই যাত্রারই এক চিরকালীন যাত্রী, যিনি আমাদেরও হাত ধরে নিয়ে গেছেন অজানার টানে। তাঁর এই উত্তরাধিকার আমাদের কাছে এক অমূল্য সম্পদ, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আলোর মশাল হয়ে জ্বলবে। বাংলা সাহিত্য তাঁকে মনে রাখবে এক ক্লান্তিহীন পথিকের মতো, যাঁর পদধ্বনি আজও আমাদের হৃদয়ে স্পন্দিত হয়। তাঁর সেই জীবনবোধই যেন আমাদের কানে কানে বলে যায় "মানুষের সবটুকু চেনা যায় না, কিছু অংশ চিরকাল রহস্য হয়েই থেকে যায়।" আর সেই রহস্যের সন্ধানেই তো আমরা বারবার ফিরে যাই তাঁর বইগুলোর পাতায়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এক অমর নক্ষত্রের নাম, যাঁর ছটায় আজও উজ্জ্বল আমাদের চেতনার আকাশ।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।

১২১ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন