মহাপ্রলয়ের শিল্পরীতি: নজরুল-কাব্যের বহুমাত্রিক নন্দনতত্ত্ব ও শৈলী-বুনন
বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৬:৪১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
রবীন্দ্র-উত্তর যুগে যখন কবিতা এক ধরনের সূক্ষ্ম আভিজাত্য, আধ্যাত্মিক মগ্নতা আর নিরাভরণ সৌন্দর্যের সন্ধানে রত, নজরুল তখন সেই পরিমণ্ডলে নিয়ে এলেন মাটির মানুষের ঘাম, রক্ত আর দ্রোহের এক উত্তাল তরঙ্গ। নজরুলের কাব্যের প্রতিটি ইঁট, প্রতিটি সুরের রেশ যেন এক নতুন ব্যাকরণের জন্ম দিয়েছিল, যা সনাতন নিয়মকে অস্বীকার না করেও তাকে এক অভাবনীয় মুক্তি দান করেছে।
নজরুল-কাব্যের এই শৈলীগত অনন্যতা বুঝতে গেলে আমাদের একটু গভীরে ডুব দিতে হয়। কেবল শব্দের ঝংকার নয়, সেই ঝংকারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা যে কারুকলা, তা মিখাইল বাখতিনের ‘বহুস্বরতত্ত্ব’ বা নিৎসের ‘ডায়োনিসিয়ান’ উন্মাদনার কথা মনে করিয়ে দেয়। নজরুলের কাব্যে এই ডায়োনিসিয়ান বা আদিম প্রলয়-উল্লাস এবং অ্যাপোলোনিয়ান বা সুশৃঙ্খল সুষমার এক আশ্চর্য সহাবস্থান দেখা যায়। তিনি একদিকে যেমন প্রলয়ের ধ্বংসকে আহ্বান করেন, অন্যদিকে সেই ধ্বংসের ধূলি থেকেই গড়ে তোলেন এক ধ্রুপদী নন্দনতত্ত্ব।
নজরুলের কবিতার প্রাণস্পন্দন আসলে লুকিয়ে আছে তাঁর ছন্দের সেই জাদুকরী বৈচিত্র্যে। বাংলা কবিতার চলন যেখানে দীর্ঘকাল ধরে এক মন্থর পয়ারের শান্ত নদীতে বয়ে চলছিল, নজরুল সেখানে এনে দিলেন পাহাড়ি ঝরনার অদম্য গতি। তাঁর ছন্দ কেবল কানে শোনার বিষয় নয়, তা রক্তকণিকার ভেতর এক ধরণের রণধ্বনি তৈরি করে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কথাই ধরা যাক। সেখানে তিনি ব্যবহার করেছেন মুক্তক মাত্রাবৃত্ত ছন্দ। কিন্তু সেই ছন্দের বন্ধনহীন চলন কি কোনো নিয়ম মানেনি? মেনেছে, তবে তা এক অলিখিত প্রাণের নিয়ম। প্রথাগত মাত্রাবৃত্তে যে সুনির্দিষ্ট পর্বের ঘেরাটোপ থাকে, নজরুল তাকে বারবার ভেঙেছেন। কেন ভাঙলেন? সম্ভবত তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, যখন কোনো মহান সত্য বা হৃদয়ের গভীর হাহাকার উচ্চারিত হয়, তখন তা কোনো নির্দিষ্ট পঙক্তি-দৈর্ঘ্যের নিগড়ে বন্দি থাকতে পারে না। এখানে ছন্দের এই অনিয়মই হয়ে উঠেছে এক নতুন শৃঙ্খলা। এই যে ছন্দের ভেতর দিয়ে এক ধরণের ‘প্রাণশক্তি’ বা এনার্জি ছড়িয়ে দেওয়া, তা বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আগে আর কারও হাতে এমনভাবে ধরা দেয়নি। এমনকি ‘চল চল চল’ বা ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’-এর মতো কবিতায় তিনি যখন লোকজ স্বরবৃত্ত ছন্দ ব্যবহার করেন, তখন সেই চটুল ছন্দও এক অভাবনীয় গাম্ভীর্যে ভূষিত হয়। স্বরবৃত্তের যে ভঙ্গি আমরা ছড়ায় দেখে অভ্যস্ত, নজরুল তাকে রূপান্তর করলেন যুদ্ধের দামামায়। এই যে শৈল্পিক রূপান্তর এটিই নজরুলের আধুনিকতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
শব্দশৈলী বা ডিকশনের ক্ষেত্রে নজরুল যা করেছেন, তাকে এক অর্থে ‘ভাষাতাত্ত্বিক গণতন্ত্র’ বলা যেতে পারে। বাংলা ভাষা দীর্ঘকাল ধরে যে সংস্কৃতায়ন আর ব্রাহ্মণ্য আভিজাত্যের ঘেরাটোপে বন্দি ছিল, নজরুল তাকে টেনে নিয়ে এলেন সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়। কিন্তু সেই আসাটা দীনতার মধ্য দিয়ে নয়, বরং এক রাজকীয় ঐশ্বর্যের মধ্য দিয়ে। তিনি একই পঙক্তিতে অবলীলায় সাজিয়ে দিলেন ‘কৈলাস’ ও ‘আরশ’, ‘দধীচি’ ও ‘কোরবানি’। ভাষার এই যে মিশ্রণ, এটি কেবল শব্দের খেলা নয়; এটি ছিল এক সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন। মিখাইল বাখতিন যেমন বলেছিলেন, ভাষা সবসময়ই সামাজিক শক্তির দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র নজরুলের শব্দচয়ন সেই তত্ত্বকেই সত্য প্রমাণ করে। ফারসি ও আরবি শব্দকে তিনি বাংলা বাকরীতির এমন গভীরে প্রোথিত করেছেন যে, আজ আর তাদের আলাদা করে চেনা যায় না। তাঁর শব্দগুলো কেবল অর্থ বহন করে না, সেগুলো যেন এক একটি চিত্রকল্প বা ধ্বনিচিত্র হয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যখন তিনি লেখেন ‘মম ললাট-রুদ্র-ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!’, তখন সেই শব্দের গম্ভীর ঝংকার পাঠকের মনে এক অপার্থিব রণধ্বনির সঞ্চার করে। নজরুলের শব্দশৈলীতে এই যে বজ্রের কঠোরতা আর বিকেলের ম্লান আলোর কোমলতা একই সাথে বাস করে, এটাই তাঁর কাব্য-আঙ্গিকের শ্রেষ্ঠ কারুকাজ।
নজরুল-কাব্যে পুরাণের ব্যবহার বা ‘মিথ-মেকিং’ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গভীর ও বহুমাত্রিক। তিনি ছিলেন এক সার্থক সমন্বয়বাদী শিল্পী। তাঁর কাব্য-ভুবনে একদিকে যেমন বৈদিক ও পৌরাণিক অনুষঙ্গ উপস্থিত, অন্যদিকে তেমনি ইসলামি ঐতিহ্যের বীরত্বগাথাও সমান তেজে দীপ্যমান। এই দুই ভিন্ন মেরুর ঐতিহ্যের মিলন ঘটিয়ে তিনি এক নতুন ‘সিনক্রিটিক’ বা সমন্বিত আঙ্গিক নির্মাণ করেছেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সেই অমর পঙক্তি ‘আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার, / নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!’ এখানে পরশুরামের ধ্বংসাত্মক রূপ আর শান্তির স্নিগ্ধ আকাঙ্ক্ষা এক অদ্ভুত সমান্তরালে এসে দাঁড়িয়েছে। নজরুলের এই পুরাকল্প নির্মাণ কেবল ইতিহাসের পুনরুক্তি নয়, বরং তা ছিল তৎকালীন ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভাঙার এক আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক হাতিয়ার। তাঁর কবিতায় প্রকৃতিও নিছক সুন্দরের শান্ত আধার হয়ে থাকেনি; তা হয়ে উঠেছে প্রলয় ও বিপ্লবের রূপক। সুন্দরের চেয়েও তিনি যেন বেশি ভালোবেসেছিলেন ‘ভীষণ’কে। কালবৈশাখীর উন্মাদনা, মরুভূমির দাবদাহ এসবই তাঁর কবিতায় মানবের মুক্তির প্রতীক হিসেবে ধরা দেয়। এডমন্ড বার্কের ‘সাবলাইম’ বা মহত্ত্বের যে ধারণা, নজরুলের চিত্রকল্পে সেই বিশালতা বারবার ফিরে আসে।
সংগীতধর্মিতা নজরুলের কবিতার এক অবিচ্ছেদ্য এবং প্রাণভোমরা সমতুল্য অঙ্গ। তিনি কেবল শব্দ সাজাতেন না, তিনি শব্দের ভেতরে সুরের বীজ বুনে দিতেন। তাঁর কবিতার আঙ্গিক কাঠামোতে গানের প্রভাব অত্যন্ত নিবিড়। পারস্যের গজল ও রুবাঈর যে সূক্ষ্ম কারুকাজ, তা নজরুলের হাতে এক নতুন প্রাণ পেয়েছে। অনুপ্রাস, যমক আর শ্লেষের এমন নিপুণ ব্যবহার তাঁর কবিতাকে যেন এক একটি সুরেলা ভাস্কর্যে পরিণত করেছে। নজরুলের কবিতায় এক ধরণের ‘লিরিক্যাল ইনটেনসিটি’ বা গীতিময় তীব্রতা সবসময় বর্তমান। ‘চৈতি হাওয়া’ কিংবা ‘অভিশাপ’ কবিতাগুলোর দিকে একবার তাকালে দেখা যায়, সেখানে শব্দের বুনন এমনভাবে করা হয়েছে যে, পাঠ করার সময় আপনা থেকেই এক সুরের আবহ তৈরি হয়। টি. এস. এলিয়ট বলেছিলেন, প্রকৃত কবিতায় শব্দ ও অর্থের বাইরেও এক ধরণের সুরের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ থাকে। নজরুলের কবিতায় সেই সুরের রাজকীয় উপস্থিতি অস্বীকার করার উপায় নেই। এই সুরময়তাই তাঁর কাব্যের কঠোরতাকে এক ধরণের মায়াবী কমনীয়তা দান করে।
কবিতার অবয়ব ও গঠনতান্ত্রিক নিরীক্ষায় নজরুল ছিলেন এক আধুনিক স্থাপত্যের দক্ষ নির্মাতা। তিনি প্রথাগত স্তবক বিন্যাসের প্রথা ভেঙে মুক্তক পঙক্তিমালার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। তাঁর দীর্ঘ কবিতাগুলোর গঠন অনেক সময় ‘ড্রামাটিক মনোলগ’ বা নাটকীয় স্বগতোক্তির রূপ নেয়। এখানে কবি সরাসরি পাঠককে বা কোনো এক কাল্পনিক অতিমানবিক সত্তাকে সম্বোধন করেন, যা পাঠের সময় এক ধরণের থিয়েট্রিক্যাল বা নাট্যগুণ তৈরি করে। যেমন ‘বল বীর / বল উন্নত মম শির!’ এই আহ্বান সরাসরি এবং অত্যন্ত শক্তিশালী। নজরুলের সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতাগুলোর গঠনশৈলীও অত্যন্ত সুসংহত হলেও তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব সম্ভবত সেই দীর্ঘ আখ্যানধর্মী কবিতাগুলোতে, যেখানে তিনি মহাকাব্যিক গাম্ভীর্য ও গীতিধর্মিতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। ‘সিন্দুপার’ বা ‘খেয়াপারের তরণী’ কবিতায় যে রহস্যময়তা আর আধ্যাত্মিক গভীরতা ফুটে উঠেছে, তার মূল ভিত্তি হলো এর সুশৃঙ্খল ও নিপুণ গঠনকাঠামো। এখানে কবিতার আঙ্গিক কেবল অলংকার নয়, বরং তা ভাব প্রকাশের এক অপরিহার্য বাহন।
নজরুল-কাব্যের রসতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি ভারতীয় রসতত্ত্বের ‘বীর রস’, ‘করুণ রস’ এবং ‘শৃঙ্গার রস’-এর এক অদ্ভুত সংশ্লেষণ ঘটিয়েছিলেন। সাধারণত বীর রস ও করুণ রসকে বিপরীতধর্মী মনে করা হয়, কিন্তু নজরুলের হাতে তারা হয়ে উঠেছে একে অপরের পরিপূরক। তাঁর কবিতায় ধ্বংস ও সৃষ্টি একই মুদ্রার দুই পিঠের মতো। নিৎসের দর্শন যেমন বলে ধ্বংসই হলো নতুন সৃষ্টির পূর্বশর্ত, নজরুল ঠিক সেই দর্শনকেই নিজের হৃদয়ের রসে সিক্ত করে কবিতায় রূপ দিয়েছেন। যখন তিনি লেখেন ‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? -প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!’, তখন তিনি মূলত জীবনের এক পরম সত্যকেই শৈল্পিক রূপ দান করেন। এই যে বৈপরীত্যের মিলন, এটাই নজরুলের কাব্য-দর্শনের মূল চাবিকাঠি। তাঁর কাব্যে একদিকে যেমন আছে ‘বাঁকা বাঁশের বাঁশরী’, অন্যদিকে আছে ‘রণতূর্য’। এই দুই আপাতবিরোধী অনুষঙ্গের একই আধারে অবস্থান নজরুলের কাব্য-কাঠামোকে এক অনন্য দ্বান্দ্বিক গভীরতা দান করেছে।
নজরুলের শৈলীগত বৈশিষ্ট্যের অন্যতম দিক হলো তাঁর অলংকার প্রয়োগের অভিনবত্ব। তিনি প্রথাগত উপমা বা রূপকের ধার ধারতেন না অনেক সময়। তার বদলে এমন সব চিত্রকল্প ব্যবহার করতেন যা সরাসরি মানুষের ইন্দ্রিয়কে আঘাত করে। তাঁর অলংকারগুলো কখনোই কেবল বাহ্যিক সজ্জা হয়ে থাকেনি, বরং তা কবিতার মূল সুরকে আরও তীব্রভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন’ এই একটি পঙক্তির মধ্যে যে বৈপরীত্যের অলংকার ব্যবহৃত হয়েছে, তা একাধারে গভীর আধ্যাত্মিক এবং শৈল্পিক ব্যঞ্জনা বহন করে। নজরুলের কবিতায় যে ‘হাইপারবোল’ বা অতিশয়োক্তির আধিক্য অনেক সময় সমালোচিত হয়, তা আসলে তাঁর বিদ্রোহী সত্তারই এক স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ। যখন তিনি নিজেকে ‘বিশ্বরূপ’ বা ‘মহাপ্রলয়ের নটরাজ’ হিসেবে কল্পনা করেন, তখন সেই অতিকথন কেবল কল্পনা থাকে না, তা হয়ে ওঠে কবির সেই অসীম আত্মশক্তির প্রকাশ যা সমস্ত জাগতিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে চায়।
নজরুলের কাব্য-আঙ্গিকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর দৃশ্যগত বিন্যাস। নজরুলের অনেক কবিতায় পঙক্তির দৈর্ঘ্য ও বিন্যাস এক ধরণের অস্থিরতা ও চাঞ্চল্য প্রকাশ করে। এটি আধুনিক কবিতার সেই বৈশিষ্ট্যের সাথে সংগতিপূর্ণ যেখানে শব্দ কেবল কানে শোনার নয়, বরং তা চোখে দেখার শিল্প হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করে। নজরুলের কবিতার এই স্থাপত্যশৈলী পরবর্তীকালে জীবনানন্দ দাশ বা বুদ্ধদেব বসুর মতো আধুনিক কবিদের জন্য এক ধরণের অদৃশ্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। যদিও তিরিশের কবিরা নজরুলের এই চড়া সুর ও আবেগকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁরাও নজরুলের শব্দশৈলী ও আঙ্গিকগত এই মুক্তিকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারেননি। নজরুলের মিশ্র শব্দশৈলী এবং ছন্দের মুক্তিই মূলত আধুনিক বাংলা কবিতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
নজরুলের কাব্য-শৈলীর গভীরে এক ধরণের ‘কার্নিভালেস্ক’ চেতনা কাজ করে। কার্নিভালে যেমন উচ্চ-নিচ, পবিত্র-অপবিত্রের ভেদাভেদ ঘুচে যায়, নজরুলের কবিতাতেও তেমনি আভিজাত্য ও প্রান্তিকতার এক পরম সমন্বয় ঘটে। তিনি মন্দির ও মসজিদের দেয়াল ভেঙে দিয়ে মানুষকে সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। তাঁর কবিতার আঙ্গিকগত এই উদারতা মূলত এক গভীর দার্শনিক অবস্থানের প্রতিফলন। তিনি যখন ‘মানুষ’ কবিতায় লেখেন ‘গাহি সাম্যের গান / মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!’, তখন সেই সাম্য কেবল ভাবের স্তরে থাকে না, তা কবিতার ভাষিক ও কাঠামোগত স্তরেও প্রতিফলিত হয়। শব্দ চয়ন থেকে শুরু করে ছন্দ সবখানেই এই সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান।
নজরুলের কবিতার শরীরী গঠন বিশ্লেষণ করলে আমরা এক ধরণের ‘সিনেস্থেশিয়া’ বা ইন্দ্রিয়জ অনুভূতির বিনিময় লক্ষ্য করি। তাঁর শব্দগুলো পড়লে মনে হয় তারা যেন চোখের সামনে নৃত্য করছে কিংবা কোনো অদৃশ্য বাদ্যযন্ত্রে বেজে উঠছে। এই যে বহুমাত্রিক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা, এটিই নজরুলের শৈলীকে এক রাজকীয় স্বকীয়তা দান করেছে। তাঁর কবিতা কেবল পাঠ করার বিষয় নয়, তা অনুভব করার এবং দেখারও বিষয়। নজরুলের এই শৈল্পিক সিদ্ধি তাঁকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অমর স্থপতির মর্যাদা দিয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, মহৎ শিল্প কেবল সূক্ষ্ম কারুকাজে নয়, বরং তা হৃদয়ের প্রবল আকুতি আর শৈল্পিক সততার সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়।
এখানে একটি প্রশ্ন জাগতে পারে নজরুলের এই যে রুদ্র রূপ, তার আড়ালে কি কোনো গোপন কোমলতা ছিল না? অবশ্যই ছিল। নজরুলের স্থাপত্যশৈলী যেমন বজ্রের মতো কঠোর হতে জানে, তেমনি তা ভোরের শিশিরের মতো নমনীয় হতেও জানে। তাঁর প্রেমের কবিতাগুলোতে যে করুণ রস ও বিষাদের ছায়া দেখা যায়, তা নজরুলের শিল্পীসত্তার অন্য এক দিক উন্মোচিত করে। সেখানে তিনি আর রণতূর্য বাজান না, বরং একাকী বনের ছায়ায় বসে বিরহী বাঁশি বাজান। কিন্তু সেই কোমলতার মধ্যেও এক ধরণের ঋজুতা থাকে, যা নজরুলের নিজস্ব স্বাক্ষর। তাঁর কাব্য-স্থাপত্যের বিশালতা এখানেই যে, তা একই সাথে প্রলয় এবং প্রেমকে ধারণ করতে পারে।
অনেকে মনে করেন, নজরুলের কবিতা কেবল সাময়িক উত্তেজনা বা বিপ্লবের রসদ। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তাঁর কবিতার আঙ্গিকগত এই বিদ্রোহ আসলে এক ধরণের শাশ্বত আধুনিকতা। তিনি বাংলা কবিতার যে জট খুলে দিয়েছিলেন, তা আজও আমাদের মুক্তির পথ দেখায়। তাঁর প্রবর্তিত ছন্দ, শব্দশৈলী এবং গঠনতান্ত্রিক আধুনিকতা আজও সাহিত্যের আকাশে এক ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করছে। নজরুলের কাব্য-স্থাপত্য হলো এমন এক ইমারত, যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছে ঐতিহ্যের মাটিতে, কিন্তু যার চূড়া স্পর্শ করেছে অসীম আকাশকে। তিনি ছিলেন সেই মহাকবি, যিনি ধ্বংসের গান গেয়ে সৃষ্টির পথ উন্মোচন করেছিলেন।
নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’র ঝংকার তাই কেবল ১৯২২ সালের কোনো ক্ষণস্থায়ী ধ্বনি নয়, তা হলো কালান্তরের এক বিদ্রোহী সুর। এই সুর আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের আত্মা অজেয়। নজরুলের শৈলীগত এই বৈপ্লবিকতা কেবল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেই নয়, বরং বিশ্বসাহিত্যের আঙিনাতেও এক অনন্য সংযোজন হিসেবে চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবে। তাঁর কাব্য-শৈলী নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বারবার মনে হয়, তিনি যেন এক বিশাল সমুদ্রের মতো, যার ওপরের ঢেউগুলো উত্তাল ও ফেনিল, কিন্তু যার গভীর শান্ত এবং মণিমুক্তায় খচিত।
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার আঙ্গিক কাঠামো ও শৈলী কেবল ব্যাকরণের শুকনো কচকচি নয়, বরং তা ছিল একটি ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তোলার এক প্রলয়ংকরী মন্ত্র। তিনি বাংলা কবিতার দেহসৌষ্ঠবকে মুক্তি দিয়েছিলেন দীর্ঘদিনের আড়ষ্টতা ও একঘেয়েমি থেকে। তাঁর এই শৈল্পিক উত্তরাধিকারকে ধারণ করেই আধুনিক বাংলা কবিতা সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। নজরুলের কাব্য-সৌধ তাই কালজয়ী, অজেয় এবং চিরন্তন। মানুষের মুক্তি ও সাম্যের যে গান তিনি গেয়েছিলেন, তা আজও প্রতিটি স্বাধীনতাকামী মানুষের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। কবির সেই রণতূর্য আজও থামেনি; তা বেজে চলেছে সময়ের প্রতিটি বাঁকে, আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে বিদ্রোহের শেষ নেই, সংগ্রামের বিরতি নেই, আর শিল্পেরও কোনো সীমানা নেই। নজরুল ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন এক রুদ্র সুন্দরের অমর শিল্পী হিসেবে।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
১২৪ বার পড়া হয়েছে