সর্বশেষ

সাহিত্য

সাহিত্যে নৈতিকতা

লিটন আব্বাস
লিটন আব্বাস

মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:১৩ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
নৈতিকতা মানুষের চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভিত্তি। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় জীবন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, সততা এবং অন্যায়- অত্যাচারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হওয়া সভ্য সমাজ গঠনের প্রথম ও প্রধান পূর্বশর্ত। সমাজ, রাষ্ট্র যে পর্যায়েই থাকুক না কেন, নাগরিকদের সার্বিক নৈতিকতা যদি সুশৃঙ্খল ও দৃঢ় না হয়, তবে কোনো জাতির প্রকৃত ও টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। শিক্ষক, চিকিৎসক, বিচারক, রাজনীতিবিদ কিংবা ব্যবসায়ী—প্রতিটি পেশা ও শ্রেণীর মানুষের জন্যই নৈতিক মূল্যবোধ অপরিহার্য। তবে সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্র অপেক্ষা সাহিত্যে নৈতিকতার ভূমিকা আরো গভীরে বিস্তৃত; কারণ সাহিত্য কেবল কোনো পেশা ও বিনোদন নয়, সাহিত্য হলো সমাজ ও দেশের সত্যের সেতু যাতে প্রতিফলিত হয় মানুষের আসল মুখের ছবি।
লিটন আব্বাস

—ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আদিকাল থেকেই সাহিত্য নৈতিক মূল্যবোধ গঠন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় রূপক সাহিত্য যেমনঃ গ্রিসের ঈশপের গল্প এবং ভারতের পঞ্চতন্ত্র-এর মাধ্যমে রূপক গল্পের ছলে সমাজের মানুষকে সততা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও ন্যায়ের পাঠ দেওয়া হতো। এরকম আরও কিছু উদাহরণ দেওয়া যায়।

ভিক্টর হুগো (Les Misérables): উনিশ শতকের ফরাসি সমাজব্যবস্থার নিষ্ঠুরতা, দারিদ্র্য এবং বিচারব্যবস্থার অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই উপন্যাস ছিল কালজয়ী প্রতিবাদ। চরিত্র জঁ ভালজাঁর (Jean Valjean) আত্মিক রূপান্তর সাহিত্যের নৈতিক শক্তির অসামান্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। ফিওদর দোস্তয়েভস্কি (Crime and Punishment): অপরাধ, অনুশোচনা ও নৈতিক জবাবদিহিতার ঐতিহাসিক দলিল। কোনো মানুষই যে আইন, নীতির ঊর্ধ্বে হতে পারে না, এতে প্রতিফলিত হয়েছে তাই। জর্জ অরওয়েল (1984 ও Animal Farm): ক্ষমতাশীল শাসকগোষ্ঠীর স্বৈরাচার, নজরদারি ও সাধারণ মানুষের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে অসামান্য সাহিত্যিক প্রতিবাদ। হার্পার লি (To Kill a Mockingbird): বর্ণবাদ ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে সত্যনিষ্ঠ উকিল অ্যাটিকাস ফিঞ্চের আইনি ও নৈতিক লড়াইয়ের অমর কাহিনী।

—শুধু প্রাশ্চাত্য সাহিত্যে নয় পৃথিবীর সকল সাহিত্যে কালে-কালে এরকম নজির রয়েছে। বাংলা সাহিত্যেও তার ব্যতিক্রম নয়। শুধু ভাষা ভিন্ন, প্রকাশের উদ্দেশ্য একই। অর্থাৎ, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও বহু কালজয়ী ব্যক্তিত্বের সন্ধান মেলে, যাঁরা শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে পরোয়া করেননি, লোভ-লালসা, পদক-পুরস্কারের মোহ যাঁদের সত্য প্রকাশ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। কিছু কালজয়ী লেখকদের উদাহরণ দেখলেই আমরা স্পষ্ট হতে পারি।

কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩–১৮৯৬): উনিশ শতকে গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন অত্যাচারী নীলকর সাহেব ও ব্রিটিশ অনুগত জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে সংবাদপত্র ‘‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’’ ও সাহিত্যে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ জারী রেখেছিলেন। কোনো হুমকি , কোনো অর্থপ্রলোভন তাঁকে নিরস্ত করতে পারেনি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া নাইট (Knight) উপাধি ত্যাগ করে তিনি সাহিত্যে ও নীতিতে শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন (১৮৮০–১৯৩২): ‘‘অবরোধবাসিনী ও সুলতানার স্বপ্ন’’ -এর মতো রচনার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অন্যায় নিষেধাজ্ঞা ও শিক্ষার সুযোগ থেকে নারীকে বঞ্চিত করার নৈতিক অপরাধ তুলে ধরেছিলেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬–১৯৩৮): পল্লীসমাজ ও পথের দাবী-র মতো উপন্যাসে তিনি সামাজিক বিচারহীনতা ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট নৈতিক অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর ‘‘পথের দাবী’’ উপন্যাস বিপ্লবী চেতনা জাগ্রত করার অপরাধে ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল।

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬): বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ও ‘ধূমকেতু ;পত্রিকা ব্রিটিশ রাজকে এতোটাই শঙ্কিত করেছিল যে তাঁকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাবরণ এবং ৩৯দিন অনশন করতে হয় এবং তাঁর ৫টি গ্রন্থও বাজেয়াপ্ত করা হয়, যা প্থিবীর হিসেবে বিরল। জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯–১৯৫৪): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর বিশৃঙ্খলা, আত্মিক শূন্যতা এবং নৈতিক পতনকে তিনি তাঁর কবিতায় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং মানুষকে সত্য ও সুন্দরের পথে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮–১৯৫৬): তাঁর পদ্মানদীর মাঝি ও পুতুলনাচের ইতিকথা উপন্যাসে সামাজিক বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে আমৃত্যু সত্যনিষ্ঠ সাহিত্যচর্চা করে গেছেন। সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬–১৯৪৭): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পঞ্চাশের মন্বন্তরের পটভূমিতে লেখা তাঁর কবিতাগুলোতে শোষিত মানুষের অধিকার এবং সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে।


অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক (১৯১৪–১৯৯৯): অধ্যাপকদের অধ্যাপক ও গবেষকদের গবেষক হিসেবে খ্যাত এই জ্ঞানসাধক আজীবন কোনো পদ-পদবী কিংবা সামাজিক প্রতিপত্তির মোহে না গিয়ে সত্য ও জ্ঞানের অনুশীলনে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। বদরুদ্দীন ওমর (১৯৩১–২০২৫): পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তাঁর চলন, বলন এবং লেখনীতে সত্যের পক্ষে অটল ছিলেন। কোনো ভয়-ভীতি, রাষ্ট্রীয় প্রলোভন কিংবা পুরস্কার তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারেনি; তিনি ১৯৭৩ বাংলা একাডেমি পুরস্কার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে নীতি ও আদর্শের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। এই প্রত্যাখান, যা সেইসময় ছিল বিশাল ঝুঁকির, এরকম লোভনীয় পদক পরিহার করেছিলেন এই প্রাজ্ঞ দার্শনিক, বরেণ্য বুদ্ধিজীবি ও নির্মোহ লেখক।

আহমেদ ছফা (১৯৪৩–২০০১): বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত সাহসী ও নির্মোহ লেখক। ১৯৭৫ সালে ঘোষিত বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে তিনিও প্রমাণ করেছিলেন, সাহিত্যচর্চা কোনো রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার অথবা স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে না। —এইরকম কালজয়ী ব্যক্তিত্বরাই কেবল আপসহীন ছিলেন না, অখ্যাতিমান, অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত লেখকদের মধ্যেও অনেকে কখনো সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াননি। অথচ বর্তমান যুগে সাহিত্যে গভীর নৈতিক আকাল পরিলক্ষিত হয়। রচনার মান, চরিত্রের নৈতিক গভীরতা কিংবা সাহিত্যিকের নিজস্ব আচরণে সেই ঐতিহ্যবাহী নির্ভীকতার অভাব দেখা যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে বহু লেখক পদক ও পুরস্কারের লোভে লেহন, তৈলমর্দন ও চাটুকারিতায় লিপ্ত থাকেন; আবার কিছু লেখক অত্যন্ত চালাকির সাথে নিরপেক্ষ থাকার ভণিতা করে নির্লিপ্ত থাকেন। এই ছদ্ম-নিরপেক্ষ সুবিধাবাদী শ্রেণী আরও বেশি বিপজ্জনক।


সাহিত্য সকল কালে সকল জাতির বিবেক। যে সাহিত্য সমাজকে সত্য ও ন্যায়ের পথ দেখাতে পারে না, তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আজকের আধুনিক যুগে সাহিত্যকে পুনরায় তার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করতে হলে অতীতের ন্যায়পরায়ণ সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। লোভ ও ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের পক্ষে কলম ধরাই সাহিত্যের প্রধান নৈতিক দায়িত্ব।
 
লেখক : নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক।

২২৬ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন