সর্বশেষ

মতামত

গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট: দীর্ঘমেয়াদি অপরিকল্পনার ফল ভোগ করছে বাংলাদেশ

মনজুর এহসান চৌধুরী
মনজুর এহসান চৌধুরী

মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৬:৩৪ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
বাংলাদেশ বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম জটিল জ্বালানি-বিদ্যুৎ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সারা দেশে তীব্র লোডশেডিং, শিল্পকারখানা বন্ধ, গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন—এই চিত্রের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি অপরিকল্পনা, গ্যাস অনুসন্ধানের অবহেলা এবং আমদানিনির্ভর ঝুঁকিপূর্ণ নীতি।

বাংলাদেশে ১৯৯৮ সালের পর আর কোনো বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়নি। প্রায় ২৮ বছর ধরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান বা উত্তোলনে কোনো উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর (বিবিয়ানা, তিতাস, হবিগঞ্জ) উৎপাদন সক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। প্রতি বছর ১০০-২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মোট মজুত ছিল ২৯.৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ), যার মধ্যে ২২.১১ টিসিএফ উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে অবশিষ্ট আছে মাত্র ৭.৬৩ টিসিএফ। দৈনিক ১,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে উত্তোলন করলে এই মজুত আর মাত্র ৮-১২ বছর চলবে।

২০১২ ও ২০১৪ সালে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সামুদ্রিক সীমানা বিজয়ের পর বাংলাদেশ ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা পায়। কিন্তু এক দশক পরেও সমুদ্রে কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়নি। চারটি বিদেশি কোম্পানি চুক্তি করলেও তিনটি ছেড়ে গেছে। বর্তমানে থাকা একমাত্র কোম্পানিও অনুসন্ধান কাজ বন্ধ করে দিয়েছে।

অথচ প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস উত্তোলনে সক্রিয়। তাদের তুলনায় বাংলাদেশের উদ্যোগহীনতা জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

২০২৪ সালের শেষের দিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘বিশেষ আইন’-এর অধীনে অনুমোদিত ৩৭টি নবায়নযোগ্য (মূলত সৌর) বিদ্যুৎ প্রকল্পের লেটার অব ইনটেন্ট (LOI) বাতিল করে। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশ অতিরিক্ত ৩,০০০-৫,৬৮১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেত।

সরকারিভাবে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পগুলো দরপত্র ছাড়া, স্বচ্ছতা ছাড়া অনুমোদন করা হয়েছিল। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, প্রকল্পগুলো বাতিলের পর তড়িৎভাবে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তায় পড়ে বাংলাদেশ থেকে বিমুখ হয়েছেন। প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছিল এই প্রকল্পগুলোতে।

যদি সরকার এই প্রকল্পগুলো বাতিল না করে পুনর্মূল্যায়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এগিয়ে নিত, অথবা বাতিল করার সাথে সাথে নতুন দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করত, তাহলে আজকের এই বিদ্যুৎ সংকটের মাত্রা কম হতো।

বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৪৭-৫০% গ্যাস-ভিত্তিক। কিন্তু দেশীয় গ্যাস উৎপাদন গত ৮-১০ বছরে ৩০-৩৭% কমে গেছে। ফলে ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়। ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয় এবং বর্তমানে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের ৩৩% আসছে এলএনজি থেকে।

এই আমদানিনির্ভর নীতিই এখন বাংলাদেশকে বিপদে ফেলেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্বব্যাপী তেল ও এলএনজির প্রায় ২০% এই প্রণালী দিয়ে পরিবহন হয়। কাতার, যা বাংলাদেশের একটি প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী দেশ, সেখান থেকে এলএনজি রপ্তানি স্থগিত হয়ে যায়।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনতে পারছে না। গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো অলস পড়ে আছে। দেশে মোট গ্যাসের চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এই সংকটের ফলে সারা দেশে তীব্র লোডশেডিং চলছে। শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, উৎপাদন কমে যাচ্ছে। সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, রান্নার গ্যাস সংকট—সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের মূল কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদি অপরিকল্পনা। গ্যাস অনুসন্ধান না করা, আমদানিনির্ভর নীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে অনীহা—এই সবকিছু মিলে বাংলাদেশকে এই দুর্দশায় ফেলেছে।

সরকারকে দ্রুত অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার, পুরনো কূপ মেরামত, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং জ্বালানি বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি।

নইলে এই সংকট আরও তীব্র হবে, অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এবং সাধারণ মানুষ আরও দুর্ভোগে পড়বে।


লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

১২৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন