আজ বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, খালেদা জিয়াকে ছাড়াই পালিত হচ্ছে দিনটি
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৬:২৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্ণ করল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আজ মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। তবে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য আলাদা তাৎপর্য বহন করছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে এবারই প্রথম দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হচ্ছে সাবেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ছাড়া। গত ৩০ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুর পর এটিই বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ফলে আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে বিএনপির ভবিষ্যৎ পথচলা নিয়ে আলোচনা সামনে এসেছে।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর চার দশকের বেশি সময় ধরে নানা রাজনৈতিক পরিবর্তন, আন্দোলন ও সংকটের মধ্য দিয়ে দলটি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় দলটির নেতৃত্বে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ছিলেন খালেদা জিয়া। স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর আশির দশকে তিনি সক্রিয়ভাবে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের কাউন্সিলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন তিনি। এরপর প্রায় চার দশক দলটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া।
আশির দশকে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব আরও দৃশ্যমান হয়। ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত আন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতনের পর দেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন খালেদা জিয়া। তাঁর সরকারের সময় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও বিএনপির নেতৃত্ব তাঁর হাতেই ছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট জয়ী হলে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তিনি।
তবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুধু ক্ষমতার সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘ সময় বিরোধী দলেও নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। ২০০৭ সালের পর দেশের রাজনৈতিক সংকটের সময়ে মামলা ও কারাবাসের মুখোমুখি হন বিএনপির এই নেতা। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সীমিত হয়ে পড়ে। বিএনপি বরাবরই এসব মামলাকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর কারামুক্ত হলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে খালেদা জিয়া আর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে এবার বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে আবেগের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। দলটির নেতা-কর্মীদের কাছে তিনি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক ঐক্যের অন্যতম প্রধান প্রতীক ছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের ঐক্য ও সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখার বিষয়টি এখন নতুন করে সামনে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে বিএনপির রাজনীতিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার পর তাঁর দেশে ফেরাকে ঘিরে দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধারণ করে দলকে সামনে এগিয়ে নেওয়া, সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং নেতা-কর্মীদের ঐক্য ধরে রাখা তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের মাতা ও আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দেখিয়ে দেওয়া গণতন্ত্রের পথেই বিএনপির পথচলা।’ তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি যত দিন থাকবে, তত দিন খালেদা জিয়ার নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। আবার দীর্ঘ সময় বিরোধী দলেও থেকেছে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দলটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্থায়ী অবস্থান তৈরি করেছে।
এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাই বিএনপির সামনে একই সঙ্গে অতীতের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যতের পথচলার প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন এবং খালেদা জিয়ার দীর্ঘ নেতৃত্বের পর নতুন বাস্তবতায় দলটি কীভাবে নিজেদের সংগঠিত করে এগিয়ে যায়, সেটিই এখন বিএনপির রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
১৩১ বার পড়া হয়েছে