২৮ সেপ্টেম্বর থেকে আবারও হামের টিকা দেয়ার পরিকল্পনা সরকারের
বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬ ৮:১০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু কমেনি। প্রতিদিনই শত শত মানুষের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। প্রতিদিন মারা যাচ্ছে মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে আবারও বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর সারাদেশে একযোগে এ কর্মসূচি শুরু করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এবার প্রায় ৩০ লাখ শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক ভার্চুয়াল বৈঠকে নতুন করে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী সম্প্রতি নতুন করে টিকাদানের ঘোষণা দিয়ে বলেন, দেশের কিছু এলাকায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশু হামের টিকা পায়নি। বাদ পড়া এসব শিশুকে টিকার আওতায় আনা হবে। সরকারের কাছে এখনো ১৬ লাখ হামের টিকা মজুত রয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হামের পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় সরকার আবারও বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি নিতে যাচ্ছে। সারাদেশে হামের প্রকোপ চলমান থাকায় নতুন করে টিকাও সংগ্রহ করা হয়েছে। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর সারাদেশে একযোগে এ কর্মসূচি শুরু হবে। এতে প্রায় ৩০ লাখ শিশুকে নতুন করে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ নিয়মিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৪৪। একই সময়ে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৯৯ জন। দুই ধরনের মৃত্যু মিলিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা ৯৪৩।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। এরপর ৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়। ৮ এপ্রিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়। পরে ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে এ কর্মসূচি চালু করা হয়। মে মাসের মাঝামাঝি বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শেষ হয়।
তবে ওই কর্মসূচিতে কত শিশু বাদ পড়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকারের হিসাবে, ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল। লক্ষ্যের বিপরীতে ১০৩ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে বলে দাবি সরকারের।
অন্যদিকে, একই বয়সী শিশুদের জন্য জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই কোটি ২৬ লাখ। দুই কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে প্রায় ৪৬ লাখের ব্যবধান রয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবধান থেকে ধারণা করা যায়, হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির বাইরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু থেকে গেছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে-নজীর আহমদ বলেন, বাংলাদেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি নজিরবিহীন। টিকাদানে ঘাটতি এবং চিকিৎসাব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার কারণে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে।
তাঁর মতে, হামে আক্রান্ত শিশুদের স্বাস্থ্য জটিলতা ও মৃত্যুর হার বাড়ার পেছনে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্মৃতির অবলুপ্তিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। হামের ভাইরাস শিশুর রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্মৃতিকোষের বড় একটি অংশ ধ্বংস করতে পারে। ফলে হাম থেকে সাময়িকভাবে সুস্থ হয়ে উঠলেও শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এতে পরবর্তী কয়েক মাস সাধারণ সংক্রমণেও অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ৯৮৬ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে এক লাখ ৫১ হাজার ৬৩৮ জনের। একই সময়ে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ১৮ হাজার ৫৭৮ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ৯১ জন।
এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক লাখ ৩২ হাজার ৫৫৪ জন। তাঁদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে এক লাখ ২৭ হাজার ৮১১ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে কারও মৃত্যু হয়নি। হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া পাঁচজনের চারজন ঢাকা বিভাগের এবং একজন সিলেট বিভাগের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত পরিসংখ্যানে রোগীদের বয়সভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করা হয় না। রোগতত্ত্ববিদদের মতে, হাম যেকোনো বয়সী মানুষের হতে পারে। তবে এ রোগে শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হয়। প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হওয়া মৃত্যুকে হামের কারণে মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১২৩ বার পড়া হয়েছে