পিংক বাসের উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রীর এক সফলতা: নষ্ট করতে চাইছে কারা
রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬ ১০:২৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
রাজধানীর গণপরিবহনে নারীদের নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন—বিআরটিসি—চালু করেছে বিশেষ ‘পিংক বাস’ সার্ভিস। ১৮ আগস্ট তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে এ সেবার উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
এই উদ্যোগের সবচেয়ে আলোচিত দিক শুধু নারীদের জন্য আলাদা বাস নয়; বরং বাসগুলোর চালক, কন্ডাক্টর ও সহকারীও নারী।
প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় মোট ১৪টি বাস ১৩টি পথে চলাচল করছে। ঢাকায় রয়েছে ১০টি বাস। বিআরটিসি জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে বাসের সংখ্যা ও রুট বাড়ানো হবে। আগামী তিন মাসে ৫০টি বাস চালুর লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
চালকের আসনে নারী কেন?
এই প্রশ্নটিই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আলোচিত—‘বাস চালাতে পুরুষ চালক থাকলেই তো পারতেন, নারী চালক নেওয়ার প্রয়োজন কী?’
প্রশ্নটির সরল উত্তর হলো—শুধু বাস চালানোর জন্য নারী চালক নিয়োগ করা হয়নি; নারীদের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করাও এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
একজন পুরুষ চালক বাস চালালে যাত্রীসেবা হয়তো দেওয়া সম্ভব। কিন্তু নারীকে চালকের আসনে বসানোর মাধ্যমে রাষ্ট্র যখন একটি পেশাগত ক্ষেত্র নারীদের জন্য উন্মুক্ত করে, তখন সেটি কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগও তৈরি করে। নারীর ব্যাপ্তিকে কাজে লাগানোর জাতিগত উন্নয়নের বিশাল পরিকল্পনায় নেপথ্যে কাজ করছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পিংক বাসের নারী ড্রাইভার তারই শুভ সূচনা মাত্র।
কিন্তু কিছু মানুষ এরই মধ্যে এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে লেগে গেছে। কেউ কেউ ফেসবুকে ভিউ বাড়ানোর জন্য, হতে পারে কেউ ব্যক্তিগত শত্রুতায় অথবা দলীয় শত্রুতায় এই উদ্যোগকে পেছনে ঠেলে দিতে চাইছে। বারবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বোঝাতে চাইছে যে নারীরা ভারী যানবাহন চালাতে ব্যর্থ। এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাইছে নারী উন্নয়ত তথা সরকারের এই মহান উদ্যোগকে।
বিআরটিসির তথ্য অনুযায়ী, পিংক বাসের নারী চালকদের আগে হালকা যান চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল, তারা অনভিজ্ঞ নয়। তাঁদের গাজীপুরে আবাসিক প্রশিক্ষণ দিয়ে বাস চালানোর জন্য কারিগরি ও মানসিক প্রস্তুতি দেয়া হয়েছে।
অর্থাৎ তাঁরা হঠাৎ করে স্টিয়ারিংয়ে বসেননি। প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার ভিত্তিতেই তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
একজন নারী যখন বাস চালান, তখন তিনি শুধু একটি যানবাহন চালাচ্ছেন না; তিনি একই সঙ্গে আরেকজন নারীকে দেখাচ্ছেন—‘এই কাজটিও আমার জন্য অসম্ভব নয়।’ - ঠিক এইভাবেই নারীদের শুধু সৌন্দর্য্য ঘরে সাজিয়ে রাখার শোপিস, কিংবা কায়িক যোগ্যতাহীন শুধু মেধার জোরে অফিসার পদে কলম ঘোড়ানোই নয় বরং কাজে এবং মেধার দক্ষতায় তাদের সঠিক যোগ্যতা প্রদর্শনের মাধ্যমে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী। নি:সন্দেহে এটা মহান উদ্যোগ।
বাংলাদেশের গণপরিবহনে নারীদের অভিজ্ঞতা সবসময় স্বস্তিদায়ক নয়। ভিড়, আসনসংকট, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, হয়রানি কিংবা নারী যাত্রীকে বাসে তুলতে অনীহা—এসব অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
পিংক বাসের উদ্বোধনী দিনে কথা বলা নারী যাত্রীদের অনেকেই জানিয়েছেন, নারী চালক, কন্ডাক্টর ও সহকারী থাকায় তাঁরা তুলনামূলক স্বস্তি বোধ করছেন। কেউ কেউ সরাসরি বাসের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
একজন নারী যাত্রীর কাছে নিরাপদ গণপরিবহন শুধু ‘একটি বাস’ নয়। এটি তাঁর কর্মস্থলে যাওয়ার স্বাধীনতা, সময়মতো ক্লাসে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা, সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার স্বস্তি এবং গণপরিবহনে নিজের জায়গা পাওয়ার অধিকার।
তাই নারীরা যখন বলেন, ‘বাস আরও চাই’, তখন সেটিকে শুধু একটি পরিবহন চাহিদা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নারীর চলাচলের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পিংক বাস চালুর পর একটি অংশ নারী চালকদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে একটি পিংক বাস ফ্লাইওভারে ওঠার সময় সমস্যায় পড়ার ঘটনা নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য ও ট্রল দেখা গেছে।
১৯ আগস্ট শাহজাহানপুর এলাকায় একটি দোতলা পিংক বাস ফ্লাইওভারের ঢাল বেয়ে উঠতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে। নারী চালক পরিস্থিতি বুঝে বাসটি থামিয়ে দেন। পরে যানজট বা সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে একজন পুরুষ চালক সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন এবং বাসটি নিরাপদে ফ্লাইওভারে তুলে দেন। দুর্ঘটনা ঘটার আগেই সতর্ক হয়ে আরো দক্ষ কারো সহযোগিতা নেয়াটা অবশ্যই দোষের নয় বরং জীবন বাঁচানোর জন্য উদ্যোগ। একজন নারী চালক ওভারব্রিজে উঠার আগে একজন পুরুষ চালকের সহযোগিতা নিয়েছেন। আসলে এটা ছিল তার বিচক্ষনতা। ঘটনাটিকে শুধু ‘নারী চালক ব্যর্থ’ হিসেবে দেখার আগে আরেকটি বিষয় দেখা জরুরি—তিনি ঝুঁকি বুঝে বাস থামিয়েছিলেন।
পিংক বাস চালু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশেই এই বাসের কোনো দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। কিন্তু হর-হামেসাই পুরুষ চালকদেরই দুর্ঘটনারই খবর দেখি পত্রিকায়। আর এইআই ক্যামেরার মাধ্যমে মামলার তো অভাব নেই। যার একটিতেও নারী চালকদের নাম আসেনি এখনও।
উল্টো পিংক বাস সার্ভিস চালুর প্রথম দিনেই, ১৮ আগস্ট, একটি পিংক বাসকে বলাকা পরিবহনের একটি বাস ধাক্কা দেয়। পরে ট্রাফিক পুলিশ বলাকা বাসটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে জরিমানা করে।
দুর্ঘটনা একজন চালকের লিঙ্গ দিয়ে বিচার করা উচিত নয়; বিচার করা উচিত কারণ, দায়িত্ব, দক্ষতা ও প্রমাণের ভিত্তিতে।
বিআরটিসি ইতোমধ্যে প্রতিটি বাসে ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম এবং কিছু বাসে সিসিটিভি সংযোজন করেছে। ই-টিকিটিংও চালু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব প্রযুক্তি আরও বাসে যুক্ত করার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
অর্থাৎ পিংক বাসকে শুধু ‘নারীর বাস’ হিসেবে নয়, নিরাপদ ও আধুনিক গণপরিবহনের একটি পরীক্ষামূলক মডেল হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
পিংক বাসের প্রথম কয়েক দিনের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় বেশ স্পষ্ট—নারী যাত্রীরা তর্কে জিততে চান না, তাঁরা গন্তব্যে নিরাপদে পৌঁছাতে চান। তাঁদের চাওয়া খুব বাস্তব— বাস যেন সময়মতো আসে, পর্যাপ্ত বাস থাকে, ভিড় কমে, হয়রানি না হয়, চালক দক্ষ হন, বাস নিরাপদ হয় এবং রুট যেন তাঁদের প্রয়োজনের সঙ্গে মেলে। প্রথম দিনেই নারী যাত্রীদের অনেকেই বাসের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। এই চাহিদাই সম্ভবত পিংক বাস প্রকল্পের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা। কারো ট্রল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়ানোটা অবশ্যই তাদের থামাতে পারবে না। এটাই সকলের কাম্য।
নারীর উন্নয়নকে যদি শুধু ঘর, অফিস কিংবা নির্দিষ্ট কিছু ‘নারীবান্ধব’ পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে উন্নয়নের পরিধি ছোট হয়ে যায়। নারী শিক্ষক হবেন, চিকিৎসক হবেন, প্রকৌশলী হবেন—এগুলো আমরা অনেকটাই স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করেছি। এখন যদি নারী চালকের আসনেও বসেন, সেটিকেও স্বাভাবিক করে তোলার সময় এসেছে।
পিংক বাসের নারী চালক হয়তো একদিন বাংলাদেশের সব বাস চালাবেন—এমন নিশ্চয়তা আজ কেউ দিতে পারবেন না। কিন্তু তাঁর স্টিয়ারিংয়ে বসা একটি সামাজিক বার্তা অবশ্যই দেয়: কাজের যোগ্যতা লিঙ্গ দেখে নির্ধারিত হয় না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে এই বিশেষ বাস সার্ভিস চালু হয়েছে বলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানানো হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনায় ভবিষ্যতে আরও বাস ও রুট বাড়ানোর পাশাপাশি নারীদের জন্য ১০০টি ইলেকট্রিক বাস রাখার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক প্রশংসা বা সমালোচনার বাইরে পিংক বাসের সবচেয়ে বড় মূল্যায়ন হওয়া উচিত বাস্তব ফলাফলে।
ভালো চালক ভালো চালকই—তিনি নারী হোন বা পুরুষ।
১১৯ বার পড়া হয়েছে