আমার স্কুলের কথা
সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৪৪ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
আমার স্কুল জীবন কেটেছে কুমারখালীর দুটি স্কুলেই - জে এন স্কুল ও এম এন হাই স্কুল। ১৯৬১ সালে জে এন স্কুলে আমি ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হই। আমার বাড়ির পাশেই স্কুলটি। দোচালা টিনের ঘর লম্বালম্বি। এটি এক সময়ে মাইনর স্কুল নামেও পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে জুনিয়র হাই স্কুল হয় এবং তারও পরে হাই স্কুলে রূপান্তরিত হয়।
একপর্যায়ে মরহুম রশিদুর রহমান এই স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন আমার ছাত্র জীবনে। এখান থেকে পরবর্তীতে তিনি পাংশা কলেজে যোগ দেন এবং সেখানেই অবশিষ্ট কর্মজীবন কাটান।
ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস ফোর পর্যন্ত আমি এই স্কুলে লেখাপড়া করি। শুরু থেকেই স্বর্গীয় শান্তি রঞ্জন সাহা আমার গৃহশিক্ষক ছিলেন। যাকে নিয়ে আমি পরবর্তীতে কবিতাও লিখেছি। যেসব শিক্ষকদের প্রভাব আমার মধ্যে কিছুটা হলেও ছিল তার অন্যতম শান্তি প্রসাদ সাহা স্যার। ( উনার ছবিটি সংযুক্ত করা হলো)। তিনি ছিলেন জাত শিক্ষক। আমার যতদূর ধারণা তিনি মেট্রিকুলেশন পাস ছিলেন। অথবা মেট্রিক পাশ ছিলেন না।মরহুম কালু মাস্টার, কাজী স্যার, রবিবাবু সে সময় আমাদের ক্লাস নিতেন। স্কুলের সামনেই উদার বিস্তৃত খেলার মাঠ। আমাদের শুধু নয় শহরের কিশোর তরুণদের এটাই ছিল খেলাধুলার কেন্দ্রবিন্দু। এই মাঠে ফুটবল ব্যাডমিন্টন ভলিবল এবং গাদন খেলা হত।
আষাঢ় শ্রাবণ মাসে বৃষ্টির মধ্যেও আমরা মহা মজার সঙ্গে ফুটবল খেলতাম।
ওই স্কুলে তখন জলিল মাস্টার বলে একজন ভদ্রলোক ছিলেন যিনি স্কুলের বিভিন্ন কাজে এখানে সেখানে দৌড়াদৌড়ি করতেন। এক পর্যায়ে মরহুম মীর আরশেদ আলী ভাইকে এই স্কুলে শিক্ষকতা করতে দেখেছি ; তবে নিচের ক্লাসে অর্থাৎ আমরা ওনার ক্লাস পাইনি।
আমি ক্লাস ওয়ান থেকে ফোর পর্যন্ত সর্বদাই ক্লাসে প্রথম হয়েছিলাম। তখন সহদেব আমার সঙ্গে সেকেন্ড হয়েছে কখনো কখনো।
আমার পিতা ছিলেন কুমারখালী এমএন হাই স্কুলের শিক্ষক এবং আমি জে এন স্কুলে পড়ি এর জন্য তিনি মাঝে মাঝে সমালোচনার মুখে পড়তেন। তাই ক্লাস ফাইভে উঠলেই আমাকে এমএন স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয়।
সত্যি কথা বলতে কি সেই প্রথম বিদায়ের দুঃখ আমার মধ্যে বাসা বেধে ছিল। বিদায়ের মর্ম যন্ত্রণা এমনকি ওই বয়সেও আমাকে জুড়ে রেখেছিল। জে এন স্কুল ছেড়ে এম এন স্কুলে যাওয়ার সময় আমি মানসিকভাবে খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম ; যা বেশিদিন আমার মধ্যে স্থায়ী ছিল
না। নোয়াখালী অঞ্চলের এক মৌলভী শিক্ষক তখন ওই স্কুলে ছিলেন। পড়া না পারলে তিনি মারতেন।
একবার ডাস্টার দিয়ে সহদেবের মাথায় আঘাত করেন। আমার মনে হয়েছিল তিনি জোরেই মেরেছিলেন।
আমি যখন ক্লাস টু তে পড়ি তখন একদিন সকালবেলা গোলাবাড়ি পুকুরে গোসল করে বাসায় ফিরছিলাম। আগের দিনে ওই বয়সে আমরা কোন কোন সময় ল্যাংটা হয়েই ঘরে ফিরতাম। এটা যে লজ্জার বিষয় হতে পারে তা ওই সময় আমাদের মনে হত না। কিন্তু পরের দিন ক্লাসে গেলে ওই মৌলভী স্যার আমাকে এক ঘা বেত মেরে দিলেন কারণ তিনি আমাকে ল্যাংটা অবস্থায় দেখেছিলেন গোসল করে ঘরে ফিরতে। যখন ক্লাসে এই গল্প করলেন তখন সবার সামনে আমি একটু লজ্জাই পেলাম।
আমার সেইসময়ের ক্লাসমেটদের দুইজন এখন ঢাকায় থাকে - অসীম ও বসির।অসীম একটি রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে অবসর গ্রহণ করে এখন মোহাম্মদপুরের কাটাসুরে বাস করেন। বশির চক্ষু বিশেষজ্ঞ এবং এখনো জনসেবা করে যাচ্ছেন এবং খিলগাঁও এলাকায় থাকেন।
আমাদের এখনকার যোগাযোগসুত্র বলা যায় টেলিফোন। কালে ভদ্রে দেখা-সাক্ষাৎ হয়।
ক্লাস ওয়ান থেকে ফোর পর্যন্ত ক্লাসে আমিই প্রথম হয়েছিলাম। তখনকার দিনে যারা পড়াশোনা করত কিংবা ভালো রেজাল্ট করত, বলা হতো ছেলেটার মাথা ভালো।
মাথা ভালো কিংবা মন্দ কি জন্য তা আমি তখন বুঝতে পারতাম না। পরবর্তীকালে বুঝেছি মাথা ভালো মানে মেধাবী।
আগের দিনে এমনকি স্কুলেও সুর করে নামতা পড়ানো হতো। কোন কবিতা পড়লে মুখস্ত পড়া দিতে হতো ক্লাসে। প্রতিদিন একপাতা ইংরেজি ও বাংলা হাতের লেখা জমা দিতে হতো। সুর করে নামতা পড়ার স্মৃতি এখনও কানে বাজে।
জে এন স্কুলে সোন্দাহ এলাকার দেবাশীষ বাবু শিক্ষকতা করেছিলেন। তিনি ইংরেজি ভাষায় দক্ষ ছিলেন এবং ইংরেজিতে কথা বলতেন। পরবর্তীকালে তিনিও পাংসা কলেজে যোগদান করেন। বহু বছর পরে ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের শেখ বোরহানউদ্দিন কলেজে উনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। জানিনা এখন বেঁচে আছেন কিনা।
আমি যখন ক্লাস ফোরে পড়ি স্কুলের নজরুল জয়ন্তীতে আমাকে শিশু জাদুকর কবিতাটি আবৃত্তি করতে দেয়া হয়। আ স ম ওয়াহেদ পান্না ভাই তখন এইসব ব্যাপারে নেতৃত্ব দিতেন।
আগের দিনের নিয়ম শৃঙ্খলা কঠোর ছিল। হোমটাস্ক করে স্কুলে যেতে হতো। না হলে বেতের ভয় ছিল।কখনো কখনো জোড়া বেতের ভয়। কাজী স্যার আঙ্গুলের মধ্যে পেন্সিল দিয়ে ডলা দিতেন এবং তাতে বেশ ব্যথা পেতাম আমরা। এই কাজী স্যার ছিলেন কাজী মিয়াজানের বংশধর। কাজী মিয়া জান ব্রিটিশ আমলে আন্দামানে নির্বাসিত হয়েছিলেন। তিনি ওহাবী আন্দোলনের এক বড় মাপের নেতা ছিলেন।
সে সময়েই আমাদের দুপুরের খাবার দেয়া হতো।ওই সময় শুনতাম আমেরিকা থেকে যে গম পাঠানো হয় তার ভাগ আমরাও পেতাম। রান্না করে আমাদেরকে খিচুড়ি অথবা জাও করে খাওয়ানো হতো। ওই বয়সে স্বাদ ভালই লাগতো।
এখন কুমারখালী জে এন হাই স্কুল বড় বিল্ডিং শোভিত একটি বিদ্যালয়। উন্নয়নের ছোঁয়া ভালোভাবেই লক্ষ্য করা যায় । বাড়িতে গেলে স্কুলটির দিকে তাকিয়ে দূর থেকে দেখি। দৃষ্টিনন্দন বৃহৎ একটি প্রতিষ্ঠান। আমার প্রথম স্কুল।
(পরবর্তীতে এম এন হাই স্কুল পর্ব লেখার ইচ্ছে রইল)।
লেখক: সাবেক সচিব।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)
১২৩ বার পড়া হয়েছে