আমার প্রিয় একজন সফল শিক্ষকের কাহিনী
বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ৮:২১ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
মাওলানা আব্দুস সাত্তার ১৯১০ সালে বর্তমান রাজবাড়ী জেলার পাংশা থানার ভেলাবাড়ীয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মৌলভী মোঃ সাদেক আলী। তিনি বগুড়ার নাজমুল উলুম সিনিয়র মাদ্রাসা থেকে “দাখিল” ও “আলিম” পাস করেন এবং কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে “ফাজিল” ও “কামিল” পাস করেন। তিনি ৭ (সাত) সন্তানের (৫ পুত্র ও ২ কন্যা) জনক। তিনি ২০০২ সালের ১৩ আগস্ট ৯২ বছর বয়সে কুমারখালী শহরে তাঁর নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন।
আমি যখন ১৯৫১ সালের জানুয়ারি মাসে কুমারখালী এম. এন. উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই, তখন থেকেই উক্ত বিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে তাঁকে পাই এবং ১৯৫৬ সালে প্রবেশিকা (ম্যাট্রিক) পরীক্ষা দেওয়ার সময় পর্যন্ত ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক যথারীতি বজায় থাকে। পরবর্তীতে সংসার জীবনে প্রবেশের পর যখনই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, তিনি অভিভাবকের ন্যায় খোঁজখবর নিয়েছেন। সে সম্পর্ক তাঁর ইন্তেকালের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত বিরাজমান ছিল।
১৯৫২ সালে পাকিস্তান সরকার উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করে এবং সকল ধর্মের ছাত্রদের জন্য উর্দু ভাষাকে বাধ্যতামূলক করে ধর্মীয় ভাষা হিসেবে আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে অনুমোদন করে। মুসলমান ছেলেরা সাধারণত আরবি অথবা ফারসি নিয়েই পড়াশোনা করত। আমাদের সময় (১৯৫১-১৯৫৬) আমাদের স্কুলের মুসলমান ছাত্ররা ফারসিকে তাদের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বেছে নেয়। স্যার আমাদের ফারসি পড়াতেন। অর্থাৎ তিনি আরবি, উর্দু এবং ফারসি—এই ৩ (তিন) ভাষাতেই সমভাবে পারদর্শী ছিলেন।
তিনি ১৯১০ সালে বর্তমান রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার ভেলাবাড়ীয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯২০ সালে বগুড়া জেলার নাজমুল উলুম সিনিয়র মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৩০ সালে “দাখিল” এবং ১৯৩২ সালে “আলিম” পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করার পর কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৩৪ সালে “ফাজিল” এবং ১৯৩৭ সালে “কামিল” পাস করে কুমারখালী বড় জামে মসজিদের পেশ ইমাম হিসেবে জীবন শুরু করেন এবং কুমারখালীতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৪০ সালে তিনি কুমারখালী এম. এন. উচ্চ বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত একই স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ১৯৪২ সালে (০৪/০৭/১৯৪২) কুমারখালী থানা মুসলিম সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি কুমারখালী পৌরসভার সরকার মনোনীত কমিশনার ছিলেন। এর মধ্যে ১৯৫২ সালে পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচনে তিনি প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ঐ নির্বাচনে তাঁর কাস্টিং ভোটে কুমারখালী পৌরসভার ১ম মুসলমান চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
তিনি একাধারে এতগুলি পদে অধিষ্ঠিত থাকলেও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল খুবই সাদাসিধা। তিনি কোনো রূপ ঝামেলা পছন্দ করতেন না বা কারও সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদে জড়াতেন না। ধর্মীয় শিক্ষক থাকলেও তিনি ধর্মান্ধ ছিলেন না। ফলে সকল ধর্মের লোকজনের মাঝে তাঁর আলাদা একটি ভাবমূর্তি ছিল। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেন না। তবে তিনি রাজনীতি-সচেতন ব্যক্তি ছিলেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে নিরীহ ছাত্র-জনতার উপর যখন (নূরুল আমিন সরকারের সময়) গুলি বর্ষিত হয় এবং সালাম, বরকত, জব্বারসহ অনেকে প্রাণ হারান, তখন কুমারখালীতে তার প্রতিবাদে ছাত্র-জনতার যে মিছিল বের হয়, তার পুরো ভাগে তিনি ছিলেন এবং তিনিই গায়েবানা জানাজায় ইমামতি করেন। শুধু তাই নয়, সেই সময়ের ছাত্র নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেও পরবর্তী পরিস্থিতির নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন। রাস্তায় ছাত্র, অভিভাবক বা কোনো লোক, সে যে গোত্রেরই হোক না কেন, তাঁকে সালাম দিলে প্রতি উত্তরে তিনি একটি সুন্দর হাসি দিয়ে তাঁদের সকলের কুশলাদি জিজ্ঞাসা করতেন।
তিনি খুব সুন্দর কেরাত করে কোরআন শরিফ পাঠ করতেন এবং নামাজের সুরাগুলি এত সুন্দর করে পড়তেন যে, নামাজিরা অভিভূত হয়ে যেতেন। ফলে তাঁর পেছনে নামাজ পড়ার জন্য অনেক দূর-দূরান্ত থেকেও অনেক মুসল্লি আসতেন। তিনি ফতোয়া দিতেন কোনো ধর্মান্ধ আলেমদের মতো নয়। তাঁর ফতোয়া ছিল যুগোপযোগী, যা অবশ্যই কোরআন এবং হাদিসের আলোকে। তা ছাড়া তিনি ফারায়েজ সম্পর্কে ছিলেন বিশারদ। কারণ সেই সময় তাঁর ফারায়েজ কুষ্টিয়া আদালতের আইনজীবীদের কাছে বিনা আপত্তিতে গ্রহণীয় ছিল। ফলে কোনো আইনজীবী তাঁর ফারায়েজ কোর্টে দাখিল করলে প্রতিপক্ষ আইনজীবীরাও বিনা দ্বিধায় তা মেনে নিতেন।
১৯৫২ সালের পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচনে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। ঐ সময়ের সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ডাঃ মোজাফফর হোসেনের অনুকূলে তিনি তাঁর কাস্টিং ভোট প্রদানের ফলে ডাঃ হোসেন সাহেব কুমারখালী পৌরসভার ১ম মুসলমান চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। উক্ত নির্বাচনে ডাঃ হোসেনের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ডাঃ রেবতী মোহন সাহা, যিনি কুমারখালী এম. এন. উচ্চ বিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন। সেই হিসেবে তিনি স্যারের সহকর্মী শিক্ষক ছিলেন। তা সত্ত্বেও সেই সময় সার্বিক রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে তিনি তাঁর কাস্টিং ভোটটি ডাঃ রেবতী মোহন সাহার প্রতিকূলে দেন, যার ফলশ্রুতিতে ডাঃ রেবতী মোহন সাহার পরিবারের সদস্যরা তাঁকে ভুল বুঝেছিলেন এবং আক্রোশের বশবর্তী হয়ে ডাঃ রেবতী মোহন সাহার বড় ভাই রবীন্দ্রনাথ সাহা (যিনি একাধারে সাহা অ্যান্ড মজুমদার কোম্পানির (আর. এ. ফার্ম) স্বত্বাধিকারী, অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট এবং এম. এন. উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের সেক্রেটারি ছিলেন) স্কুলের সেক্রেটারি হিসেবে অধিষ্ঠিত থাকায় একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্যারকে স্কুল থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেন। তবে অল্পদিনের মধ্যেই সকল ধর্মের ছাত্র, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মিলিত চাপে তাঁকে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে বাধ্য হন এবং ডাঃ রেবতী মোহন সাহার পরিবারের সদস্যগণও তাঁদের ভুল বুঝতে পারেন এবং স্যারের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন।
স্যার যে ধর্মান্ধ ছিলেন না, তার প্রমাণ সকল ধর্মের লোকজনের কাছে তিনি সমভাবে গ্রহণীয় ব্যক্তি ছিলেন। এ ছাড়া তাঁর বাড়ির আশপাশে যে সকল অন্য ধর্মের পরিবার বসবাস করেন, তাদের সঙ্গে স্যারের পারিবারিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজনদের ন্যায়, এমনকি অনুষ্ঠানাদিতে খাওয়া-দাওয়ার আদান-প্রদান পর্যন্ত বিদ্যমান এবং অনেক হিন্দু পুরোহিত ও ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা অনেক সময় স্যারের কাছ থেকে পরামর্শ পর্যন্ত গ্রহণ করতে দ্বিধা করতেন না। অর্থাৎ স্যার জীবনদশায় একজন আধুনিক মাওলানা হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন।
স্কুল জীবনের তিনটি ছোট ঘটনার উল্লেখ করার মধ্য দিয়ে স্যারের চরিত্রের কোমলতা ও সরলতার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তার একটা উদাহরণ দেওয়ার ইচ্ছা সংবরণ করতে পারলাম না।
১ নম্বর: সরকার যখন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করে সকল সম্প্রদায়ের ছাত্রদের জন্য উর্দুকে বাধ্যতামূলক করে, তখন আমাদের সতীর্থ দুর্গা প্রসাদ সাহা উর্দু একদমই পারত না। যদিও অন্য বিষয়ে ১ম সারির ছাত্র ছিল। বার্ষিক পরীক্ষার খাতায় স্যার-এর ১টি ছবি এঁকে তাঁর হাতে ১টি বেত ধরিয়ে দিয়ে তাঁর নিজেরও ১টি ছবিতে দু’কান ধরে স্যারের সামনে দাঁড়িয়ে নিচে লিখেছিল, “স্যার উর্দু বুঝতে পারি না, অনুগ্রহপূর্বক পাস করিয়ে দেবেন।” স্যার দুর্গা প্রসাদকে তাঁর ছবি আঁকার জন্য ভর্ৎসনার পরিবর্তে প্রশংসা করে নিজে প্রশ্নপত্র বের করে তার খাতায় তাকে দিয়ে লিখিয়ে পাস নম্বর দিয়েছিলেন। যা তাঁর মহানুভবতার ১টি উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
২ নম্বর: আমরা মুসলমান ছাত্ররা, যারা ১ম সারির ছাত্র ছিলাম, যেমন আমি নিজে, গীতিকার মাসুদ করিম, আফজাল গনি, মোহাম্মদ আলী—স্যারের কাছে গিয়ে বললাম, স্যার সংস্কৃতে হিন্দু ছাত্ররা ৮০-এর উপরে নম্বর পেয়ে থাকে, সুতরাং আমাদেরও ৮০-এর উপরে নম্বর না দিলে তারা আমাদের থেকে বেশি নম্বর পেয়ে ১ম/২য় স্থান দখল করে নেবে। স্যার সরল বিশ্বাসে আমাদের ৪ জনের খাতায় ফারসিতে ৮৪, ৮৫, ৮২ এবং ৮১ নম্বর দিয়ে দেন, যা তাঁর সরলতার ১টি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
৩ নম্বর: তিনি যখন সাময়িকভাবে স্কুলের চাকরি থেকে চাকরিচ্যুত হন, তখন তিনি খুব আর্থিক কষ্টে ছিলেন এবং তাঁর অনেক শুভানুধ্যায়ী স্কুলের সেক্রেটারির নিকট তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যাননি, বরঞ্চ আল্লাহর উপর নির্ভর করেছেন, যা তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
সাংসারিক জীবন: স্যার সাদাসিধা জীবনযাপন করতেন। মিতব্যয়ী ছিলেন এবং প্রত্যেক দিনের জমা-খরচের ডায়েরি রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। যার ফলে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা করাতে তাঁকে ধারদেনা করতে হয়নি বা কারও নিকট থেকে সাহায্য চাইতে হয়নি। বর্তমানে স্যারের ৫টি ছেলেই চাকরিরত এবং মেয়ে ২টা বিবাহ ও মধ্যমমানের সরকারি চাকরিজীবীর সঙ্গে দিতে পেরেছেন। স্যারের ১ম পুত্র একজন সিনিয়র উপসচিব (বর্তমানে ডেপুটি কমিশনার), ২য় পুত্র সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক, ৩য়টি স্কুল শিক্ষক, ৪র্থটি সহকারী কমিশনার (ম্যাজিস্ট্রেট) এবং ৫মটি সেকশন অফিসার হিসেবে চাকরিরত। জামাই ২টিও সরকারি চাকরিরত। এমতাবস্থায় এক কথায় বলা যায়, স্যার একজন সফল শিক্ষক।
স্যারের একজন প্রিয় ছাত্র হিসেবে আল্লাহ পাকের দরবারে এই কামনা/দোয়া করি, তিনি যেন স্যারের জাগতিক জানা-অজানা সকল অপরাধ মার্জনা করে তাঁকে জান্নাতবাসী করেন এবং তাঁর পরিবার-পরিজনকে সুখে রাখেন।
লেখক: মাওলানা আব্দুস ছাত্তারের প্রাক্তন ছাত্র।
(লেখাটি কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীর বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ মাওলানা আব্দুস ছাত্তারের ছেলে প্রাক্তন সচিব কাজী আখতার হোসেনের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)
১১৯ বার পড়া হয়েছে