প্রিয় নোমান আর নেই
শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬ ৭:৩২ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
আজ (বৃহস্পতিবার) সকাল ১০টা ৩৫ মিনিট।
নোমানের ফোন। মাত্র ১ মিনিট ৬ সেকেন্ড কথা হলো।
— "ভাই, উপজেলা গেটের সামনে বসলাম, আপনি আসেন।"
আমি বললাম, "হ্যাঁ, তুমি বসো, আমি আসছি।"
কে জানত, এটাই হবে নোমানের সঙ্গে আমার শেষ কথা!
বাড়ি থেকে বের হয়ে উপজেলা পরিষদের গেটে ঢুকতেই পিছন থেকে ডাক। ফিরে দেখি নোমান। ঠিক তখনই উপজেলা বিএনপির নেতা রাসেল উদ্দিন বাবুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কয়েক মিনিট কথা হলো। নোমানও এসে শুভেচ্ছা বিনিময় করল। বাবুর কাছে আরও লোকজন জড়ো হওয়ায় তিনি অফিসে বসতে বললেন। কিন্তু আমি বললাম, পরে আসব। কারণ নোমান আমার জন্য অপেক্ষা করছিল।
তার কাছে যেতেই শুরু করল মানুষের দুর্ভোগের কথা।
ভূমি অফিসে ফাইল হারিয়ে যাচ্ছে, আবেদনপত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না—এসব নিয়ে তার গভীর উদ্বেগ। বলল, একজন ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে হবে। এসিল্যান্ড স্যার অফিসে নেই, তাঁর সঙ্গে নিজেই কথা বলবে, প্রয়োজনে অন্য কাউকে দিয়ে ফোনও করাবে।
আমি শুধু বললাম, "আগে এসিল্যান্ডের সঙ্গে কথা বলো। তারপর প্রয়োজন হলে আমাকে জানিও। নোমান বললো- পরে ফোন দেবো ভাই।
কিন্তু নোমান থামতে চায় না।
আবারো বলল, "ভাই, শুধু আমার না, অনেক মানুষ এখানে হয়রানির শিকার হচ্ছে। কিছু একটা করতে হবে। দরকার হলে সাংবাদিকদের ডেকে মানুষের কষ্টগুলো তুলে ধরব।"
এই ছিল নোমান।
নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্য ভাবত। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পেত না।
এরপর আমি প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে গেলাম। সেখান থেকে ভূমি অফিসে। আমাদেরও একটি মিউটেশন বাতিলের আবেদন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সেটির খোঁজ নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।
বিকেলে হঠাৎ ফোন।
আচ্ছু (জাহাঙ্গীর) জিজ্ঞেস করল, "মানিক ভাই নাকি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন?"
কথাটা শুনেই বুক কেঁপে উঠল।
ফোন রাখার আগেই আরেকটি ফোন।
এবার আরও ভয়ংকর খবর।
মানিক ভাই নন...
নোমান (৪৫) আর নেই।
বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
যে ছেলেটার সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা আগেও কথা বলেছি, যার চোখে মানুষের জন্য এত স্বপ্ন দেখেছি, সে কীভাবে এভাবে চলে যেতে পারে?
জানলাম, মানিক ভাইয়ের মোটরসাইকেল নিয়ে কোথাও গিয়েছিল। ফেরার পথে চরাইকোল রেলগেট এলাকায় একটি ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে পৃথিবীর সব সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে গেছে।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
নোমানের মৃত্যু আমাকে ভীষণভাবে ভেঙে দিয়েছে।
ও এখনো অবিবাহিত ছিল। ওদের তিন ভাই-ই আমার খুব প্রিয়। কিন্তু নোমান ছিল আলাদা—খুব, খুব, খুব আপন একজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছিল। বিভিন্ন সময় খণ্ডকালীন চাকরি করেছে। কিন্তু চাকরি কখনো তার পরিচয় ছিল না। তার আসল পরিচয় ছিল—মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আর মানবতার প্রতি গভীর ভালোবাসা।
বয়সে ছোট হলেও সম্পর্কের গভীরতায় সে ছিল আপন ভাইয়ের মতো।
যেখানেই থাকুক, নিয়মিত যোগাযোগ করত। একসময় আমি ফেসবুক ব্যবহার করতাম না। দিনের পর দিন আমাকে বলেছে, "ভাই, ফেসবুকে আসেন।" শেষ পর্যন্ত ওর জোরাজুরিতেই আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট সক্রিয় করা।
কিছুদিন আগেও টেকনাফে কর্মরত ছিল। প্রায়ই রাতে ফোন করত। বলত, "ভাই, বেশি দিন এখানে থাকব না।"
আজ বুঝি, মানুষ জানেই না তার জীবনের সময় কতটুকু।
পদ্মার চরে, মাঠে-ঘাটে, ভেড়ার খামারে, বাগানে—কত জায়গায় যে একসঙ্গে ঘুরেছি! কতবার বলেছে—
"ভাই, দেশি বড়ই বাঁটা হবে, চলে আসুন।"
"আজ আম বাঁটব, অবশ্যই আসবেন।"
"ভেড়া খেতে হবে, চলে আসুন।"
এসব ডাক আর কোনো দিন শোনা হবে না।
অনিয়ম, দুর্নীতি আর মানুষের ভোগান্তির খবর গোপনে আমাকে জানাতে পারলেই যেন ওর শান্তি মিলত। সমাজের ভালো চাওয়ার সেই নির্মল মানসিকতাই ছিল নোমানের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
আজ থেকে আর কোনো দিন সকাল, বিকাল, সন্ধ্যা বা গভীর রাতে নোমানের ফোন আসবে না।
আর কেউ বলবে না—
"ভাই, কোথায় আছেন?"
আর একসঙ্গে বসে চায়ের কাপে গল্প হবে না।
তবুও নোমান হারিয়ে যাবে না।
সে বেঁচে থাকবে আমাদের স্মৃতিতে, তার মানবিকতায়, তার সাহসে, তার ভালোবাসায়।
আল্লাহ, আমার প্রিয় নোমানকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। তার সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিন। তার শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি দান করুন।
বিদায়, প্রিয় নোমান।
তুমি চলে গেছ, কিন্তু তোমার স্মৃতিগুলো আজীবন আমাদের হৃদয়ের গভীরে বেঁচে থাকবে।
লেখক: হাবীব চৌহান, সাংবাদিক।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)
১৫৩ বার পড়া হয়েছে