সর্বশেষ

মতামত

৫ আগস্টের চেতনায় গণমানুষের কল্যাণ

লিটন আব্বাস
লিটন আব্বাস

বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬ ৭:৫৩ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ইতিহাসের গতিপথ সবসময় মসৃণ থাকে না; মাঝে মাঝে তা সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ক্ষোভ, ত্যাগ ও আকাঙ্ক্ষাকে সম্বল করে অভূতপূর্ব বাঁক নেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে ৫ আগস্ট তেমনই একটি অবিস্মরণীয় দিন। ২০২৪ সালের এই দিনে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। এই গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি সরকারের পতন ছিল না; বরং তা ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা বৈষম্য, অন্যায় ও শাসনতান্ত্রিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের তীব্র প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ ঘোষণা। আজ আমরা ‘গণঅভ্যুত্থান দিবস’ পালন করছি।
লিটন আব্বাস

আমাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই দিবসের মূল চেতনাকে ধারণ করে গণমানুষের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করা। এটি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে কাঠামোগত সংস্কার এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করার নামান্তর।

৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল বছরের পর বছর ধরে চলা অধিকার হরণ, মেধার অবমূল্যায়ন এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এই সুদীর্ঘ লড়াই ক্রমান্বয়ে এক দফার আন্দোলনে রূপ নেয়; যেখানে শামিল হয়েছিলেন কৃষক, শ্রমিক, চাকরিজীবী, শিক্ষক ও গৃহিণীসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। এই আন্দোলনে দেশের তরুণ সমাজ, বিশেষ করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে অসীম সাহসের পরিচয় দিয়েছে, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। শত শত তরুণের আত্মত্যাগ এবং হাজারো মানুষের পঙ্গুত্ব বরণের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই অর্জনকে টেকসই করতে হলে প্রথম কাজই হবে তাদের এই সর্বোচ্চ ত্যাগকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ সম্মান ও স্বীকৃতি দেওয়া। তরুণদের এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্র কোনো একক গোষ্ঠী বা দলের নয়, রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের।

একটি টেকসই ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের প্রথম শর্ত হলো সমাজকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করা। অতীতে আমরা দেখেছি, কীভাবে বিভাজনের রাজনীতি দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রকে খণ্ডিত করা হয়েছে। ৫ আগস্টের চেতনা আমাদের শেখায়—দল-মত, ধর্ম-বর্ণ কিংবা ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে। রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করবে না। একটি সংস্কারমুখী সমাজ গঠনের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের প্রচলিত ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে ফেলতে হবে। আইন ও নীতিমালার এমন সংস্কার প্রয়োজন, যা কোনো ব্যক্তিকে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সুযোগ দেবে না। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল একটি প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব।

—একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এর পাশাপাশি নাগরিকের বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। বিগত বছরগুলোতে ভিন্নমতের ওপর যে দমনপীড়ন চালানো হয়েছিল, ৫ আগস্টের পর সেই ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার উপযোগী পরিবেশ সম্পূর্ণভাবে তৈরি করতে হবে। প্রতিটি নাগরিক যেন নির্ভয়ে নিজ মতামত প্রকাশ করতে পারেন এবং গণমাধ্যম যেন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে—তা নিশ্চিত করাই হবে গণকল্যাণের অন্যতম লক্ষণ। এর সাথে যুক্ত করতে হবে সামাজিক ন্যায়বিচার। আইনের শাসন এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তি এবং সাধারণ নাগরিক আইনের চোখে সমান আশ্রয় পান। বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে, যেন কোনো নাগরিককে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে না হয়।

—বাংলাদেশকে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন অপরিহার্য। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বিচার বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সব গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে দলীয়করণ ও দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করতে হবে। অতীতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের কল্যাণে ব্যবহার না করে ক্ষমতার হাতিয়ার বানানোর যে প্রবণতা ছিল, তা চিরতরে বন্ধ করা প্রয়োজন। সুশাসন প্রতিষ্ঠার অর্থ হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। প্রতিটি সরকারি অফিসে কাজের গতিশীলতা বাড়াতে হবে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে। যখন সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে হয়রানি ছাড়া আইনি সহায়তা পাবে, কিংবা কোনো দপ্তরে ঘুষ ছাড়া নিজের অধিকার আদায় করতে পারবে, তখনই বোঝা যাবে ৫ আগস্টের অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে।

—বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম বড় ক্ষত হলো প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি। এক পক্ষ ক্ষমতায় এলে অন্য পক্ষকে দমন করার যে চক্র যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, তা দেশের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বারবার ব্যাহত করেছে। ৫ আগস্টের পর আমাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হলো এই প্রতিহিংসার বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসা। আইন নিজের হাতে না তুলে নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক নিপীড়ন বা ভাঙচুরের সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে সকল রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন। রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের উন্নয়ন এবং জনগণের কল্যাণের প্রশ্নে সবাইকে এক টেবিলে বসতে হবে। ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশই কেবল বহির্বিশ্বের যেকোনো ষড়যন্ত্র ও অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলা করতে পারে।

রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অর্থনৈতিক মুক্তি। বর্তমানে দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উর্ধ্বগতির কারণে চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। বাজার সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যারা জনগণের পকেট কাটছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজসহ প্রতিটি জরুরি পণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। এর পাশাপাশি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হবে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। সাধারণ মানুষের ঘরে তিন বেলা খাবারের নিশ্চয়তা থাকলেই কেবল প্রকৃত গণকল্যাণ সাধিত হবে।

—৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি ছিল তরুণ ছাত্র সমাজ। তাদের প্রধান দাবি ছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজ এবং মেধার সঠিক মূল্যায়ন। বছরের পর বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁস, বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা এবং দলীয় তদবিরের কারণে দেশের লাখ লাখ যোগ্য ও মেধাবী তরুণ চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি—সব ধরনের কর্মসংস্থানে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক ও তদবিরমুক্ত করতে হবে। বেকারত্ব দূরীকরণের জন্য কেবল চাকরির ওপর নির্ভর না করে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সহজ শর্তে ঋণ ও কারিগরি সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে আধুনিকায়ন করতে হবে, যেন তা বৈশ্বিক বাজারের চাহিদার সাথে সংগতিপূর্ণ হয় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারে। তরুণদের মেধা যদি দেশে মূল্যায়িত হয়, তবে দেশ গঠনে তারা তাদের সর্বোচ্চ অবদান রাখতে পারবে।

—৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এই দিনটি প্রমাণ করে যে, জনগণ যদি কোনো শাসককে প্রত্যাখ্যান করে, তবে কোনো শক্তিই তাকে টিকিয়ে রাখতে পারে না। তাই রাজনীতি ও প্রশাসনের সাথে যুক্ত সবাইকে 'শাসক' হওয়ার প্রাচীন ও ঔপনিবেশিক মানসিকতা পরিহার করে 'জনগণের সেবক' হওয়ার মানসিকতা ধারণ করতে হবে। ক্ষমতা কোনো ভোগের বস্তু নয়; এটি জনগণের আমানত ও দায়িত্ব। জনপ্রতিনিধি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে তাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার হতে হবে। ভিআইপি সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে। নেতার আচরণে যেন অহংকার নয়, বরং বিনয় এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রকাশ পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। ৫ আগস্ট কেবল ক্যালেন্ডারের একটি পাতা নয়; এ হলো নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের জীবন্ত ইশতেহার। এই দিনে ছাত্র-জনতা যে রক্ত দিয়েছে, তা দেশের সকলের ওপর বিশাল দায়িত্ব অর্পণ করেছে। আমরা যদি আবার সেই পুরোনো বৈষম্য, দুর্নীতি ও অরাজকতার দিকে ফিরে যাই, তবে এই বিশাল আত্মত্যাগ ব্যর্থ হবে। তাই ক্ষণিকের আবেগ সরিয়ে রেখে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে মনোনিবেশ করা উচিত। একটি বৈষম্যহীন, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং সাম্যবাদী নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের যার যার অবস্থান থেকে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করুক, প্রশাসন হোক জনমুখী এবং নাগরিকরা হোন সচেতন। সম্মিলিত এই প্রচেষ্টার মাধ্যমেই ৫ আগস্টের চেতনা বাস্তব রূপ লাভ করুক এবং গণমানুষের প্রকৃত কল্যাণ ও মুক্তি নিশ্চিত হোক।

২১৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন