সিলেট ভিপি কুটুর বাসভবন এখন নিষিদ্ধ আ. লীগের আস্তানা
সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬ ৭:১১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
সিলেটের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত জনপদ টিলাগড়। ছাত্ররাজনীতির সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় গত দেড় দশকে গড়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগের চার শক্তিশালী বলয়। ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই বলয়গুলোর শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে চলে গেলেও, বর্তমানে এক রহস্যজনক ‘রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়’ প্রকাশ্যে ফিরেছেন সাবেক ভিপি আব্দুল হানিফ কুটু।
অভিযোগ উঠেছে, বিএনপির কিছু নেতার আশ্রয়ে তিনি শুধু প্রকাশ্যেই ফেরেননি, বরং তাঁর বাসভবন এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের গোপন আস্তানায় পরিণত হয়েছে।
আব্দুল হানিফ কুটুর রাজনৈতিক উত্থান আশির দশকে। ১৯৮৬-৮৭ সালে ছাত্রলীগের ব্যানারে এমসি ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জিএস নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে লাইমলাইটে আসেন তিনি। এরপর ১৯৯১-৯২ সালে সিলেট সরকারি ডিগ্রি কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। জেলা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা কুটু ধীরে ধীরে টিলাগড় এলাকায় আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রভাবশালী নেতায় পরিণত হন।
টিলাগড় এলাকায় সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী, মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা আজাদুর রহমান আজাদ এবং জেলা আওয়ামী লীগের রনজিত সরকারের পাশাপাশি কুটু ও তাঁর স্ত্রী নাজনিন আক্তার কণা মিলে গড়ে তুলেছিলেন একটি শক্তিশালী বলয়। তাঁর স্ত্রী কণা সিলেট জেলা যুব মহিলা লীগের সভানেত্রী ও সাবেক কাউন্সিলর হিসেবে এলাকায় ব্যাপক প্রভাবশালী ছিলেন। দীর্ঘ ১৭ বছর টিলাগড় এলাকায় কুটু গ্রুপের বিরুদ্ধে সাধারণ ব্যবসায়ী ও বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন, হামলা ও মামলার অভিযোগ মুখে মুখে।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সিলেটের অনেক শীর্ষ নেতা দেশ ছাড়লেও কুটু ছিলেন আত্মগোপনে। তবে কয়েক মাস যেতে না যেতেই দৃশ্যপট পাল্টে যায়। স্থানীয়দের দাবি, বিএনপির একটি প্রভাবশালী অংশের ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি ফের টিলাগড়ে প্রকাশ্যে বিচরণ শুরু করেছেন। যেখানে শফিক চৌধুরী, আজাদ বা রনজিত সরকারের মতো নেতারা প্রবাসে পলাতক, সেখানে কুটুর এই বীরদর্পে ফেরা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কুটুর বাসভবন। অভিযোগ উঠেছে, বর্তমানে এই বাড়িটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রায়ই গভীর রাতে সেখানে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা গোপন বৈঠক করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা জানান, সম্প্রতি টিলাগড় ও শাহী ঈদগাহ এলাকায় ছাত্রলীগের যে ঝটিকা মিছিল হয়েছে, তার নীলনকশা তৈরি হয়েছে কুটুর বাসায়। মিছিলের আগের দিন সন্দেহভাজন অনেককেই তাঁর বাসায় ঢুকতে ও বের হতে দেখা গেছে। প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি এখনো অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছেন।
কুটুর এই প্রকাশ্য বিচরণ ও গোপন তৎপরতায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা। তাঁরা বলছেন, দীর্ঘ ১৭ বছর যাঁদের নির্যাতনে শত শত নেতাকর্মী জেল খেটেছেন, ঘরছাড়া হয়েছেন, তাঁদেরই এখন বিএনপির কিছু নেতার আশ্রয়ে নিরাপদ থাকা মেনে নেওয়া যায় না।
টিলাগড় এলাকার একাধিক বিএনপি নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শফিক-আজাদ-রনজিতরা পালিয়েছে, কিন্তু কুটু বহাল তবিয়তে। আমাদের দলেরই কিছু লোক তাঁকে শেল্টার দিচ্ছে। তাঁর বাসায় এখনো নিষিদ্ধ সংগঠনের আড্ডা বসে। দ্রুত তাঁকে গ্রেপ্তার না করলে সিলেটজুড়ে আবারও নৈরাজ্য সৃষ্টির সুযোগ পাবে স্বৈরাচারের দোসররা।
ছাত্রলীগের সাবেক ভিপি থেকে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা, আর এখন ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে’ থাকা আব্দুল হানিফ কুটু সিলেট রাজনীতির এক অমীমাংসিত সমীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। সরকারের বর্তমান স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে তাঁর বাসা থেকে কোনো বড় ষড়যন্ত্র হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সচেতন সিলেটবাসী।
১৫০ বার পড়া হয়েছে