সর্বশেষ

ফিচার

গুগলের টাইটানিক আর জেমিনির ভাঙা কম্পাস

মনজুর এহসান চৌধুরী
মনজুর এহসান চৌধুরী

শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬ ১:৪৭ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, কোনো সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী নয়। রোমান সাম্রাজ্য থেকে নোকিয়া, ব্ল্যাকবেরি, ইয়াহু—সবাই একদিন শিখর থেকে নিচে পড়েছে। তাদের পতনের পেছনে ছিল তিনটি রোগ: অহংকার, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতা, আর ভেতরের ব্যর্থতাকে ঢাকতে সাফাই গাওয়ার অভ্যাস। আজ Google আর তাদের এআই প্ল্যাটফর্ম Gemini-কে ব্যবহার করতে গিয়ে আমি যে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছি, সেখানে ঠিক এই তিনটি লক্ষণকেই আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
মনজুর এহসান চৌধুরী

আমার ক্ষোভের শুরুটা হয়েছে সরাসরি Gemini ব্যবহার করতে গিয়ে। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমি তথ্যের সঙ্গে আপস করতে পারি না। কিন্তু বাস্তবে Gemini-কে যখন খবরের ব্যাকগ্রাউন্ড, তথ্য, টাইমলাইন বা কোনো ইস্যুর বিশদ ব্যাখ্যা দিতে বলেছি, তখন প্রায়ই দেখেছি—তথ্য ১০টির মধ্যে ৭–৮টিই ভুল, অতিরঞ্জিত বা বানানো। আমি যাচাই করতে গিয়ে আবিষ্কার করেছি, Gemini অনেক সময় এমন তথ্য “কনফিডেন্সের সঙ্গে” বলে, যেগুলোর উৎসই ঠিক নেই, বা বাস্তবে কোনোদিন ঘটেইনি। আমার মতে এটি শুধুই প্রযুক্তিগত দুর্বলতা না, বরং ব্যবহারকারীর সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা। কারণ আমি যখন একটি বিশ্বখ্যাত কোম্পানির এআই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করি, তখন অন্তত একটি ন্যূনতম নির্ভুলতা ও দায়িত্বশীলতা আশা করাটা অযৌক্তিক কিছু নয়।

এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়েও আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো একই ছবি দেখাচ্ছে। ইউরোপিয়ান ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন (EBU) আর BBC মিলিয়ে যে বড় স্টাডিটা করেছে, সেখানে দেখা গেছে খবর–সংক্রান্ত কনটেন্ট নিয়ে এআই–অ্যাসিস্ট্যান্টদের দেওয়া উত্তর প্রায় অর্ধেক সময়েই বিকৃত, অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপিত হয়, আর Gemini সেখানে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত মডেলগুলোর একটি হিসেবে উঠে এসেছে। অর্থাৎ আমি একা নই—বিশ্বজুড়ে নিউজরুম আর সাংবাদিকদের মাঝেও এই এআই–ভিত্তিক ভুল তথ্য এখন একটা সিরিয়াস উদ্বেগের বিষয়।

এর চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে, গুগলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মানসিকতা। কোম্পানির সিইও সুন্দর পিচাই BBC-র সামনে দাঁড়িয়ে মূলত এই কথাই বলেছেন—AI-এর দেওয়া তথ্য অন্ধভাবে বিশ্বাস করা যাবে না, ভুল হওয়াটা নাকি “স্বাভাবিক” ব্যাপার। কথা শুনে আমার মনে হয়েছে, যেন তিনি নিজের কান কেটে নিয়ে ঘোষণা দিচ্ছেন—“আমারটা ঠিক নেই, তাই কারওটার ওপরই ভরসা কোরো না।” তার নিজের Gemini যখন বারবার ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে, তখন সেই ব্যর্থতার দায় স্বীকার করার বদলে তিনি যেন পুরো এআই ইন্ডাস্ট্রিকেই একসাথে সন্দেহের ঘেরাটোপে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজের দুর্বলতাকে হালকা করে দেখাতে চাইছেন। আমার কাছে এটা একজন ভোক্তা হিসেবে অপমানজনকই নয়, বরং কর্পোরেট দায় এড়ানোর এক কাঁচা চেষ্টা।

অন্যদিকে, আজকের বাস্তবতা হলো—ছোট ছোট এআই কোম্পানি ও প্ল্যাটফর্মগুলো দিনরাত খেটেখুটে ব্যবহারকারীর আস্থা জিততে চেষ্টা করছে। তারা জানে, বেশি ভুল করলে মানুষ সঙ্গে সঙ্গে অন্য এআই-তে চলে যাবে। তাই তারা গতি, নির্ভুলতা আর অভিজ্ঞতা—এই তিনটাকে উন্নত করতে বাধ্য। আমি নিজে দেখেছি, এখন অনেকেই খবরের প্রাথমিক খসড়া, রিসার্চ, আউটলাইন, এমনকি বিশ্লেষণের প্রথম ড্রাফটও সরাসরি এআই দিয়ে করিয়ে নিচ্ছে। এআই হয়তো ১০০টির মধ্যে ৯০–৯৫টি তথ্য ঠিক দেয়, বাকি ভুলগুলো মানুষ নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা দিয়ে সংশোধন করে। ফলে আগে যেখানে গুগলে গিয়ে লিঙ্কের পর লিঙ্ক ঘেঁটে তথ্য জোড়া লাগাতে হতো, এখন সেই অনেক কাজই এআই-কে দিয়ে করিয়ে নেওয়া যায়।

এটাই গুগলের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকেত। আমি যখন নিজের কাজের প্রবাহে Google Search-এর পরিবর্তে সরাসরি এআই-কে প্রথম ধাপে বসিয়ে দিচ্ছি, তখন আসলে গুগলের সেই পুরনো “অপরিহার্য” অবস্থানটাই ভেঙে যাচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা যদি কোটি কোটি ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়, তবে গুগলের বিজ্ঞাপন-নির্ভর সার্চ সাম্রাজ্যের ভীত কেঁপে উঠবেই। আর তার সঙ্গে যদি যোগ হয় Gemini-র ৯০% ভুল তথ্যের মতো বাস্তবতা এবং সিইও-র “সব এআই-ই অবিশ্বাসযোগ্য” ধরণের বক্তব্য, তাহলে ছবি আরও স্পষ্ট হয়—এটি শুধুই টেকনিকাল সমস্যা নয়, এটি এক গর্বিত টাইটানিকের হাতে ভাঙা কম্পাস নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার মতো অবস্থা।

তাই আমি যখন বলি, আজকের এই ছোট ছোট এআই ডিঙি নৌকার কাছে গুগলের গর্বিত টাইটানিক একদিন হোঁচট খেতে পারে—এটা কোনো আবেগী ভবিষ্যদ্বাণী না; বরং একজন ভুক্তভোগী ব্যবহারকারী হিসেবে Gemini-র ব্যর্থতা, সুন্দর পিচাইয়ের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক গবেষণা আর ব্যবহারকারীর আচরণের বাস্তব পরিবর্তনের ওপর দাঁড়িয়েই বলা কথা।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও লেখক।

১৩২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
ফিচার নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন