মাগুরায় দিনে-রাতে দফায় দফায় লোডশেডিং, বিপাকে ব্যবসায়ী-কৃষক
মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬ ৮:০২ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
মাগুরায় বিদ্যুতের তীব্র সংকটে বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, কৃষকসহ সাধারণ মানুষ। জেলা শহরে দিনে-রাতে ১৫ থেকে ১৮ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গ্রামাঞ্চলের কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা। বিদ্যুতের অভাবে ব্যবসায় উৎপাদন ও আয় কমার পাশাপাশি সেচব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে।
মাগুরা শহরের বাটিকাডাংগা বাজারে পারিবারিক জায়গায় ছোট একটি মিল পরিচালনা করেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অনিক সরকার। তীব্র লোডশেডিংয়ে প্রায় তিন মাস ধরে বিপর্যস্ত তাঁর ব্যবসা। বিদ্যুৎ না থাকায় নিয়মিত কাজ করতে না পারলেও প্রিপেইড মিটারে ন্যূনতম চার্জসহ বিদ্যুৎ বিলের খরচ গুনতে হচ্ছে তাঁকে।
অনিক সরকার জানান, তাঁর ১২ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ সংযোগে মাসিক ন্যূনতম চার্জ ১ হাজার ২০০ টাকা। মিটারে ২ হাজার টাকা রিচার্জ করলে ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুৎ পান প্রায় ৮০০ টাকার। তাঁর মিলে তেল, চালের গুঁড়া ও ডাল ভাঙানোর একটি করে মেশিন রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পেলে প্রতিদিন কমপক্ষে ১ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে গত প্রায় তিন মাসে বিদ্যুৎ খরচের টাকাও তুলতে পারছেন না তিনি।
অনিক বলেন, ঘরটি নিজেদের হওয়ায় ভাড়া দিতে হয় না। এ কারণে কোনোভাবে ব্যবসাটি টিকিয়ে রেখেছেন। বিদ্যুতের পরিস্থিতি এমনই থাকলে যেকোনো সময় ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হতে পারে।
একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন মাগুরা শহরের নতুন বাজার এলাকার লেদ ব্যবসায়ী ইকবাল হোসেন, শফিকুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাঁদের ভাষ্য, বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে মেশিন চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন কমার পাশাপাশি আয়ও কমে যাচ্ছে।
শহরের একজন কম্পিউটার ব্যবসায়ী লিটন সাহা বলেন, কখন বিদ্যুৎ চলে যায় আর কখন আসে, তার কোনো ঠিক নেই। দিন-রাতের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অনলাইন আবেদনসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ সময়মতো শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে ব্যবসার পাশাপাশি চাকরি, সামাজিক নিরাপত্তা ও ভিসাসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের সময়সূচি আগেই জানিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
গ্রামাঞ্চলেও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে। জেলার শ্রীপুর উপজেলার কমলাপুর গ্রামের গৃহবধূ শ্যামলী আখতার ও মর্জিনা বেগমসহ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, তাঁদের এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৮ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ঘুমাতে কষ্ট হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকলেও নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।
লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষকেরাও সমস্যায় পড়েছেন। নড়িহাটি গ্রামের কৃষক আজগর লস্কর জানান, চলতি আমন মৌসুমে তাঁদের এলাকার অনেক কৃষক সেচের জন্য বিদ্যুৎচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দিন-রাতের বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় প্রয়োজনমতো সেচ দেওয়া যাচ্ছে না। এতে আমন ধানের ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. মহিতুল ইসলাম বলেন, মাগুরা জেলার প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার গ্রাহকের জন্য প্রতিদিন গড়ে ৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে চাহিদার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে লোডশেডিং হওয়ায় স্থানীয় চাহিদা ও সরবরাহের হিসাবেও কিছুটা গরমিল হচ্ছে।
অন্যদিকে মাগুরা শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থাতেও একই সংকট দেখা দিয়েছে। শহরের ওজোপাডিকোর আওতাধীন এলাকায় প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৮ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে স্বাভাবিক জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক প্রভাব পড়ছে।
পিডিবি মাগুরার আবাসিক প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শহরে প্রতিদিন প্রায় ১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৭ থেকে ৯ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন।
১০৯ বার পড়া হয়েছে