সর্বশেষ

সারাদেশ

রিয়াদে অগ্নিকাণ্ড: নওগাঁর ১২ পরিবারে শোকের মাতম, এক মায়ের ২ সন্তানই নেই

মামুনুর রশীদ বাবু, নওগাঁ
মামুনুর রশীদ বাবু, নওগাঁ

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬ ৭:০২ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একসঙ্গে ১৬ বাংলাদেশির প্রাণহানির ঘটনায় নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিহতদের মধ্যে আত্রাইয়ের ১১ জন এবং নওগাঁ সদর উপজেলার একজন রয়েছেন। প্রবাসে উপার্জন করে পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার স্বপ্ন দেখা এসব মানুষ এখন ফিরছেন নিথর দেহে।
২ সন্তানহারা মা

নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের পরিবেশ। সোমবার (১০ আগস্ট) আত্রাইয়ের কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহতদের বাড়িতে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। সন্তান হারানোর শোকে অনেক পরিবারে চলছে মাতম।

‘চলে যাচ্ছি মা, আর কথা হবে না’
দুই সন্তান মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিককে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন গাফফার প্রামাণিক। আর মা ময়না খাতুন বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।

ময়না খাতুন জানান, মৃত্যুর আগে ছেলে মোহন তাকে একটি অডিও বার্তা পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘চলে যাচ্ছি মা, আর কথা হবে না।’ ছেলের সেই শেষ কথাই এখন বারবার মনে পড়ছে তার। সন্তানদের মরদেহ দেশে এনে শেষবারের মতো দেখতে চান তিনি।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মোহন সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে বাড়ির নির্মাণকাজ শেষ করে বিয়ে করার পরিকল্পনা করেছিলেন। বাড়ির চারপাশে পড়ে থাকা নির্মাণসামগ্রী এখন সেই অপূর্ণ স্বপ্নের সাক্ষী হয়ে আছে।

৮ বছর পরেও ফেরা হলো না কলিমের
একই গ্রামের কলিমউদ্দিন প্রামাণিকও নিহত হয়েছেন রিয়াদের ওই অগ্নিকাণ্ডে। প্রায় আট বছর আগে জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি।

ছেলের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর থেকেই মা কারিমা বেগম বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি মনে পড়লেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। তার শেষ ইচ্ছা, ছেলের মরদেহ দেশে এনে নিজস্ব কবরস্থানে দাফন করা।

১৪ দিনের মেয়েকে রেখে চিরবিদায় রুবেলের
নিহত রুবেল প্রামাণিকের (৩০) বাড়িও গন্ডগোহালী গ্রামে। মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর বাবা মোহাম্মদ সাইদুর প্রামাণিকের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো বাড়ি।

স্বজনেরা জানান, মাত্র ১৪ দিন আগে রুবেলের একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। প্রবাসে থাকা বাবার আর মেয়েকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ হলো না। নতুন সন্তানের মুখ দেখার আগেই রিয়াদের আগুনে থেমে গেল তার জীবন।

স্বচ্ছলতার আশায় বিদেশ, ফিরল শোকের সংবাদ
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিহতরা প্রায় সবাই পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। কেউ দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কর্মরত ছিলেন, কেউ সংসারের খরচ চালিয়েছেন, আবার কেউ ঋণ পরিশোধ করে দেশে ফিরে নতুন জীবন শুরুর পরিকল্পনা করছিলেন।

কিন্তু রোববার দুপুরে রিয়াদের শিফা এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় আগুন লাগার ঘটনায় তাদের সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়।

স্থানীয়দের দাবি, নিহতদের মধ্যে কয়েকজনের সৌদি আরবে অবস্থানের কাগজপত্র নিয়ে জটিলতা থাকতে পারে। মরদেহ দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে যাতে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

মরদেহ ফেরাতে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে।

উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আত্রাইয়ের নিহত ১১ পরিবারের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে মোট ২ লাখ ২০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিটি পরিবারকে ৩ লাখ টাকা করে সহায়তা দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত আত্রাই উপজেলার ১১ জন ও নওগাঁ সদর উপজেলার একজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহতদের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।

নিহতদের পরিচয়
আত্রাই উপজেলার নিহতরা হলেন—বিশা ইউনিয়নের ডুবাই গ্রামের মৃত বাদল তরফদারের ছেলে সোহেল রানা সুমন (৩৫), চঞ্চলের ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ (২৭); কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালী গ্রামের গাফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিক, বজলুর রহমানের ছেলে কলিম উদ্দিন (৩৫); পারকাসুন্দা গ্রামের মৃত তমেজ উদ্দিনের ছেলে আব্দুল জলিল (৩৮); বিশা গ্রামের আজহারের ছেলে সাগর আলী (৩১), মজনু আলীর ছেলে মজিদুল সরদার সজীব (৩৪); উদনপৈ গ্রামের ময়েন উদ্দিনের ছেলে ফরিদ শেখ (৩২) এবং মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাস আলী প্রামাণিকের ছেলে মিনহাজ প্রামাণিক (৩২)।

এ ছাড়া নওগাঁ সদর উপজেলার পার নওগাঁ পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস মহল্লার মজনুর রহমানের ছেলে মোহাম্মদ শাহিন হোসেনও এই অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন।

১১০ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন