সর্বশেষ

সাহিত্য

নজরুল কাব্যে সামাজিক-রাজনৈতিক-সাহিত্যিক বিদ্রোহ 

গাউসুর রহমান
গাউসুর রহমান

সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬ ৫:২০ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে বাংলার সাহিত্যাকাশ যখন রবীন্দ্র-প্রতিভার স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নায় প্লাবিত, যখন ধ্রুপদী আভিজাত্যে বাংলা কবিতা এক অনন্য উচ্চতায় আসীন, ঠিক তখনই এক প্রবল কালবৈশাখীর মতো কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব।
 গাউসুর রহমান

সে যেন এক অবিনাশী নাক্ষত্রিক বিস্ফোরণ, যা কেবল জীর্ণতাকে ধুয়ে-মুছে সাফ করেনি, বরং পরাধীন জাতির মেরুদণ্ডে হিল্লোলিত করেছে এক দুঃসাহসী প্রাণের স্পন্দন। নজরুলের বিদ্রোহ কোনো আকস্মিক চিৎকার ছিল না; তা ছিল এক গভীরতর জীবন-দর্শনের বহিঃপ্রকাশ, যা একইসঙ্গে নন্দনতাত্ত্বিক ও আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের ইশতেহার। 

মানবিক মূল্যবোধে আস্থাশীল নজরুল বহুবিচিত্র জীবনাবেগে অস্থির ছিলেন। তিনি জীবনের বস্তুরূপকেই প্রাধান্য দিয়েছেন, ভাববিগ্রহ তাঁর কবিতায় গুরুত্ব পায়নি। আত্মশক্তি ও মানববিশ্বাসের প্রাবল্যই নজরুলের কবিতার প্রাণশক্তি । তিনি মানুষের অবসন্ন চেতনাস্তরে নতুন কাব্যবস্তু সংযুক্ত করেছিলেন। তিনি তাঁর কোনো কোনো কবিতায় গতির নিরুপিত সীমা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছেন অবিরাম স্বতঃস্ফূর্ততায় । তিনি বলেন :
“ঝড়- ঝড়- ঝড় আমি- আমি ঝড় 
শন্- শুন- শনশন শন- কড় কড় কড়
কাঁদে মোর আগমনী আকাশ বাতাস বনানীতে
[13]
“আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লবহেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু ।
ঐ বামন বিধি সে আমারে ধরিতে বাড়িয়েছিল রে হাত, মম অগ্নি-দাহনে জ্বলে পুরে তাই ঠুটো সে জগন্নাথ আমি জানি, জানি ঐ স্রষ্টার ফাঁকি, সৃষ্টির ঐ চাতুরী,
তাই বিধি ও নিয়মে লাথি মেরে, ঠুকি বিধাতার বুকে হাতুড়ি । আমি জানি জানি ঐ ভুয়ো ঈশ্বর দিয়ে যা হয়নি হবে তা'
,
তাই বিপ্লব আনি, বিদ্রোহ করি, নেচে নেচে দেই গোঁফে তাও ।” [3]
“আমি বিধির বিধান ভাঙিয়াছি, আমি এমনি শক্তিমান!
মম চরণের তলে, মরণের মার খেয়ে মরে ভগবান।'
[1]

ব্যক্তি, সময় ও সমষ্টি চেতনার মধ্য দিয়ে নজরুল বাংলা কবিতার বিষয়বস্তু এবং কাঠামোগত রূপান্তরের পথপরিক্রমায় রীতিমতো বিপ্লব সংঘটিত করেন। তাঁর উচ্চারিত বিদ্রোহবোধ, সংবেদনশীল সৃজনীব্যক্তিত্ব তাঁকে আত্মমুগ্ধ চেতনারস্তর এবং অন্তর্মুখী স্বভাব থেকে মুক্তি দিয়ে জনতার কাঠগড়ায় এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। ফলে তিনি ভারতীয় রাষ্ট্রসত্তার, বাঙালি সত্তার, মুসলমানের ঐতিহ্যগত ও ব্যবহারিক সত্তার এবং হিন্দুর পৌরাণিক সত্তার অভূতপূর্ব মিশেলে একটি সুসংহত বাণীরূপ দান করেন বাংলা কবিতাকে ।
তিনি তাই উচ্চারণ করেন :
‘মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ; আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস।' [11]
‘আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য-পাগল,
সিন্ধুপারের সিংহ-দ্বারে ধমক হেনে ভাল
মৃত্যু-গহন অন্ধ-কূপে
মহাকালের চন্ড-রূপে 
ধূম্ৰ-ধূপে
বজ্র শিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ঙ্কর।'
[2]

নজরুলের কাব্য-বিদ্রোহের প্রথম পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর প্রকরণ ও ভাষার অন্দরমহলে। হ্যারল্ড ব্লুম তাঁর ‘The Anxiety of Influence’ তত্ত্বে [18] যেভাবে উত্তরসূরি কবির লড়াইয়ের কথা বলেছেন, নজরুল ছিলেন সেই লড়াইয়ের এক সার্থক ও সহজাত বীর। তিনি বাংলা কবিতার আভিজাত্যের প্রাচীর ভেঙে দিয়ে তাতে আরবি, ফারসি ও তুর্কি শব্দের এক আশ্চর্য সংশ্লেষণ ঘটালেন। এই ভাষাগত সংকরায়ণ কেবল আঙ্গিকের কারসাজি ছিল না, বরং তা ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা আধিপত্যবাদী সাংস্কৃতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে এক শৈল্পিক চ্যালেঞ্জ।

তাঁর কবিতায় যখন ধ্বনিত হয় ‘মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ; আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস।’ [11]  

তখন বোঝা যায়, তিনি মিথোলজি বা পুরাণের চিরায়ত অর্থকে উল্টে দিচ্ছেন। তিনি প্রথাগত দেবতার স্থানে এক অনিঃশেষ মানবিক ‘আমি’-কে স্থাপন করছেন। নজরুলের এই বিদ্রোহী সত্তা সমকালীন ইউরোপীয় আধুনিকতার মতো কেবল নৈরাশ্য বা শূন্যতার কথা বলেনি, বরং তা ছিল গতির ও সাহসের জয়গান। তাঁর কবিতার ছন্দ রণ-সংগীতের লয় অনুসরণ করে, যেখানে যুক্তবর্ণের ঝঙ্কার এক বীরত্বের আবহ তৈরি করে। অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় নজরুলের এই আত্মঘোষণাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একে ‘রোমান্টিক অহংবাদী ব্যক্তিত্বের বজ্র-নির্ঘোষ’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে নজরুলের স্বাতন্ত্র্য হলো, তাঁর বিদ্রোহ একান্তভাবেই এ দেশের মাটির সঙ্গে লগ্ন।

এটি স্বীকার করতেই হবে যে, নজরুলের সাহিত্য প্রবাহের প্রধান ধারাটি প্রকৃতপক্ষে কালের হাতের দান। তাঁর সাহিত্যের কবচকুন্ডল স্বদেশ ও স্বকাল। স্বদেশপ্রাণতা তাঁর কাব্যে অভূতপূর্ব রস সঞ্চার করেছে। নজরুলের স্বদেশ প্রাণতা প্রাণ ও পুষ্টি পেয়েছে স্বদেশের আলো-হাওয়া থেকে, স্বদেশের আবহাওয়া থেকে । আর এই স্বদেশপ্রাণতা রসও আহরণ করেছে স্বদেশের আলো-হাওয়া, জলবায়ু থেকে।
নজরুল জানতেন-ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন তিনটি ধারায় প্রবাহিত হয়েছিলো। এই তিনধারার মধ্যে রয়েছেঃ কংগ্রেসবাদী আন্দোলন, সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন ও কমিউনিস্ট আন্দোলন। উল্লেখ্য স্বাধীনতা আন্দোলনের উল্লেখিত তিনধারায় প্রবাহিত হয়ে এবং মুক্তি সংগ্রামের বিভিন্ন বিহঙ্গ অবলোকন করে নজরুল তাঁর স্বাধীতাবাদী চেতনাকে শাণিত ও ঋদ্ধ করেছিলেন। বাস্তব কারণেই নজরুল গান্ধীর অহিংসানীতি ও চরকার বিরোধিতা করেছিলেন। কংগ্রেসের গান্ধীবাদী ও গান্ধীবিরোধী উভয় গ্রুপের সঙ্গে নজরুলের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো। গান্ধীবিরোধী বক্তব্য উচ্চারণ করেছেন নজরুল এভাবেঃ

‘জাগো রে জোয়ান ঘুমায়ো না ভুয়ো শান্তির বাণী শুনি  অনেক দধীচী হাড় দিল ভাই,
দানব-দৈত্য তবু মরে নাই
সুতা দিয়ে মোরা স্বাধীনতা চাই, বসে বসে কাল গুনি!
জাগোরে জোয়ান! বাত ধরে গেল মিথ্যার তাঁত বুনি!'
[10]

গান্ধী-নীতির বেআব্রু কটাক্ষ করতেও নজরুল কুণ্ঠিত ছিলেন না। কিন্তু, তাই বলে নজরুল কমিউনিস্ট ছিলেন না। অবশ্য তাঁর কবিমানসে কমিউনিজমের বিচিত্র প্রভাব কার্যকরি ছিরো। কমরেড মুঝফ্ফর আহমদের সঙ্গেও ছিলো নজরুলের অকৃত্রিম বন্ধুত্ব। কিন্তু তাঁর অবন্ধন কবিচিত্ত সুনির্দিষ্ট শান-বাঁধানো কোনো রাস্তায় চলতে চায়নি। আর তাই কমিউনিজমের মুঠো তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। নজরুলের কবিতা অবশ্য শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে শোষিত-নিপীড়িত জনগণের শেষ যুদ্ধঃ
“ঐ দিকে দিকে বেজেছে ডঙ্কা শঙ্কা নাহিক' আর মারিয়া'র মুখে মারণের বাণী উঠিতেছে মার-মার!
রক্ত যা ছিল করেছে শোষণ,
নীরক্ত দেহে হাড় দিয়ে রণ-
শত শতাব্দী ভাঙেনি যে হাড়, সেই হাড়ে ওঠে গান 

জয় নিপীড়িত জনগণ জয়! জয় নব উত্থান!
জয় জয় ভগবান!
[9]

'সর্বহারা শ্রেণীর শিকল ছাড়া হারাবার কিছু নেই'  এই হচ্ছে মার্কসবাদের মূলমন্ত্র। কৃষক-শ্রমিক, মেহনতী জনতা নিয়ে নজরুল যে কবিতা, গান রচনা করেছেন, তা আমাদের মার্কসবাদী চেতনার কথাই বিশেষ ভাবে মনে করিয়ে দেয়। নজরুল কৃষক-শ্রমিক-কামার কুমোর-মুটে- মজুরদের সঙ্গে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে জীবনের গান গেয়েছেন। উদারপন্থী মানবিক চেতনার জন্যেই নজরুলের পক্ষে এসব কবিতা, গান করা সম্ভব হয়েছে।
নজরুলের কৃষক-শ্রমজীবী চেতনা একেবারেই মাটি ঘেঁষা 

‘আমরা নীচে পড়ে রইব না আর
শোনারে ও ভাই জেলে,
এবার উঠব রে ঠেলে ।
ঐ বিশ্বসভায় উঠল সবাই রে
ঐ মুটে মজুর হেলে ।
এবার উঠব রে সব ঠেলে ।'
[7]

নজরুলের কবিতায়, গানে আমরা বিশ্বব্যাপী শোষিতশ্রেণীর নবজাগরণ ও দুর্বার শ্রেণীসংগ্রামের আবহাওয়া গড়ে উঠতে দেখি। নজরুল তাঁর কোনো কোনো কবিতায়, গানে তরুণ দেশপ্রেমিকদের, দেশসেবকদের যে উদাও আহ্বান জানিয়েছেন, নিশ্চিত করে বলা যায় যে, তা স্পষ্টতই বিপ্লবপন্থার অভিমুখে আহ্বান । নজরুল বলেন :
‘নেই কি রে কেউ সত্যসাধক বুক খুলে আজ দাঁড়ায় শিকলগুলো কিবল করে পায়ের তলায় মাড়ায়  অথবা নেই কিরে কেউ মুক্তি সেরক শহীদ হবে মরে চরণ তলে দলবে মরণ ভয়কে হরণ করে’
[14]

নজরুল ছিলেন তাঁর সময়ের সবচাইতে স্পষ্টবাদী রাজনৈতিক কণ্ঠ। যখন তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ ব্রিটিশ রাজভক্তির আড়ালে নিজেদের নিরাপদ রাখত, নজরুল তখন সরাসরি রাজদ্রোহের পথে হাঁটলেন। তাঁর ‘অগ্নিবীণা’ বা ‘বিষের বাঁশী’ কেবল কবিতার বই ছিল না, তা ছিল শোষিত মানুষের এক একটি বারুদের স্তূপ। তাঁর রাজনৈতিক চেতনার এক চমৎকার তুলনা মেলে রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর সাথে। কিপলিং যখন তাঁর কবিতায় প্রাচ্যকে দেখেন এক ধরনের কৌতূহল ও আধিপত্যকামী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে:
যেখানে কিপলিং লেখেন :
'On the road of Mandalay
Where the old Flotilla lay
Wit our sick beneath the awning when
We went to Mandalay!
Other road to Mandalay
Where the Fly in the fishes Play
An the dawn comes up like the under outer China cost the Bay ! '
[15]
অন্যদিকে, নজরুল লেখেন :
‘আজাদ মানুষ বন্দী করে, অধীন করে
স্বাধীন দেশ,
কুল মুলুকের কুস্তি করে জোর দেখালে
ক'দিন বেশ,
মোদের হাতের কুর্তী নাচন নাচলে তাধিন
তাধিন শেষ!
কিংবা
হিংসুটে ঐ জীবগুলো ভাই নাম ডুবালে
সৈনিকের,
তাই তারা আজ নাস্তা-নাবুদ, আমরা
মোটেও হইনি জের,
পরের মুলুক লুট করে খায়, ডাকাত তারা
ডাকাত!
তাই তাদের তরে বরাদ্দ ভাই আঘাত শুধু আঘাত!'
[4]

 তিনি স্বরাজ বা অহিংসায় মুক্তির উপায়ে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি দেশের মুক্তির জন্যে সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষপাতী ছিলেন এবং বিপ্লবের পন্থা অবলম্বন করেছেন -

“যেথায় মিথ্যা ভন্ডামী ভাই করব সেথাই বিদ্ৰোহ । ধামা ধরা! জামা ধরা! মরণ ভীতু! চুপ রহো! আমরা জানি সোজা কথা, পূর্ণ স্বাধীন করব দেশ! এই দুলালুম বিজয়-নিশান, মরতে আছি মরণ শেষ । নরম গরম পচে গেছে আমরা নবীন চরম দর।
ডুবেছি না ডুবতে আছি স্বৰ্গ কিংবা পাতাল-তল ।”
[12]

নজরুল কলম হাতে তুলে নিয়েছেন সমাজের রূপকার হতে, জীবনশিল্পী হতে । মানবিক মূল্যবোধের চূড়ান্ত ক্ষয়-নেতির পেক্ষাপটে নজরুলের নৈকট্য আমাদের উপলব্ধি করতেই হয়। সমালোচকের ভাষায়  ‘দরদ দিয়ে, সহানুভূতি দিয়ে, ভালবাসা দিয়ে অশ্রু সজল মানবতাকে তিনি সান্ত্বনা দিয়েছেন । '
[20]

নজরুল সাম্রাজ্যবাদীদের ‘ডাকাত’ বলে অভিহিত করতে দ্বিধা করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বাধীনতা কোনো দয়া বা ভিক্ষার বস্তু নয়, তা রক্তমূল্যে অর্জন করতে হয়। তাই তো তিনি ‘সব্যসাচী’ কবিতায় সতর্ক করে দিয়ে বলেন:  

“জাগো রে জোয়ান ঘুমায়ো না ভুয়ো শান্তির বাণী শুনি অনেক দধীচী হাড় দিল ভাই,দানব-দৈত্য তবু মরে নাইসুতা দিয়ে মোরা স্বাধীনতা চাই, বসে বসে কাল গুনি!”  

এই ‘সুতা দিয়ে স্বাধীনতা’ চাওয়ার রাজনীতিকে তিনি ব্যঙ্গ করেছিলেন, কারণ তিনি জানতেন যে দানব শক্তির বিনাশ কেবল চরকা দিয়ে সম্ভব নয়। তাঁর বিদ্রোহ ছিল সশস্ত্র বিপ্লবের এক বৌদ্ধিক ও আবেগীয় পটভূমি। ব্রিটিশ সরকার তাঁর বই একের পর এক নিষিদ্ধ করেছে, তাঁকে কারারুদ্ধ করেছে, কিন্তু তাঁর ‘অগ্নি-মন্ত্র’কে সাধারণ মানুষের হৃদয় থেকে মুছে দিতে পারেনি। 

নজরুল ছিলেন গরিব বিশ্বের ধনী কবি। ধনী বিত্তের সম্পদের দিক থেকে নয়, চিত্তের সম্পদের দিক থেকে। বাংলা কবিতার অদম্য কবি-পুরুষ হিসেবে মাটির পৃথিবীর মানুষের জন্যে কবিতা লিখেছেন নজরুল। তিনি নিজেও ছিলেন মাটির মানুষ । আর মাটির মানুষের জন্যে তাঁর দরদ ছিলো অফুরন্ত। মাটির পৃথিবীর মাটির মানুষের জন্যে প্রাণ কাঁদতো তাঁর। আর তাই মাটির মানুষের, শোষিত ও গরিব মানুষের মুখপাত্র হিসেবে কবিতা ও গান রচনা করেছেন ।

নজরুলের মধ্যে নিরন্তর সংগ্রামশীলতা কার্যকরি ছিলো মানুষের কল্যাণসাধনের আকাঙ্ক্ষায়। এ আকাঙ্ক্ষার রূপায়ণ ঘটিয়ে ছিলেন তিনি। শোষিত, নির্যাতিত মানুষের জন্যে তিনি দেবতার আগুন চুরি করে শোষিত, নির্যাতিত মানুষকে দিয়েছিলেন ।
সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এই কবি কবিতাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কবিতাই ইংরেজ শাসক-শোষকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়ে ঝলসে উঠেছিলো। তিনি শুধু বৃটিশ ভাতের নির্যাতিত মানুষের মুখপাত্র ছিলেন না, তিনি গোটা বিশ্বের শতকরা ৬০ ভাগ নির্যাতিত, অধিকার বঞ্চিত মানুষের মুখপাত্র ছিলেন। কারণ, বিশ্বের শতকরা ৬০ ভাগ মানুষই কোনো না কোনোভাবে নির্যাতিত, নিষ্পেষিত, শোষিত, অধিকার বঞ্চিত ।

নিঃসন্দেহে নজরুলের বিদ্রোহ রাজনৈতিক চেতনার বিদ্রোহ। নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্যে তিনি তাই রাজদ্রোহী হতে কুণ্ঠিত হননি। অন্যদিকে, নজরুল বিষয়বস্তু এবং আংশিক উভয় দিক থেকেই ইতিবাচক পরিবর্তন ও নতুনত্ব মানতে সক্ষম হয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে সবার আগে বৈপ্লবিক আদর্শ উদ্ভাবন করেছিলেন নজরুল। এই বৈপ্লবিক আদর্শের সামাজিক-রাজনৈতিক-সাহিত্যিক প্রভাবকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। নজরুল ধর্মীয, সামাজিক-রাজনৈতিক- সাহিত্যিক দিক বিবেচনায় অনেকটাই সমন্বয়বাদী দর্শনে দীক্ষিত ছিলেন। আর তখনকার পরিস্থিতিতে একজন সচেতন মানবাবাদী কবি হিসেবে নজরুলের পক্ষে এমন একটি দর্শন লালন করাই স্বাভাবিক ছিলো। 

বাংলা সাহিত্যে নজরুলের ভূমিকা হয়েছে রাজদ্রোহীর, মানবতাবাদীর, সংগ্রামীর, বীরের, সাহিত্য-বিপ্লবীর। স্বাভাবিকভাবে তিনি বিশ্বসাহিত্যের সমগোত্রীয় বেশ ক'জন কবি সাহিত্যিক দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন : রায়রণ, শেলী, মায়াকোভস্কি, নাজিম হিকমত, গোর্কি প্রমুখ। গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় আনলে তিনি ওয়াল্ট হুইটম্যান দ্বারাও যে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছেন, সেকথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কিন্তু, তাঁদের সবাইকে আত্মীকরণের ক্ষমতা যে নজরুলের ছিলো, তা স্বীকার করে না নিলে নজরুলের প্রতি অবিচার করা হবে। নজরুল ‘উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোলকে অপনোদন করার মহান ব্রত নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। নজরুলের বিদ্রোহী কলম ঝলসে উঠেছিলো সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে, শ্রেণীভেদ, বর্ণবৈষম্য ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে। সত্যিকার অর্থেই তিনি দেশ, জাতি, সমাজের ‘মঙ্গলের স্মারক' হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছেন ।

নজরুল ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হলেও সাময়িক উচ্ছ্বাসের কবি নন । তিনি কালবৈশাখীর মতো প্রচন্ড ঠিকই, কিন্তু ক্ষণস্থায়ী নন। বরং, আপন শক্তিতে শক্তিমান চিরস্থায়ী এক কবি-পুরুষ। যাঁর কবিতার আবেদন কোনদিনই ফুরিয়ে যাবার মতো নয়। আতসবাজীর ক্ষণকালের ভেল্কি নিয়ে তিনি সাহিত্যে আবির্ভূত হননি। নজরুলকে ‘ধূমকেতু'র সঙ্গে তুলনা করা হলেও প্রচলিত ধূমকেতুর মতো তিনি নন। কারণ, প্রচলিত ধূমকেতু ‘অমঙ্গলের স্মারক’, ‘বিস্ময়কর ভাবে ক্ষস্থায়ী।’ নজরুল এ দু'টির কোনোটিই নন। বরং তিনি বিশ্বমানবতার চির হিতাকাঙ্ক্ষী এবং সাহিত্যে বিস্ময়কর ভাবে চির স্থায়ী আসন লাভে সক্ষম হয়েছেন। অদম্য স্বত:স্ফূর্ততা এবং প্রাণাবেগের উচ্ছ্বাস দিয়েই তিনি তা করেছেন । নজরুলের কবিতা আসলে গণ-অধিকার ও নিপীড়ন প্রতিবাদী কবিতা নজরুলের কবিতা নিছক স্লোগান হয়ে উঠেনি, বরং তা পরিশ্রুত সারবত্তারূপে গৌরবান্বিত হয়েছে, প্রকরণেও হয়েছে আধুনিক। রোমান্টিক ভাবালুতায় গা ভাসিয়ে না দিয়ে মানবাধিকারের কবি হিসেবে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন। যুগের ‘নাড়ি-মূলের নির্দেশ' দান করেন।

নজরুলের কবিতা নিঃসন্দেহে ‘architecture of words' গাণিতিক সূত্র ধরে অগ্রসর না হলেও নজরুলের কবিতা নিজস্ব একটা আলাদা কাঠামোতে পরিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। নজরুলের কবিতা অবস্থান একটা অনির্বাণ গতির মধ্যে। এ গতি আবার আকর্ষণ করে অপ্রতিরোধ্য এক আবেগকে । এই আবেগ কবিতার মধ্য দিয়ে উৎস সৃজনে সক্ষম। নজরুলের কবিতার ‘emotion’ বন্ধনহীন নয়। বরং, তা স্বয়ংক্রিয় এক পরিমিতির বন্ধনে আবদ্ধ। নজরুলের কবিতা নিছক ঘূর্ণিবায়ু নয়। নজরুল ডায়ালেকটিক ম্যাটিরিয়ালিজম বা দ্বন্দ্ববাদের মধ্য দিয়ে ধ্বংস ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নতুন ভাবে জীবন সৃষ্টির প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন 

‘যুবা- যুবতীর সে দেশে ভিড়,
সেথা যেতে নারে বুঢ়া নীর,
শাস্ত্র-শকুন জান-মজুর
যেতে নারে সেই হুর-পরীর শরাব-সাকীর গুলিস্তাঁয় !”
[5 ]

সৃষ্টিধর্মী মানসিকতা নিয়ে কবিতার অঙ্গনে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলেই নজরুলের কবিতা পুরাতনকে আঁকড়ে ধরে থাকতে পারেনি। আত্ম-অতিক্রমী নজরুলের পক্ষে বিদ্রোহী হওয়া, চির বিদ্রোহী হওয়া এবং ‘বিদ্রোহী' কবিতা রচনা করাই স্বাভাবিক। বিদ্রোহী সত্তার মাধ্যমেই নজরুল তাঁর প্রতিভার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছেন । তিনি কোনো ভাবেই আত্ম-অচেতন নন, বরং 'প্রচন্ড রকম আত্মসচেতন ও আত্মঅভিমানী । তাঁর কবিতা বুদ্ধদেব বসুর মত অনুযায়ী ‘আত্ম-অচেতন মনের অনেক হেলাফেলা' নয়; বরং আত্মসচেতন মনের প্রত্যয় ও অঙ্গীকার । ‘বিদ্রোহী' কবিতায় এবং বিদ্রোহাত্মক কবিতায় উদ্দীপন উদ্দীষ্ট নিঃসন্দেহে জনগণ। আত্ম অহং-এর অগ্নিতে স্নাত বলেই নজরুল পাথর চাপা জীবনকে তছনছ করে দিয়ে নতুন জীবন সৃষ্টির প্রলয়ঙ্করী শক্তি ও সাহস নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন।

নজরুল ছিলেন প্রথম বাঙালি কবি যিনি রুশ বিপ্লবের জয়গান গেয়েছেন এবং নিজেকে ‘সর্বহারা’র কবি হিসেবে সগর্বে পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর সাম্যবাদী চেতনা কোনো পাঠ্যপুস্তকীয় মার্ক্সবাদ নয়, বরং তা ছিল বাংলার ধুলিকণা আর ঘামে ভেজা মানুষের নাড়ি থেকে উঠে আসা উপলব্ধি। রেলের কুলি থেকে শুরু করে লাঙল ধরা কিষাণ সবাই তাঁর কাব্যের মহানায়ক। তিনি যখন লিখলেন:  

“ঐ দিকে দিকে বেজেছে ডঙ্কা শঙ্কা নাহিক' আরমারিয়া'র মুখে মারণের বাণী উঠিতেছে মার-মার!রক্ত যা ছিল করেছে শোষণ,নীরক্ত দেহে হাড় দিয়ে রণ-শত শতাব্দী ভাঙেনি যে হাড়, সেই হাড়ে ওঠে গান জয় নিপীড়িত জনগণ জয়! জয় নব উত্থান!” [9]

তখন সেই শব্দে পাওয়া যায় এক আসন্ন পরিবর্তনের পদধ্বনি। নজরুল বিশ্বাস করতেন যে, শোষিত মানুষের সংহতিই পারে দীর্ঘদিনের অন্যায়ের অবসান ঘটাতে। তাঁর ‘বিদ্রোহের বাণী’ কবিতায় তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেন:  

“যেথায় মিথ্যা ভন্ডামী ভাই করব সেথাই বিদ্ৰোহ।ধামা ধরা! জামা ধরা! মরণ ভীতু! চুপ রহো!আমরা জানি সোজা কথা, পূর্ণ স্বাধীন করব দেশ!”[12]

নজরুলের বিদ্রোহ নিঃসন্দেহে বিচিত্রও বহুমাত্রিক । এই বিদ্রোহ শোষক শাসক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির জুলুম নির্যানের বিরুদ্ধে সর্বোপরি সকল প্রকার সামাজিক অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, অর্থনৈতিক শোষণ-বঞ্জনা, শ্রেণী বিভাজন, বন্টন বৈষম্যের বিরুদ্ধে। সামাজিক ভাবে নজরুলের বিদ্রোহী সত্তাকে কোনো ভাবেই ‘অ্যানাকিস্ট' সত্তা বলে চিহ্নিত করা সঙ্গত নয় ৷ অথচ নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেনঃ

“মোটের উপর নজরুলকে যদি অ্যানার্কিস্ট বলে চিহ্নিত করা যায় তাহলে অন্যায় সিদ্ধান্ত হবে না। নেতিবাদী যুগে আতিশয্যটা স্বভাবধর্ম, তার প্রকৃতিসিদ্ধ । ভালোমন্দ সব কিছুর বিরুদ্ধে তার অসংযত উত্তাল প্রতিবাদ, বিপ্লবের রক্ত শিশুর সে দুঃসহ জন্ম যন্ত্রণা। এই জন্ম যন্ত্রণাটাকে যেমন যুক্তি দিয়ে সংযত করা যায় না, বেদনার্ভের আর্তনাদকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করা যায় না বিচার ও শিল্পবোধের মানদন্ড দিয়ে, নজরুল সম্পর্কে এই কথাটিই সত্য। তাঁর কবিকণ্ঠে সমগ্র বাংলাদেশের কন্ঠ আমরা শুনতে পাই। তাঁর অসংযত, বেহিসেবী, ক্ষিপ্ত বিদ্রোহবাদ সে যুগের বাঙালীর মর্মবানী।”[16]

এ কথা সত্য যে, নজরুল রাজনীতিক নন, কবি। কিন্তু, তাঁর কাব্যবোধের নিয়ন্তা শক্তি যে রাজনীতি, তা বলাই বাহুল্য । শোষিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত দেশের সাধারন মানুষকে নিয়েই সেই রাজনীতি । সোজা কথায়, সেই রাজনীতি গণ মানুষের রাজনীতি। আমরা এ কথা সহজেই কবুল করতে পারি যে, নজরুল তাঁর কবিতা, প্রবন্ধ এবং সাংবাদিকতার মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা ব্যক্ত করেছেন। তাঁর এই রাজনৈতিক বিশ্বাস ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা অবিরল ধারায় প্রবাহিত। এ সম্পর্কে মাহবুব হাসান বলেন :

“শিক্ষিত সচেতন মানুষ উপলব্ধি করতে পেরেছিলো যে, এই বানীবাহক ও দেশের পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্তির অগ্রসৈনিক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ঔপনিবেশিক বৃটিশ শাসকও এই উদ্দাম অদম্য কবি পুরুষের প্রাণময় উত্থানে সজাগ হয়ে উঠেছিলো। এদিকে বিদ্রোহীর ভাষা ব্যবহারের নতুনত্ব ও রুদ্র চেতনা- তাপ ক্রমান্বয়ে গনমনে ব্রিটিশ বিরোধিতা রাড়িয়ে চলেছিলো, এরই মধ্যে তাঁর 'অগ্নিবীণা' আত্মপ্রকাশ করে যে আগুনের শিখা তুললো, তাই হলো ইংরেজ সরকারের প্রথম ভীতির কারণ। তাঁর কবিতার পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্তির ওই অগ্নি- মন্ত্রনা কোনো জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকের জনগণমন কর্মধারার চেয়ে কমজোরী বা খাটো ছিলো না। বরং যা তারা প্রকাশ্যে করতে বা বলতে পারেননি, নজরুল কবিতায় তাকেই মূর্ত করে তুলেছেন ভাবে, ভাষায়, ছন্দে-প্রতীক ভাষ্যে।"[22]

নজরুল তাঁর কবিতায় নারীর যে মর্যাদা দিয়েছেন, তা সেই সময়কার সমাজে ছিল এক মহাবিপ্লব। তিনি নারীকে কেবল কোমল বা প্রেমিকা হিসেবে দেখেননি, বরং দেখেছেন পুরুষের সহযোদ্ধা হিসেবে। ‘নারী’ কবিতায় তাঁর সাম্যের গান লৈঙ্গিক রাজনীতির এক অবিস্মরণীয় দলিল। তিনি মনে করতেন, পৃথিবীর অর্ধেক অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে নারীর শ্রমে ও ত্যাগে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যখন নারীকে অন্তরালে আটকে রাখতে চেয়েছিল, নজরুল তখন ডাক দিলেন:  

“মুক্ত করিতে বন্দিনী মা'য়কোটি বীরসুত ঐ হের ধায়মৃত্যু-তোরণ-দ্বার-পানে- কার টানে?” [6]

তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, নারীকে বন্দি রেখে কোনো জাতির মুক্তি সম্ভব নয়। তাঁর এই লিঙ্গীয় সাম্যের চেতনা কেবল নারী অধিকারের আন্দোলন নয়, বরং তা ছিল মানবতার পূর্ণতা পাওয়ার এক অনিবার্য শর্ত। তিনি যেমন বেহেশতের কল্পনা করতে গিয়ে বলেছেন সেখানে যুবক-যুবতীদের ভিড় থাকবে, তেমনি পার্থিব জগতেও তিনি চেয়েছিলেন নারী-পুরুষের সমমর্যাদার এক বাগান।

 আজকের এই একবিংশ শতাব্দীর উত্তর-সত্য যুগে, যেখানে উগ্র জাতীয়তাবাদ আর পুঁজির আগ্রাসন মানুষকে ক্ষুদ্র করে ফেলছে, সেখানে নজরুলের সেই ‘আমি’ হয়ে ওঠে আমাদের বড় আশ্রয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন মস্তক উন্নত রাখতে। এম. মিজানুর রহমান যেমন বলেছেন-
"Nazrul rose like a comet in the estern sky and difed the red-eyed and iron-handed alien british ruler and raised his indomitable voice :
'Say, o Hereo, my head is held ever high...
My head is held so high and that knows not to bow..."
[19]

নজরুলের আন্তর্জাতিকতা যতোটা আঙ্গিকগত, তার চেয়ে অনেক বেশি বিষয়বস্তুগত। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে নিজেকে স্থাপন করতে গিয়ে নজরুল তাঁর নিজস্ব কৃষ্টি, ঐতিহ্যকে ভুলে যাননি। ফলে, তিনি এবং তাঁর কবিতা-দুই-ই গতিশীল হয়েছে। নিজস্ব ও দেশীয় ঐতিহ্যবোধ প্রবল ছিলো বলেই নজরুলের বৃহত্তর গ্রহণ ও সর্বজনীন হওয়ার প্রক্রিয়াটি জটিল হলেও তিনি গ্রহণযোগ্যতা হারাননি। নজরুল তাঁর নিজের সময়কে ধারণ করেছেন তাঁর কবিতায়, ধারণ করেছেন তাঁর প্রবল যা সময়ের দাবি-
“Nazruls extra-ordinary genius has its imagery reflections on the youths of the day. So he is enlightened with the greatness that he already held in his time and the fire of that time is yet to be extic. T. S. Eliot seems echoed here "The great poet writing himself, writes his time." 
[19]। 
টি. এস. এলিয়ট বলেছিলেন, একজন মহৎ কবি যখন নিজের কথা লেখেন, আসলে তিনি তাঁর সময়ের কথাই লেখেন। [21] নজরুলের ক্ষেত্রেও এটি ধ্রুব সত্য। তাঁর সৃজনশীল জীবন ছিল মাত্র তেইশ বছরের, কিন্তু সেই অল্প সময়ের ভেতরেই তিনি যে বিপুল বৈচিত্র্যের স্বাক্ষর রেখেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। তিনি প্রকৃতির কবি, প্রেমের কবি, আবার একই সঙ্গে প্রলয়ের কবি। সিদ্দিকুর রহমান সুন্দর বলেছিলেন, নজরুল দরদ আর ভালোবাসা দিয়ে অশ্রুসজল মানবতাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। 

নজরুলের বিদ্রোহ কোনো ধ্বংসাত্মক উন্মাদনা ছিল না; তা ছিল এক নান্দনিক শুদ্ধিকরণ। জীর্ণ সমাজকে ভেঙে নতুন করে গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা তাঁর কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে, তা আজ পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের শোষিত মানুষের জন্য ধ্রুবতারার মতো সত্য। তিনি শিখিয়েছেন-

‘নেই কি রে কেউ সত্যসাধক বুক খুলে আজ দাঁড়ায়শিকলগুলো কিবল করে পায়ের তলায় মাড়ায় অথবা নেই কিরে কেউ মুক্তি সেরক শহীদ হবে মরেচরণ তলে দলবে মরণ ভয়কে হরণ করে’ [14]

এই মরণ-ভয় হরণ করার মন্ত্রই নজরুলকে বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক চিরঞ্জীব নক্ষত্র করে রেখেছে। কাজী দীন মুহম্মদ যেমন আবেগঘন কণ্ঠে স্মরণ করেছিলেন যে-

“নাড়ি টিপে দেখলাম, আমরাও জীবিত। এতদিন ছিলাম কিনা মনেই পড়েনি । নিজেদের সম্বন্ধে ভাবতেই পরিনি। কারণ নিজেদের চেহারা যে সাহিত্যে ছিল প্রায় গড়হাযির। এখন নজরুলের আগমনে আবার নতুন করে নিজের সঙ্গে নিজের পরিচয় হলো। আত্মবিস্মৃত জাতি সম্বিত ফিরে পেলো। আধ-মরাদের কে যেন ঘা মেরে বাঁচালো। বুঝলাম উত্তেজিত জাগ্রত দেখা গেল আমারও বলার আছে, আমার ও জীবন আছে এবং আমার ও কণ্ঠস্বর আছে, আছে সবল মানসোল্লাস, আছে কঠোর ভাষা, দৃঢ় প্রত্যয়। কান্না সে তো পরাজয়ের। কান্নার ভাষা আমার নয়, আমার ভাষা জুলুমের বিরুদ্ধে রূখে দাঁড়ানোর সবল শক্ত ভাষা । ” [17]

যখনই সমাজ স্থবির হয়ে পড়ে, যখনই সত্যের কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা হয়, তখনই নজরুলের সেই অবিনাশী হুঙ্কার আমাদের কানে ভেসে আসে। নজরুল কেবল অতীতের কোনো কবি নন, তিনি বর্তমানের সাহস এবং ভবিষ্যতের ইশতেহার। তাঁর বিদ্রোহের নন্দনতত্ত্ব তাই সময়ের গণ্ডি ছাপিয়ে এক শাশ্বত মানবিক মুক্তির গান হয়ে চিরকাল প্রতিধ্বনিত হবে।

তথ্যসূত্রঃ 
1.ইসলাম, কাজী নজরুল। "অভিশাপ"। বিষের বাঁশী।
2.ইসলাম, কাজী নজরুল। "প্রলয়োল্লাস"। অগ্নিবীণা।
3.ইসলাম, কাজী নজরুল। "ধূমকেতু"। অগ্নিবীণা।
4.ইসলাম, কাজী নজরুল। "কামাল পাশা"। 
5.ইসলাম, কাজী নজরুল। "আয় বেহেশতে কে যাবি আয়"। 
6.ইসলাম, কাজী নজরুল। "জাগরণী"। 
7.ইসলাম, কাজী নজরুল। "ধীবরদের গান"। সর্বহারা।
8.ইসলাম, কাজী নজরুল। "নারী"।
9.ইসলাম, কাজী নজরুল। "ফরিয়াদ"। সর্বহারা।
10.ইসলাম, কাজী নজরুল।  "সব্যসাচী"। ফণি-মনসা। 
11.ইসলাম, কাজী নজরুল। "বিদ্রোহী"।
12.ইসলাম, কাজী নজরুল। "বিদ্রোহের বাণী"। বিষের বাঁশী। নজরুল রচনাবলী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৩। ঢাকা: বাংলা একাডেমী।
13.ইসলাম, কাজী নজরুল।  "ঝড়"। বিষের বাঁশী। 
14.ইসলাম, কাজী নজরুল। "সেবক"। বিষের বাঁশী।
15.কিপলিং, রুডইয়ার্ড। ১৮৯০। "ম্যান্ডালে"। 
16.গঙ্গোপাধ্যায়, নারায়ণ। ১৯৬৪। "নজরুল"। জি. এম. হালিম (সম্পাদিত), নজরুল মানস সমীক্ষা, পৃষ্ঠা ১৫৫। ঢাকা।
17.দীন মুহম্মদ, কাজী। ২০০৩। "জসীম উদ্দীনের কবিতা"। নজরুল ইসলাম ও জসীম উদ্দীন জন্ম শতবার্ষিকী ১৯০৩-২০০৩, পৃষ্ঠা ৫৫। ঢাকা: নজরুল ইন্সটিটিউট।
18.ব্লুম, হ্যারল্ড। ১৯৭৩। দ্য অ্যাংজাইটি অব ইনফ্লুয়েন্স: এ থিওরি অব পোয়েট্রি । 
19.রহমান, এম. মিজানুর। "নজরুল: দ্য প্রোটাগনিস্ট অব দ্য হিউম্যান আইডেন্টিটি"। 
নজরুল ইন্সটিটিউট জার্নাল, সংখ্যা ৩, পৃষ্ঠা ৫১।
20.রহমান, সিদ্দিকুর। ১৯৮২। চেতনার অনুষঙ্গ (জুন ১৯৮২ সংখ্যা)। ঢাকা: বাংলা একাডেমী।
21.এলিয়ট, টি. এস. । ১৯১৯। ট্রেডিশন অ্যান্ড দ্য ইন্ডিভিজুয়াল ট্যালেন্ট। 
22.হাসান, মাহবুব। ১৯৯৭। নজরুলের রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা (আষাঢ় ১৪০৪/জুন ১৯৯৭), পৃষ্ঠা ৫৫, ৫৬। ঢাকা: নজরুল ইন্সটিটিউট।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।

১১৮ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন