সর্বশেষ

জাতীয়

এইউবিতে “নজরুলের বিদ্রোহের সুর ও স্বরূপ” শীর্ষক সেমিনার

স্টাফ রিপোর্টার
স্টাফ রিপোর্টার

শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬ ৪:০৮ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর বাংলা বিভাগের উদ্যোগে মহান কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে “নজরুলের বিদ্রোহের সুর ও স্বরূপ” শীর্ষক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম।

শুক্রবার (১৯ জুন) সকাল ১০টায় আয়শা মেমোরিয়াল হলে আয়োজিত এই সেমিনারটি একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম।

এইউবি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক।

অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এইউবি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন এইউবি’র ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়া।

সেমিনারের সূচনা বক্তব্য প্রদান করেন বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. রিতা আশরাফ। বক্তারা নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা, সাহিত্যকর্ম এবং সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা উপস্থাপন করেন।

এইউবি এর স্কুল অব এডুকেশনের ডিন অধ্যাপক ড. শিরীন আখতার

মূল আলোচক ছিলেন- এইউবি এর স্কুল অব এডুকেশনের ডিন অধ্যাপক ড. শিরীন আখতার। এসময় তিনি 'মানবিক সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতা: নজরুলের বিদ্রোহের তাত্ত্বিক ও গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ' তুলে ধরেন। 

নজরুল তাঁর সাহিত্য ও জীবনে ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মানবিক সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি সমাজচিন্তায় এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজমকে ক্রেস্ট প্রদান করছেন এইউবি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক।

নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ রূপটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক অধ্যায়। গবেষণাধর্মী প্রেক্ষাপট থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর বিদ্রোহ কোনো আকস্মিক আবেগপ্রসূত প্রকাশ নয়; বরং এটি ছিল সুগভীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও দার্শনিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজমকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. রিতা আশরাফ।

নজরুলের বিদ্রোহী রূপকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ তুলে ধরেন-

১. উপনিবেশবাদ-বিরোধী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট (Anti-Colonial Context)
নজরুল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি ও সাহসী অবস্থান গ্রহণ করেন।

তৎকালীন ভারতের অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনের তুলনামূলক মন্থর গতির বিপরীতে তিনি পূর্ণ স্বাধীনতার ডাক দেন।

এইউবি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেককে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন বাংলা বিভাগের ছাত্রী।

তিনি ছিলেন এমন একজন কবি, যিনি ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহী ভাষা ব্যবহার করে রাজদ্রোহের অভিযোগে কারাবরণ করেন।

তাঁর সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার এক শক্তিশালী মাধ্যম।

২. মিথলজির মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ও ‘আমি’ সত্তার দর্শন
নজরুল ধর্মীয় প্রতীকগুলোকে আধ্যাত্মিক প্রচারের জন্য নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

এইউবি’র ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়াকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন বাংলা বিভাগের ছাত্রী।

তিনি সনাতন ধর্মের শিবকে উপাস্য হিসেবে নয়, বরং ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছেন। একইভাবে ইসলামের ঐতিহাসিক বীরত্বকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

তাঁর কবিতায় একই সঙ্গে পাওয়া যায়—

“আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার”
“আমি আরশ ছেদিয়া উঠিয়াছি”
এই দ্বৈত রূপ বাঙালি হিন্দু ও মুসলিম মনস্তত্ত্বের অবদমিত শক্তিকে একত্রিত করার একটি চেতনতাত্ত্বিক প্রয়াস।

শ্রেণি সংগ্রামের তীব্র ঘোষণা
“দেখিনু সেদিন রেলে, কুলি বলে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিল নিচে ফেলে…”

এই পঙক্তিতে নজরুল সরাসরি শ্রেণি বিভাজন ও শোষণের বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। এখানে ‘বাবু সা’ব’ শোষক শ্রেণির প্রতীক এবং ‘কুলি’ শ্রমজীবী সর্বহারা মানুষের প্রতিচ্ছবি।

ধর্ম ও শোষণ ব্যবস্থার সমালোচনা
“হায় রে ভজনালয়, তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়!”

এই পঙক্তিতে তিনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে শোষণ ও ভণ্ডামির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

৩. ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’: আইনি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
নজরুলের বিদ্রোহ কেবল সাহিত্যিক প্রকাশে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল বাস্তব রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশ।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার তাঁকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪-A ধারায় রাজদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করে।

আদালত ও রাষ্ট্রশক্তির দ্বন্দ্ব
নজরুল আদালতে দাঁড়িয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের পরিবর্তে ঔপনিবেশিক বিচারব্যবস্থার বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন।

তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে—

“আমার ওপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী… এক পক্ষে রাজদণ্ড, অন্য পক্ষে ধূমকেতু।”

এখানে ‘রাজদণ্ড’ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীক এবং ‘ধূমকেতু’ সত্য ও বিদ্রোহের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

তিনি বিচারককে “মিথ্যার প্রতিনিধি” হিসেবে অভিহিত করে ঔপনিবেশিক আইনি কাঠামোর অন্তর্নিহিত বৈষম্য উন্মোচন করেন।

এইউবি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক।

কারাগারের সাহিত্য
কারাগারে থেকেও তিনি লেখেন—

“কারার ঐ লৌহ-কবাট, ভেঙে ফেল কর রে লোপাট…”

এটি কেবল কবিতা নয়, বরং শোষণবিরোধী বাস্তব রাজনৈতিক আহ্বান।

গবেষণার প্রস্তাবিত দিকনির্দেশনা
নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা নিয়ে উচ্চতর গবেষণার জন্য নিম্নোক্ত ক্ষেত্রসমূহ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে—

১. মনস্তাত্ত্বিক ও মিথলজিক্যাল বিশ্লেষণ
নজরুলের মিথলজি ব্যবহারের ফ্রয়েডীয় ও ইয়ুঙ্গীয় ব্যাখ্যা, এবং ‘আমি’ সত্তার অস্তিত্ববাদী বিশ্লেষণ।

২. বৈশ্বিক ও সমাজতান্ত্রিক প্রেক্ষাপট
রুশ বিপ্লব, মার্ক্সীয় শ্রেণি সংগ্রাম এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের প্রভাব।

৩. আইন ও সাহিত্য (Law and Literature)
ঔপনিবেশিক আইনি কাঠামো বনাম ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’-র রাজনৈতিক ভাষ্য বিশ্লেষণ।

৪. তুলনামূলক সাহিত্য গবেষণা
নিৎশে, সুফিবাদ এবং নজরুলের ‘আমি’ দর্শনের তুলনামূলক অধ্যয়ন।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম।

৫. কারাগার সাহিত্য (Prison Literature)
নেলসন ম্যান্ডেলা ও গ্রামসির মতো রাজনৈতিক বন্দীদের রচনার সাথে নজরুলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ।

নজরুল কেবল একজন কবি নন; তিনি একাধারে দার্শনিক, রাজনৈতিক চিন্তক ও বিদ্রোহী মানবতাবাদী। তাঁর সাহিত্য ও জীবন একসঙ্গে উপনিবেশবাদ, শ্রেণি শোষণ, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক সমন্বিত প্রতিরোধের ইতিহাস।

তাঁর বিদ্রোহ তাই কেবল সাহিত্য নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন, যা আজও গবেষণার জন্য অমিত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

'নজরুলের বিদ্রোহের সুর ও স্বরূপ' নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন বাংলা বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী রনজক রিজভী।

সেমিনারে 'নজরুলের বিদ্রোহের সুর ও স্বরূপ' নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন বাংলা বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী রনজক রিজভী।

অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন, বাংলা বিভাগের প্রভাষক সিনথিয়া জাহান বিথুন। আর অনুষ্ঠানে নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করেন মুক্তাশা দীনা চৌধুরী।

১৩৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
জাতীয় নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন