পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে জাতীয় সংলাপ
পানি নিরাপত্তা, কৃষি ও জলবায়ু সহিষ্ণুতায় গুরুত্বারোপ
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬ ২:৪৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
দেশের দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, পরিবেশগত মূল্যায়ন, ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে সোমবার বিকেলে অনুষ্ঠিত ‘পদ্মা ব্যারাজ: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব মতামত উঠে আসে। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কো-অপারেশন ফাউন্ডেশন (আইজিসিএফ)।
গোলটেবিল বৈঠকে নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন। আলোচনায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত ও জলবায়ুগত প্রভাব, কৃষি উৎপাদনশীলতা, খাদ্য নিরাপত্তা, নদী ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতু মীর বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো কখনো অতিরিক্ত পানি, আবার কখনো পানির সংকট। তিনি জানান, জনগণের প্রয়োজন বিবেচনায় ব্যারাজের নকশায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। তাঁর দাবি, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) অতিরিক্ত শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি যুক্ত হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন) ড. শাইমুম পারভেজ বলেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হলো পদ্মা ব্যারাজ। দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পানি সংকট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, উজানে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন ভবিষ্যতে আঞ্চলিক পানি নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার এই প্রকল্পে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের মডারেটর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বুলবুল সিদ্দিকী বলেন, নব্বইয়ের দশক থেকেই পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে আলোচনা চলছে। তাঁর মতে, শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ এবং প্রধান নদী থেকে শাখা নদীগুলোতে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা দেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এ ধরনের সংলাপ সরকারের নীতি প্রণয়নে সহায়ক হতে পারে।
আইজিসিএফের চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান দাওন বলেন, এই সংলাপের উদ্দেশ্য হলো প্রকল্পটির সম্ভাবনা ও ঝুঁকি—উভয় দিকই তথ্যভিত্তিকভাবে মূল্যায়ন করা। তিনি জানান, একনেক ইতোমধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে প্রথম ধাপে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন করেছে। তাঁর ভাষ্য, পানি নিরাপত্তা, কৃষি, নদীর প্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা, সুন্দরবন, জীববৈচিত্র্য এবং আঞ্চলিক পানি কূটনীতির সঙ্গে এ প্রকল্পের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।
বক্তারা বলেন, শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ, নদী ও শাখা নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধার, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ও পরে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং তথ্যনির্ভর মূল্যায়ন অব্যাহত রাখার ওপরও তাঁরা গুরুত্বারোপ করেন।
গোলটেবিল বৈঠকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. নুরুল ইসলাম, জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হান্নান চৌধুরী, অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম, ড. মো. জানে আলী হোসেন, ঢাকা টাইমসের সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী, র্যাঙ্কেন ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের সিওও সুবাইল বিন আলমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা শেষে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদনশীলতা, পরিবেশগত ভারসাম্য ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এ ধরনের নীতি সংলাপ নিয়মিত আয়োজন করা প্রয়োজন।
১২৮ বার পড়া হয়েছে