৩২ জুলাই: গণশোক, শহীদ স্মরণ এবং জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের দিন
শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬ ৫:১৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
৩২ জুলাই, বা ১ আগস্ট ২০২৪, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রতীকী ও নির্ণায়ক একটি দিন। কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন তখন নতুন মোড় নিয়েছে। এই দিনটিতে শহীদদের স্মরণে দেশজুড়ে পালিত হয় “Remembering Our Heroes” কর্মসূচি; ডিবি হেফাজত থেকে ছয় শীর্ষ আন্দোলন সংগঠকের মুক্তি ঘটে; আর সরকার প্রশাসনিকভাবে কৌশল বদলের পথে হাঁটতে শুরু করে—একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার গেজেট জারি হয়।
সকাল থেকেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও নাগরিকরা নিজ নিজ এলাকার আদালত, শহীদ মিনার, সড়কপথ ও ক্যাম্পাস সংলগ্ন মাঠে হাতে ব্যানার, মুখে লাল কাপড়, হাতে কালো-লাল ব্যাজ পরে নীরব শ্রদ্ধা জানান। “ন্যায়বিচার না হওয়া পর্যন্ত শোক থামবে না”—এই স্লোগানের ছায়া পড়ে দেশজুড়ে। বিশেষ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত-আবৃত্তি-কবিতার মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা শহীদ স্মরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেন; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও উপস্থিত ছিলেন।
বিকেল নাগাদ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় শীর্ষ সংগঠক—নাহিদ ইসলাম, আবু বাকের মজুমদার, আসিফ মাহমুদ, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও নুসরাত তাবাসসুম—ডিবি হেফাজত থেকে মুক্তি পান। আন্দোলনকারীদের ভাষ্যমতে এটি জনগণের চাপ ও ক্রমাগত গণমিছিলের ফল। মুক্তি পাওয়ার পর তারা আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন এবং বলেন, “এই মুক্তি সম্পূর্ণ নয়—বিচার না হওয়া পর্যন্ত শান্তি নেই।”
অন্যদিকে, দিনটিতে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবির ও সংশ্লিষ্ট দল-সংগঠনকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’-এর আওতায় নিষিদ্ধ করে। সকালের মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গেজেট জারি হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে মাঠে নামে জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বিরুদ্ধে ধরপাকড় ও নজরদারি জোরদার করতে। এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজধানী, রাজশাহী, কক্সবাজার ও ময়মনসিংহে জামায়াত সংশ্লিষ্ট স্থানে অভিযান চালানো হয় এবং অন্তত ৭৫ জন আটক হয়। পুলিশ দাবি করে, তারা নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান চালিয়েছে।
নিরাপত্তা সংস্থা ডিবি’র হেফাজত থেকে মুক্তি পেয়ে ছাত্রনেতা সারজিস আলম ফেসবুকে লিখেন, “ছয়জন মানুষকে আটকে রাখা গেলেও, একটা প্রজন্মকে আটকানো যাবে না… আন্দোলন থামবে না যতদিন নিপীড়ন-গ্রেপ্তার-নিখোঁজ চলবে। অনেকের ভাই, বাবা, পরিবারের সদস্যরাও গ্রেপ্তার; কেউ কেউ নিখোঁজ। পুলিশের প্রতি ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ইউনিফর্মই এখন ভয় আর নির্যাতনের প্রতীক। এই পথ ন্যায়ের, এটা শেষ নয়।”
বিকেলে নারায়ণগঞ্জে শহীদ স্মরণ ও মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচিতে পুলিশ বাধা দেয়, লাঠিচার্জ করে; এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন, যাদের মধ্যে দুইজন ছাত্রী ছিলেন। পরে সামাজিক মাধ্যমে ছাত্রীরা পুলিশি হেনস্তার বিবরণ শেয়ার করেন, যা রাতেই ভাইরাল হয় এবং ব্যাপক ঘৃণা ও একাত্মতা তৈরি করে।
“দৃশ্য মাধ্যম শিল্পী সমাজ”-এর ব্যানারে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন, অভিনেতা মোশাররফ করিম ও পরিচালক আকরাম খানসহ একদল নাট্য-চলচ্চিত্র শিল্পী রাস্তায় অবস্থান নেন। তাঁরা ফার্মগেটে দাঁড়িয়ে “শান্তি চাই—শিক্ষার্থীর রক্ত আর না” স্লোগানে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সঙ্গে প্রকাশ্য সংহতি প্রকাশ করেন। মোশাররফ করিম বলেন, “আমরা সবসময় মানুষের পাশে—শিক্ষার্থীদের রক্তপাত আর দেখতে চাই না।” বাঁধন বলেন, “শান্তিপূর্ণ ছাত্রদের হত্যা মেনে নেওয়া যায় না, এটা আর কোনো অভিনেতার নীরব থাকার সময় নয়।”
অনলাইনে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। নিউইয়র্ক, লন্ডন, টরন্টো, কুয়ালালামপুর, কলকাতাসহ বেশ কয়েকটি শহরে শহীদদের স্মরণে মোমবাতি জ্বালানো, জনসভা ও পোস্টার-ক্যাম্পেইন সংগঠিত হয়। সামাজিক মাধ্যমে #RememberingOurHeroes, #JulyMassacre, #JusticeForStudents ইত্যাদি হ্যাশট্যাগে আন্দোলনের আন্তর্জাতিক মাধ্যমিকরণ হয়।
১ আগস্ট ২০২৪, বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধুই জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের দিন নয়, বরং একই সঙ্গে শহীদদের স্মরণে গণজাগরণ, ছয় সংগঠকের মুক্তি, নাগরিক-প্রবাসী বিরাট সংহতি, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন, নতুন গ্রেফতার ও মামলা, পুলিশের চেকপোস্ট ও তল্লাশি, শিক্ষার্থীদের বর্জন-প্রতিশ্রুতি—সব মিলিয়ে একটি রূপান্তর ও স্মরণের দিন। এদিন দেশের রাজপথ, ক্যাম্পাস, আদালত, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মে নিঃসঙ্গ শোক থেকে সম্মিলিত ন্যায়বিচার ও গণপ্রতিরোধের ঐক্য গড়ে ওঠে, যা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের উজ্জ্বল স্মারক হয়ে থাকবে।
১২৭ বার পড়া হয়েছে