চীনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও বাংলাদেশের উন্নয়ন সমীকরণ
বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬ ১১:০০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ভৌগোলিক বিশালতা ও প্রাচীন সভ্যতার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য নিয়ে পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত গণপ্রজাতন্ত্রী চীন আজ বিশ্ব অর্থনীতির এক প্রধান চালিকাশক্তি। হোয়াংহো বা পীত নদী, ইয়াংসি-কিয়াং এবং সি-কিয়াং—এই তিনটি প্রধান নদী অববাহিকাকে কেন্দ্র করে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ১১০০ অব্দের মধ্যে গড়ে ওঠা চীনা সভ্যতা মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন ভিত্তি। কাগজ, বারুদ, মুদ্রণ এবং কম্পাসের মতো যুগান্তকারী আবিষ্কারের মাধ্যমে যে জাতি একদা বিশ্বকে জ্ঞান ও প্রযুক্তির আলো দেখিয়েছিল, সেই চীন আজ আধুনিক বিশ্বে পরিণত হয়েছে অন্যতম শীর্ষ অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে ভূ-রাজনীতিতে তো বটেই, বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে চীন এখন বিশ্ব অর্থনীতির এক অবিসংবাদিত নায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১৯৭৯ সালের পূর্ব পর্যন্ত চেয়ারম্যান মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে চীন মূলত একটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত এবং কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কাঠামো অনুসরণ করত। সেই সময় বহির্বিশ্বের সাথে বাণিজ্য উদারীকরণ ও অর্থনৈতিক উন্মুক্তকরণের কোনো সুযোগ ছিল না, যার ফলে ব্যাপক অদক্ষতা, স্থবিরতা এবং চরম দারিদ্র্য দেশটিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মূলধারা থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। তবে ১৯৭৯ সালে মাও-পরবর্তী যুগে ডেন শিয়াওপিং-এর দূরদর্শী নেতৃত্বে চীনে এক ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটে। মুক্ত বাজার অর্থনীতির ধারণাকে গ্রহণ করে দেশটি বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য নিজেদের দুয়ার উন্মুক্ত করে দেয়।
অর্থনৈতিক এই ঐতিহাসিক সংস্কারের ফল হাতেনাতেই মেলে এবং ১৯৭৯ থেকে শুরু করে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ চার দশকে চীনের বার্ষিক গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় প্রায় ৯.৫ শতাংশ। বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে এটিকে দ্রুততম ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ হিসেবে গণ্য করা হয়, যার ওপর ভর করেই চীন বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদনকারী দেশ, শীর্ষ পণ্য ব্যবসায়ী এবং বিশাল বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের একচ্ছত্র ধারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই উচ্চ প্রবৃদ্ধির গতি ২০১৮ সালের দিকে কিছুটা ধীর হতে শুরু করলে চীন সরকার অনুধাবন করে যে, কেবল সস্তা শ্রম, ভারী অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং সস্তা পণ্য রপ্তানির ওপর ভিত্তি করে এই প্রবৃদ্ধি দীর্ঘকাল টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাছাড়া অনেক উন্নয়নশীল দেশ যেভাবে 'মধ্যম আয়ের ফাঁদে' পতিত হয়, তা এড়াতে হলে অর্থনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল। এই ফাঁদ থেকে বাঁচতে চীন তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পুরনো মডেল পরিবর্তন করে একটি নতুন নীতি গ্রহণ করে, যা স্থির বিনিয়োগ ও রপ্তানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিগত ভোগ, সেবা খাতের বিকাশ এবং প্রযুক্তির উদ্ভাবনের ওপর জোর দেয়।
নতুন এই অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় চীন সরকার প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ২০১৫ সালে তাদের বহুল আলোচিত মাস্টারপ্ল্যান 'মেড ইন চায়না-২০২৫' ঘোষণা করে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ব্যাপক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থায়নের মাধ্যমে ১০টি প্রধান উচ্চ-প্রযুক্তি খাতে চীনের উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ করা এবং নিজেকে সস্তা পণ্য প্রস্তুতকারক দেশ থেকে সরিয়ে এনে একটি উচ্চ-প্রযুক্তিগত বৈশ্বিক শক্তিতে রূপান্তর করা। তবে বেইজিংয়ের এই আগ্রাসী শিল্পনীতি এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া বিশেষ সুবিধা পশ্চিমা বিশ্ব ও বিদেশি সংস্থাগুলোর মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে, যা বৈশ্বিক মুক্ত বাজার প্রতিযোগিতাকে এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
চীনের এই দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দেশটির দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক যেমন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনই তৈরি হয়েছে তীব্র ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। চীন এখন কেবল নিজের সীমানায় সীমাবদ্ধ না থেকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে অন্যতম প্রধান অর্থায়নকারী হয়ে উঠেছে, যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো চীনের স্বপ্নের প্রজেক্ট 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ'। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা মহাদেশসহ এর বাইরেও বিশাল যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার এই মহাপরিকল্পনা সফল হলে চীনের জন্য বিশ্বব্যাপী রপ্তানি ও বিনিয়োগের এক বিশাল বাজার উন্মুক্ত হবে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির 'সফট পাওয়ার' বা কৌশলগত প্রভাবকে চূড়ান্ত উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
চীনের এই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা ও কাঠামোগত পরিবর্তনের এক বড় অংশীদার হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ভূ-কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI)-এ বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তি দেশের যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে এক অভূতপূর্ব গতি সঞ্চার করেছে। বাংলাদেশের যোগাযোগ খাতের অন্যতম মাইলফলক—পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল এবং দেশের বিভিন্ন মেগা বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে চীনের অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতা বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছে।
পাশাপাশি, চীনের এই সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক রূপান্তরের ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্য খাতেও এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। চীনের বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে লক্ষ্য করে বাংলাদেশ আজ তার রপ্তানি খাতকে বৈচিত্র্যময় করার সুযোগ পাচ্ছে। বিশেষ করে চীনের বাজার বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) ও চামড়াজাত পণ্যের জন্য একটি বড় গন্তব্য হয়ে উঠছে। তবে বিপুল পরিমাণ আমদানির তুলনায় রপ্তানি কম হওয়ায় চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি এখনো অনেক বেশি। এই ঘাটতি পূরণে এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রযুক্তির স্থানান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চীনের এই অভাবনীয় অর্থনৈতিক সাফল্যের মূলে রয়েছে সুদূরপ্রসারী মূলধনী বিনিয়োগ, শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের মধ্যে সম্পদের দক্ষ ও সময়োপযোগী বণ্টন। চীনের একসময়ের সনাতন কৃষিখাত আজ সম্পূর্ণভাবে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প খাতে রূপান্তরিত হয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে দেশটিতে গড়ে তোলা হয়েছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও উপকূলীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন জোন। সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা এবং কাঠামোগত সংস্কারের মেলবন্ধনে চীন আজ বৈশ্বিক অর্থনীতির এক মহীরুহ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। প্রাচ্যের এই ড্রাগনের অর্থনৈতিক যাত্রাপথ এবং এর সাথে বাংলাদেশের সুসংহত ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব আগামী দিনে আমাদের দেশের উন্নয়ন সমীকরণকেও এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে—এ কথা বলাই বাহুল্য।
লেখক: শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।
১৪৬ বার পড়া হয়েছে