সর্বশেষ

মতামত

উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবধান কমানোর সময় এসেছে

মোঃ আসিফ হাসান রাজু
মোঃ আসিফ হাসান রাজু

শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬ ৪:২৩ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে দেশজুড়ে উচ্চশিক্ষার অভাবনীয় বিস্তার ঘটছে, অন্যদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।
মোঃ আসিফ হাসান রাজু

প্রতি বছর দেশের পাবলিক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো থেকে লাখো শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছেন। কিন্তু এই অর্জনের আনন্দ ম্লান হয়ে যাচ্ছে যখন একটি বড় অংশই উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যকার এই দৃশ্যমান ও ক্রমবর্ধমান ব্যবধান আজ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ছাড়িয়ে রাষ্ট্রের জন্য এক গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে দেশে ৫২টি পাবলিক এবং ১০৮টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর বাইরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রয়েছে ১,৬০০-এর বেশি অধিভুক্ত কলেজ। অর্থাৎ, উচ্চশিক্ষার পরিকাঠামো আমাদের বিশাল এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যাও লক্ষাধিক। কিন্তু মৌলিক প্রশ্নটি হলো, এই শিক্ষা কতটুকু কর্মক্ষেত্রমুখী ও যুগোপযোগী?
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৯ লাখ স্নাতক বেকার রয়েছেন।

শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ১২ শতাংশ; যদিও বিশ্লেষকদের মতে প্রকৃত সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি। এর বিপরীতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায় যখন দেশের বিভিন্ন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করে যে, তারা প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন জনবল খুঁজে পাচ্ছে না। একদিকে বিপুল চাকরিপ্রত্যাশী, অন্যদিকে দক্ষ কর্মীর তীব্র ঘাটতি। এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে যে আমাদের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা এবং শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে একটি গভীর ও মৌলিক অসামঞ্জস্য রয়েছে।

বর্তমান বিশ্ব চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, রোবোটিক্স, অটোমেশন, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি কর্মসংস্থানের ধরনকে দ্রুত পরিবর্তন করছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার এই দ্রুত বিস্তার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও যোগ্য শিক্ষকমণ্ডলী গড়ে ওঠার আগেই ঘটে গেছে। যার ফলে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করলেও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, যোগাযোগ কৌশল, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি অর্জনের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম পাচ্ছে। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি।

এক্ষেত্রে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। জাপানে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে একটি শক্তিশালী অংশীদারিত্ব বিদ্যমান। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে পাঠ্যক্রম তৈরি করে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখে। ফলে স্নাতক হওয়ার আগেই শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে ধারণা লাভ করে এবং দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। একইভাবে, চীন উচ্চশিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে দেশটি উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উন্নত উৎপাদন খাতে চীনের দ্রুত অগ্রগতির পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের অবদান অনস্বীকার্য। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। সিলিকন ভ্যালিসহ বিশ্বের বহু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণার ফলাফল থেকেই জন্ম নিয়েছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই অভিজ্ঞতাগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। দেশে ১৬০-এর অধিক পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও সেগুলোর বড় অংশ এখনও শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সংযুক্ত নয়।

তাই আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম পুনর্গঠন ও দক্ষতাকে শিক্ষার অন্যতম মূল লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠা, বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ চালু, শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের পাঠ্যক্রম প্রণয়নে সম্পৃক্তকরণ এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা জরুরি।

একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মানসিকতার পরিবর্তনও প্রয়োজন। চাকরিই একমাত্র কর্মসংস্থানের পথ নয়। উদ্যোক্তা সৃষ্টি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, কৃষি প্রযুক্তি, সবুজ অর্থনীতি এবং ডিজিটাল সেবাখাতেও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে শিক্ষার্থীরা চাকরিপ্রার্থী হওয়ার পাশাপাশি চাকরি সৃষ্টিকারী হিসেবেও নিজেদের গড়ে তুলতে পারে।

নতুন সরকারের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়। একটি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কৌশল, ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের পূর্বাভাস এবং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।

বাংলাদেশ বর্তমানে জনসংখ্যাগত সুবিধার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু এই শক্তিকে যদি দ্রুত দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা না যায়, তবে তা অদূর ভবিষ্যতে মারাত্মক অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, সঠিক পরিকল্পনা ও কর্মসংস্থানমুখী উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে, এই তরুণরাই আগামী দিনের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে। ফলে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের এই দূরত্ব ঘোচানো একাডেমিক বা অর্থনৈতিক এজেন্ডার ঊর্ধ্বে গিয়ে একটি সমৃদ্ধ, টেকসই ও বৈষম্যহীন আগামীর বাংলাদেশ গড়ার অপরিহার্য শর্ত।

লেখক: শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

১৩২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন