রক্তের ঋণ, সময়ের দায় - জুলাইয়ের আর্তনাদ ও অখণ্ড ইতিহাস
বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬ ২:১৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
অত্যাচার, নিপীড়ন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষ চিরকাল লড়ে গেছে; আন্দোলন জারি রেখে গেছে কিন্তু সব আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয় না; নিতেও পারেনা বিবিধ কারণের জন্যেই। যেসকল আন্দোলন অভ্যুত্থানে রূপ নেয় সেসবের মুলে শুধু দায়বদ্ধতা কিংবা দায়মুক্তিই কাজ করে না; উপরন্তু মানুষ খোঁজে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও বাকস্বাধীনতার মুক্তি।
এইরকম তিনটি আন্দোলন, একটি বাংলাদেশ হওয়ার আগে এবং পরে দুইটি আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। বাংলাদেশের ইতিহাস কোনো আকস্মিক রেখাচিত্র নয়, বরং তা স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণমানুষের রক্তক্ষয়ী দ্রোহের অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান যদি আমাদের স্বাধীনতার রক্তিম প্রবেশদ্বার খুলে দিয়ে থাকে, তবে ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান ছিল অবরুদ্ধ স্বৈরাচারের হাত থেকে সেই অর্জিত গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করার এক পলিমাটির লড়াই; আর ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লব হলো সেই দীর্ঘ রুদ্ধশ্বাস দমবন্ধ পরিবেশ ভেঙে মুক্তির রক্তাক্ত বসন্ত। এই ত্রয়ী গণ-অভ্যুত্থান মূলত একই অবিনাশী চেতনার ভিন্ন ভিন্ন মহাকাব্যিক অধ্যায়—যেখানে সময়ের ব্যবধান থাকলেও রাজপথে কিশোর-তরুণদের বুক পেতে দেওয়া, বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে শ্লোগান তোলা এবং অন্যায়ের দেয়ালে গ্রাফিতির অক্ষরে ক্ষোভের ক্যানভাস আঁকার আর্তনাদ একই সূত্রে গাঁথা। রাষ্ট্র যখন এই দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাসকে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার যান্ত্রিক ফাইলে বন্দি করে রাখে, তখন কেবল সমকালীন যোদ্ধারাই উপেক্ষিত হন না, বরং ইতিহাসের অখণ্ডতাই এক গভীর কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ায়; কারণ বীরদের ত্যাগের ঋণ কোনো নির্দিষ্ট কালখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা বয়ে চলে প্রজন্মের পর প্রজন্মে।
—২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান সমকালীন বৈশ্বিক ইতিহাসের পৃষ্ঠায় রক্তক্ষয়ী বিপ্লব হিসেবে খোদাই হয়ে থাকবে।
জুলাইয়ের ১৬ তারিখ থেকে শুরু করে ৪ ও ৫ আগস্ট নিয়ে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত দেড়হাজারের বেশি ছত্রি-জনতা-শিশু-নারী ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ ফ্যাসিবাদী সরকারের গুলিতে শহীদ হন।
উল্লেখ্য, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করা শিক্ষার্থী আবু সাঈদ তিনি ১৬ জুলাই ২০২৪ তারিখে রংপুরে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। আবু সাঈদের ওপর পুলিশের নির্মম গুলির দৃশ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সেইসময় ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল এং তৎকালীন সরকারের ভিত একপ্রকার সেইদিনই ভাঙা হয়ে গিয়েছিল। একই দিনে
চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরাম চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে সংঘর্ষে শহীদ হন এবং ফয়সাল আহমেদ শান্ত ওমরগনি এমইএস কলেজের শিক্ষার্থী ১৬ জুলাই ২০২৪ তারিখে চট্টগ্রামে শহীদ হন।
১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ঢাকায় আন্দোলনকারীদের মাঝে পানি ও বিস্কুট বিতরণের সময় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। একই দিনে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারহান ফায়াজ মোহাম্মদপুরে শহীদ হন। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (MIST)-এর শিক্ষার্থী শেখ আশাবুল ইয়ামিন ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে সাভারে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন।
ইমন হাসান আকাশ: ঢাকার মিরপুরে কর্মরত একজন ক কুরিয়ার সার্ভিসকর্মী। ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন।
—গণঅভ্যুত্থানে অন্তত ১৩৩ জন শিশু ও কিশোর শহীদ হয়, যাদের অনেকেই সরাসরি আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল এবং ঘরের ভেতর গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (UNCRC) এবং বাংলাদেশের জাতীয় শিশু নীতি অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী যেকোনো মানবসন্তানই শিশু হিসেবে গণ্য হয়।
মো. সিয়াম (১৫) ছিলেন আন্দোলনের প্রথম শিশু শহীদ। ১৭ জুলাই ২০২৪ তারিখে ঢাকার মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। ৬ বছর বয়সী রিয়া গোপ ১৯ জুলাই ২০২৪ তারিখে নারায়ণগঞ্জের নয়ামাটি এলাকায় নিজের বাসার ছাদে খেলার সময় মাথায় গুলি লেগে শহীদ হন। ১০ বছরের শিশু সাফকাত সামির ঢাকার মিরপুরে নিজ বাসার ভেতরে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
১৬ বছর ২ মাস ১৩ দিনের গোলাম নাফিজ ঢাকার ফার্মগেট-খামারবাড়ি এলাকায় ৫ আগস্ট ২০২৪ (সরকার পতনের দিন) আন্দোলনে অংশ নিয়ে রিকশার ওপর গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
৪ বছরের আবদুল আহাদ অন্তত ১৩২ জনের বেশি শিশু ও কিশোর ২০২৪ সালের জুলাইয়ের বিক্ষোভে প্রাণ হারায়।
—মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী এই আন্দোলনে অন্তত ১১ জন নারী শহীদ হন।
১৬ বছর বয়সী নাঈমা সুলতানা মাইলস্টোন স্কুলের দশম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে উত্তরায় নিজ ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। তিনি আন্দোলনের প্রথম নারী শহীদ।
২০ জুলাই ২০২৪ তারিখে ২০ বছরের সুমাইয়া আক্তার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আড়াই মাসের সন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে বারান্দায় যাওয়ার পর মাথায় গুলি লেগে ঘটনাস্থলেই মারা যান। ১৯ বছরের লিজা আক্তার রাজধানীর শান্তিনগরে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে বারান্দায় দাঁড়ানো অবস্থায় পেটে গুলি লাগে এবং ২২ জুলাই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
১৭ বছরের রিতা আক্তার দুয়ারীপাড়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে মিরপুর ১০ নম্বরে আন্দোলনের সময় মাথায় গুলি লেগে শহীদ হন।
মেহেরুন্নেসা ১৯ জুলাই তাঁর ভাই শহীদ হওয়ার পর ৫ আগস্ট ভাই হত্যার বিচার চেয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে সড়কে দাঁড়িয়েছিলেন। বাড়ি ফিরে ফোনে কথা বলার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
—ছাত্রদের এই আন্দোলন পরে ছাত্র-জনতার আন্দোলন হযে ওঠে এবং গণঅভুত্থানে রূপ নেয়। এই গণআন্দোলনে ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে ও ঢাকার বাইরে সাধারণ শ্রমিক, দিনমজুর ও রিকশাচালকদের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক।
মো. ফারুক ছিলেন চট্টগ্রামের ষোলশহরে একটি চেয়ারের দোকানের কর্মচারী। আন্দোলনের শুরুর দিকে ১৬ জুলাই ২০২৪ তারিখে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। কুরিয়ার সার্ভিস কর্মী ইমন হাসান আকাশ ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে ঢাকার মিরপুরে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। রাসেল মিয়া সাভার এলাকার একজন পোশাক কারখানা (গার্মেন্টস) শ্রমিক। ৫ আগস্ট সাভারে আন্দোলনকারীদের সাথে থাকার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ কিংবা ‘রক্তাক্ত বসন্ত’ রূপে আখ্যায়িত এই আন্দোলন কেবল একটি নির্মম স্বৈরাচারী শাসনের অবসানই ঘটায়নি, বরং দীর্ঘদিনের রুদ্ধশ্বাস দমবন্ধ পরিবেশ থেকে বাংলাদেশকে নতুন ঐতিহাসিক অধ্যায়ে যুক্ত করেছে। কিশোর-তরুণদের বুক পেতে দেওয়া, দেওয়ালে দেওয়ালে গ্রাফিতির অক্ষরে ক্ষোভের প্রকাশ—রাজপথে বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে শ্লোগান তোলার সেই দিনগুলো ছিল সত্যিই মর্মান্তিক ক্যানভাস!
কিন্তু সেই ঐতিহাসিক অর্জনের দুই বছর পর, ২০২৬ সালের মধ্যভাগে এসেও বিপ্লবের মূল রূপকার—শহীদ পরিবার এবং প্রায় ২৪ হাজার আহত মানুষের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এক গভীর মানবিক ও কাঠামোগত সংকটে স্থবির হয়ে আছে। দীর্ঘ ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের প্রথম দুই মাসের সময়কাল অতিক্রান্ত হলেও এই বিপুল সংখ্যক বীর যোদ্ধার একটি বড় অংশ আজ অবহেলিত, নিভৃত ক্রন্দনে নিমজ্জিত।
—ল্যাটিন আমেরিকার মেঠো বিপ্লব, ফরাসি ইতিহাসের রাজপথ কিংবা আরব বসন্তের রক্তাক্ত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেকোনো গণ-অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হয় তার ‘ক্ষত নিরাময়’ এবং ‘সংক্রমণকালীন ন্যায়বিচার’ প্রক্রিয়ায়। বাংলাদেশ আজ সেই ইতিহাসের কঠিন ও নির্মম কাঠগড়াতেই দণ্ডায়মান।
—বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্র পরিচালনায় যে আমূল সংস্কার বা ‘রেভোলিউশনারি ডাইনামিজম’ অপরিহার্য ছিল, প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামো তা ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতেও প্রথাগত নিয়মের কঠোর ও যান্ত্রিক প্রয়োগ ভুক্তভোগীদের জন্য এক চরম ব্যথা-বেদনা নিয়ে এসেছে।
—হাসপাতালে শয্যাশায়ী গুরুতর আহত ও পঙ্গু মানুষের এককালীন রাষ্ট্রীয় অনুদান প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আটটি ভিন্ন প্রশাসনিক স্তরের ছাড়পত্র, হাসপাতালের পরিচালকের সিলমোহর এবং বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তার প্রত্যয়নপত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
—এই আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দেওয়াল প্রান্তিক মানুষের জন্য এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর সমতুল্য। ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা গ্রামীণ, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য জটিল ইংরেজি ওয়েবসাইট এবং ডিজিটাল ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চোখের দৃষ্টি হারানো তরুণ কিংবা কৃত্রিম পা লাগানোর অপেক্ষায় থাকা গ্রামীণ কিশোরকে সনদের খোঁজে টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরতে হয়—যেন তা শুধু প্রশাসনিক স্থবিরতা নয়, বরং এক চরম মানবিক অবমাননার নামান্তর। সাহায্যের আশায় রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন দপ্তরে বারবার যাতায়াত করেও ব্যর্থ মনোরথ হয়ে শূন্য হাতে ফিরে যাওয়ার ঘটনাগুলো বিপ্লবের চেতনাকেই উপহাস করে চলেছে।
—পুনর্বাসন ও সহায়তার মূল দায়িত্বে নিয়োজিত ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ বর্তমানে চরম আর্থিক কটের মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যেকোনো বড় রাজনৈতিক— সামাজিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র কিংবা বিশ্বব্যাংক যেভাবে বৃহৎ তহবিল গঠন করে, বাংলাদেশে সেই ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কূটনীতি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী দেখা যায়— ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন তাদের অফিশিয়াল সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেছে যে, তারা নীতিমালার অধীনে মোট ৮২৯টি শহীদ পরিবারকে (৪১ কোটি ২৭ লাখ টাকা) এবং ৬,৪৭১ জন আহত জুলাই যোদ্ধাকে (৭৪ কোটি ২১ লাখ টাকা) আর্থিক সহায়তার আওতায় আনতে পেরেছে।
—জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশন (OHCHR) এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বাস্থ্য উপকমিটির প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী মোট শহীদের সংখ্যা ১,৪০০ থেকে ১,৬০০ জনের মধ্যে এবং আহতের সংখ্যা ২২ থেকে ২৪ হাজারের অধিক ধরা হয়। তবে সরকারি গেজেট ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক এমআইএস (MIS) তালিকায় প্রাথমিকভাবে নিবন্ধিত ও স্বীকৃত সংখ্যার সাথে এই মোট হিসাবের কিছুটা প্রশাসনিক তারতম্য রয়েছে।
—সংখ্যার সঠিক তারতম্য সংকটও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে। দুই বছরেও কেন এই সংখ্যার সঠিকতা নিরূপণ করা গেল না বা হল না? সঠিক ডাটাবেজ এবং মাঠ পর্যায়ের নির্ভূল তথ্য জাতির সামনে উপস্থাপন করতে না পারার অর্থ হলো—ইতিহাসকে পেরেকমারা প্রশ্নের সম্মুখীন করা। সকল আহতদেরকে চিকিৎসা করতেই ব্যর্থ, তার উপরে জুলাই যোদ্ধা আহত কত,শহীদ কত? এই সংখ্যা নিয়ে যত দিন যাবে বিভ্রম বাড়তে থাকবে এবং একদিন ইতিহাসের কাছে দায়িত্বরতরাই দায়ী হয়ে থাকবে; এতে কোন সন্দেহ নেই। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না—সে একদিন সকলকেই সত্যের সামনে দাঁড় করাবেই।
—তারপরও আমরা যদি ধরে নেই, মোট ১,৬০০-এর বেশি শহীদ পরিবারের মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র ৮২৯টি পরিবারকে এককালীন আর্থিক অনুদান বা ভাতার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এখনও, বৃহৎ একটি অংশ আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় এখনও বঞ্চিত। প্রায় ২৪ হাজার (এই সংখ্যাও আপাত অনুমানের উপর ধরে নেয়া হলো) আহতের মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র ৬,৪৭১ জন আহত জুলাই যোদ্ধাকে ক্যাটাগরি ভিত্তিক আর্থিক সহায়তা ও চিকিৎসা সুবিধা দেওয়া হয়েছে।এখনও ১৭,০০০ জনেরও বেশি আহত বীর যোদ্ধা কোনো ধরনের স্থায়ী রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং মাসিক ভাতার সুবিধা পাননি।
—দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয়, ওষুধ, অপারেশন এবং এককালীন অনুদান দিতে গিয়ে ফাউন্ডেশনের নিজস্ব তহবিল প্রায় নিঃশেষিত। অর্থ সংকটের কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পর্যন্ত বকেয়া পড়েছে। যে প্রতিষ্ঠানের ওপর হাজার হাজার পরিবারের ভাগ্য ও জীবন-মরণ আজ নির্ভরশীল, তার এই প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক পক্ষাঘাত সামগ্রিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে চরমভাবে মন্থর করেছে। ফলে ওষুধের দোকানে বকেয়া— যন্ত্রণার আর্তনাদ আজ একই বিন্দুতে এসে মিশেছে।
—ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাবিধুর এবং স্পর্শকাতর দিকটি হলো অনুদান বণ্টনকে কেন্দ্র করে শহীদ পরিবারের অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি লড়াই। এ এক নীরব সামাজিক ট্র্যাজেডি! বহু তরুণ শহীদের ক্ষেত্রে তাঁর সদ্য বিবাহিতা বিধবা স্ত্রী এবং বৃদ্ধ পিতা-মাতার মধ্যে এককালীন ৩০ লক্ষ টাকা ও মাসিক ভাতার মালিকানা নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক এবং আইনি বিরোধ তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্র যথাসময়ে একটি দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট বণ্টন নীতিমালা (যেমন—স্ত্রী, সন্তান ও পিতা-মাতার মধ্যে সুনির্দিষ্ট আনুপাতিক ভাগ) আইনি কাঠামোর মাধ্যমে কার্যকর করতে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করেছে। ফলে ‘সাকসেশন সার্টিফিকেট’ বা আদালতের উত্তরাধিকার সনদের জটিলতায় আটকে গেছে অসংখ্য অসহায় মায়ের চোখের জল। যে মা তাঁর সন্তানকে হারিয়েছেন এবং যে তরুণী তাঁর জীবনের আলো হারিয়েছেন; তাঁদের আজ মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রের এই নীতিগত মন্থরতা।
—মানবিক এই সংকটকে আরও জটিল ও বিষাক্ত করে তুলেছে সমাজের একটি সুবিধাবাদী শ্রেণীর অনৈতিক লোভ। প্রকৃত শহীদ ও আহতদের আড়ালে ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট, এক্স-রে রিপোর্ট এবং ভুয়া জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে প্রায় ৫০টিরও বেশি প্রতারক চক্র অনুদান হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করার সময় ধরা পড়েছে। এই নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে কর্তৃপক্ষ প্রতিটি আবেদন অত্যন্ত কড়াকড়ি এবং ধীরগতিতে মাঠপর্যায়ে যাচাই করতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু এই যান্ত্রিক যাচাই প্রক্রিয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে হাসপাতালের শয্যায় পচন ধরা প্রকৃত বিপ্লবীদের। জালিয়াতি রুখতে গিয়ে যে সময় নষ্ট হচ্ছে, তার মাশুল দিচ্ছে প্রকৃত আহতদের পঙ্গুত্ব ও অবর্ণনীয় শারীরিক কষ্ট।
—১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুদায়িত্ব পালন করাকালীন সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক মনোযোগের একটি বড় অংশ চলে যায় নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের রাজনৈতিক সমীকরণে। পরবর্তীতে নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দুই মাসে প্রশাসনিকভাবে গুছিয়ে ওঠার মন্থরতায় পুনর্বাসন প্রক্রিয়াটি গতি হারিয়ে ফেলে।
—উপরন্তু, অতীতে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা দলীয় সংশ্লেষের ভিত্তিতে তালিকাভুক্তকরণে কিছু বৈষম্যের অভিযোগ ওঠায় পুরো ডাটাবেজকে নতুন করে বিন্যাস করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এই রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল এবং প্রাতিষ্ঠানিক মনোযোগের বিচ্যুতি সময়কে আরও দীর্ঘায়িত করেছে, ফলে মাঠপর্যায়ে সাহায্য পৌঁছানোর কাজ স্থবির হয়ে পড়েছে।
—বিশ্বের যেকোনো সফল বিপ্লবের পর সম্মুখসারির যোদ্ধাদের যদি প্রথাগত ফাইলের নিচে ফেলে রাখা হয়, তবে সেই রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে তার নৈতিক বৈধতা ও আত্মিক শক্তি হারায়। জুলাইয়ের শহীদ পরিবার ও আহতদের পাশে দাঁড়ানো কোনো দয়া কিংবা দাতব্য কাজ নয়—এ হলো, এই নতুন গণপ্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বের ঋণ। কেন দুইবছর পরও থামেনি জুলাইয়ের আর্তনাদ?
—২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের বীর সৈনিকদের প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় সম্মান, সামাজিক স্বীকৃতি এবং আইনি মর্যাদা অবিলম্বে প্রদান করা রাষ্ট্রের পরম কর্তব্য। যারা বুক পেতে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছেন, তাঁদের আজ হাসপাতালের বারান্দায় কিংবা দপ্তরের টেবিলে অবহেলার শিকার হওয়া চরম জাতীয় লজ্জার বহিঃপ্রকাশ।
বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে সব ধরনের রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে, আন্তর্জাতিক দাতা গোষ্ঠী, করপোরেট সেক্টর ও জাতীয় খাতের সমন্বয়ে একটি বিশেষ ‘জরুরি স্বাধীন তহবিল’ গঠন করে নৈতিকভাবে এসকল পরিস্থিতি মোকাবেলা করা উচিত। আমলাতান্ত্রিক ফিতার দেওয়াল ভেঙে প্রতিটি প্রকৃত ভুক্তভোগীর দোরগোড়ায় আজীবন চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের আইনি অধিকার পৌঁছে দেওয়াই হবে জুলাইয়ের রক্তের প্রতি প্রকৃত মানবিক বিচার। তা না হলে, ক্ষমতার চির আনন্দে এবং নতুন দিনের কোলাহলে জুলাইয়ের এই আর্তনাদ অন্তহীন দীর্ঘশ্বাস হয়ে ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে!
—ইতিহাসের পরমপরায় এখানে উল্লেখ্য করা প্রয়োজন,ইতোপূর্বে আরও দুইটি গণঅভ্যুথান বাংলাদেশে সংগঠিত হয়েছে। ৬৯’র ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান, ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানও স্মরণীয়। ২৪ এর গণঅভ্যুত্থান নিয়ে এই ত্রয়ী গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের স্বাধীনতার থেকে শুরু করে গণতন্ত্রের পথ উত্তরণে অভূর্তপূর্ব এবং ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে।
—১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ঐতিহাসিক তথ্য এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি নথির হিসাব অনুযায়ী, ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত চলা আইয়ুব বিরোধী এই গণআন্দোলনে সমগ্র তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১০৮ জনেরও বেশি মানুষ শহীদ হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ও তৎকালীন সংবাদপত্রগুলো যেমনঃ দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক পাকিস্তান সহ বিভিন্ন পত্রিকা সহ তথ্য বিশ্লেষণ করে ইতিহাসবিদ ও গবেষকেরা মোট শহীদের সংখ্যা ১০৮ জন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য, বাংলাপিডিয়া ও জাতীয় তথ্যকোষ (বাংলাপিডিয়া (Mass Upsurge, 1969) এবং জাতীয় তথ্য বাতায়নে জানুয়ারি মাসের তীব্র আন্দোলনের বিবরণ রয়েছে, যেখানে ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান (শহীদ আসাদ), ২৪ জানুয়ারি নবকুমার ইনস্টিটিউটের নবম শ্রেণীর ছাত্র মতিউর রহমান মল্লিক এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটের (প্রধান ফটক) সামনে শহীদ হন। এইরকম শত বীরদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে আন্দোলনটি গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
— ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি চলাকালীন ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর গুলিস্তানের জিরো পেয়েনেট পলিশের গুলিতে নুর হোসেন শহীদ হন। মূলত আন্দোলনের মুলগতি তখণ থেকে শুরু হয় যা ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা তীব্র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে প্রায় ১০০ জন আন্দোলনকারী শহীদ হন। ১৯৯০ বাংলাদেশ গণঅভ্যুত্থান (1990 Bangladesh mass uprising) শীর্ষক আন্তর্জাতিক নথিতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, এই আন্দোলনে প্রায় ১০০ জন মানুষ প্রাণ হারান (About one hundred people died during the protests)। এর মধ্যে ২৭ নভেম্বর জরুরি অবস্থা জারির পর শেষ কয়েক দিনেই রাস্তাঘাটের সংঘর্ষে প্রায় ৫০ জন শহীদ হন। এই অভ্যুত্থানের মূল ভিত্তি ছিল ১০ অক্টোবর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে শহীদ জেহাদ ও মনোয়ারের মৃত্যু। পরবর্তীতে ২৭ নভেম্বর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (BMA) তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব ডা. শামসুল আলম মিলন এবং হত্যাকাণ্ড এই আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দেয়। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০—এই দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ধরলে মোট শহীদের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। কিন্তু ১৯৯০ সালের মূল 'নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান' অংশে নিহতের সংখ্যা ১০০ জনের কাছাকাছি।
১৯৭১’এর মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের এবং মুক্তিযোদ্ধাদের যেরকম সম্মানী, ভাতা সুবিধাদি আছে, সেইরূপ ২৪’র গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের প্রায় একই ধরনের সুবিধা প্রদান করছে রাষ্ট্র । কিন্তু ৬৯’, ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের শহীদেরা একই সুবিধা পায়নি; অথচ তাদেরও পাওয়ার কথা।
—ঐতিহাসিকভাবে ১৯৬৯ এবং ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার বা আহত যোদ্ধাদের জন্য স্থায়ী কোনো রাষ্ট্রীয় মাসিক ভাতা কিংবা সম্মানী চালু নেই। তবে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন-পরবর্তী সরকারগুলোর পক্ষ থেকে এবং বেসরকারি উদ্যোগে কিছু এককালীন আর্থিক সহায়তা বা ট্রাস্টের মাধ্যমে অনুদান দেওয়া হয়েছিল।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ও ভাতা মূলত ১৯৭১ সালের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে।
—স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে শহীদ আসাদ, শহীদ মতিউর, সার্জেন্ট জহুরুল হকের মতো জাতীয় বীরদের সম্মানার্থে বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ও রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে, তবে তাদের পরিবারের জন্য আজীবন রাষ্ট্রীয় কোনো মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করা হয়নি।
—১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর ১৯৯০ সালের শহীদদের স্মরণে একটি ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছিল। আন্দোলন সফল হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের আমলে 'নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার কল্যাণ ট্রাস্ট' গঠন করা হয়। এই ট্রাস্টের মাধ্যমে শহীদদের পরিবারগুলোকে যেমনঃ শহীদ ডা. মিলনের পরিবার, শহীদ নূর হোসেনের পরিবার তৎকালীন সময়ে এককালীন আর্থিক অনুদান, জমি বা ফ্ল্যাট এবং পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে কোনো স্থায়ী রাষ্ট্রীয় মাসিক সম্মানী বা "যোদ্ধা ভাতা" তাদের দেওয়া হয়নি। তবে টিএসসিতে শহীদ ডাঃ মিলন স্কয়ার এবং গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে শহীদ নুর হোসেন স্কয়ার করা হয়েছে।
—বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে কেবল ১৯৭১ সালের গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধারাই স্থায়ী রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতা পেয়ে আসছেন। তবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর গঠিত সরকার 'জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ' জারি করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নতুন করে "জুলাই শহীদ" ও "জুলাই যোদ্ধা" ক্যাটাগরি তৈরি করে মাসিক ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত স্থায়ী রাষ্ট্রীয় ভাতার চালু হয়েছে ।
—বিশ্বের বেশ কিছু দেশে গণঅভ্যুত্থান ও বিপ্লবের শহীদ এবং আহতদের সম্মানি ও ভাতা দেওয়ার ঐতিহাসিক ও বর্তমান রাষ্ট্রীয় নিয়ম রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৭৭৬ সালের আমেরিকান বিপ্লবে আহত ও পঙ্গু হওয়া যোদ্ধাদের জন্য পৃথিবীর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক আজীবন পেনশন ও সম্মানি ব্যবস্থা চালু করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিনে দীর্ঘদিনের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও গণঅভ্যুত্থানে (ইন্তিফাদা) নিহত বা পঙ্গু ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য 'শহীদ ও বন্দী তহবিল' নামের বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় বাজেটের একটি বড় অংশ সরাসরি মাসিক সম্মানি হিসেবে বণ্টন করা হয়। ২০১১ সালের আরব বসন্তের পর তিউনিসিয়া ও মিশরেও এই ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয়; যেখানে তিউনিসিয়া সরকার বিশেষ ডিক্রির মাধ্যমে 'বিপ্লবের শহীদ ও যোদ্ধাদের' নিয়মিত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ভাতা দেয় এবং মিশর সরকার প্রতিটি শহীদ পরিবারের জন্য আজীবন মাসিক পেনশনসহ এককালীন ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করে। এছাড়া, বর্তমান বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর 'জুলাই শহীদ' ও 'জুলাই যোদ্ধা' ক্যাটাগরি তৈরি করে শহীদ পরিবারকে এককালীন আর্থিক অনুদানসহ স্থায়ী মাসিক রাষ্ট্রীয় সম্মানি ভাতা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
—ইতিহাসের অখণ্ড ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং আগামী প্রজন্মের মননে একটি জাতিরাষ্ট্রের সঠিক বিবর্তনগাথা পৌঁছে দেওয়ার স্বার্থে, ১৯৬৯ ও ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের বীর যোদ্ধাদের এই স্থায়ী রাষ্ট্রীয় ভাতার কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত যৌক্তিক ও সুদূরপ্রসারী এক ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।
১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান কোনোটিই হঠাৎ করে একদিনে কিংবা শূন্য থেকে তৈরি হয়নি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল আমাদের স্বাধীনতার মূল প্রবেশদ্বার, আর ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল স্বৈরাচারের হাত থেকে সেই অর্জিত গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করার লড়াই। পূর্ববর্তী এই গণলড়াইগুলোর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ছাড়া একটি জাতির স্বাধীনতার ইতিহাস কখনোই অখণ্ড বা সম্পূর্ণতা পায় না।
—একটি শিশু ও তরুণ জানবে; রাষ্ট্র কেবল সাম্প্রতিক বীরত্বকেই নয়, বরং বহু বছর আগের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ত্যাগকেও সমান মর্যাদায় লালন করছে, তখন তাদের মধ্যে সুগভীর দেশপ্রেম জাগ্রত হবে। আগামী প্রজন্মদের কাছে এই অমোঘ বার্তা পৌঁছে দেওয়া উচিৎ হবে যে—রাষ্ট্র কখনো তার বীর সন্তানদের ভুলে যায় না; ত্যাগের স্বীকৃতি সময় ও কালের ফ্রেমে বন্দি হয় না। অতীত সংগ্রামের যোদ্ধারা উপেক্ষিত হলে, সময়ের পরিক্রমায় সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায়, আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে; একসময় তা বিকৃতির ঝুঁকিতে পড়ে। তাদের রাষ্ট্রীয় ভাতার কাঠামোর আওতায় এনে জীবিত রাখা মানে হচ্ছে জীবন্ত ইতিহাসকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, যা নতুন প্রজন্মের কাছে সত্যের অনন্য দলিল হিসেবে টিকে থাকবে।
—১৯৬৯ ও ১৯৯০-এর শহীদ ও আহতদের আজীবন রাষ্ট্রীয় সম্মানি দেওয়া কেবল এক টুকরো আর্থিক স্বস্তি নয়, বরং স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তা আজীবন লড়াইয়ের চিরন্তন রাষ্ট্রীয় ইশতেহার। এতে প্রমাণ হয়, এদেশের মাটি সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল এবং রাষ্ট্র চিরকাল সেই বিদ্রোহী চেতনার পাশে দাঁড়ায়।
কিন্তু বরাবর মানুষের অনুকুলে সেই সবের ফসল অধিকাংশ ক্ষেত্রে পক্ষে থাকে না। আদিকাল থেকে যুগে যুগে পৃথিবীর ইতিহাসে ক্ষমতার সর্বগ্রাসী রূপ মানুষের প্রতিকুলেই বেশি কাজ করে। একে ঠিক নিয়তি বলা চলে না। এ হলো শোষিতের ইতিহাস। তবে ইতিহাস ঠিকই সকল পুঞ্জিভূত ক্ষোভের দানাগুলো দিয়ে একদিন মুক্তোর মালা গাঁথে। মানুষ তা থেকে শিক্ষা নেয় না। ফল, ফেল অনিবার্য্।
২০৮ বার পড়া হয়েছে