সর্বশেষ

মতামত

এক বৈশ্বিক চেতনার কবি

লিটন আব্বাস
লিটন আব্বাস

রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬ ১:৫৮ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:

কাজী নজরুল ইসলামের সমসাময়িক সময়ে (১৮৯৯-১৯৭৬) বিশ্বজুড়ে বেশ কয়েকজন বিশ্বখ্যাত এবং কালজয়ী কবি-সাহিত্যিক ছিলেন, যাঁরা নজরুলের বিপ্লবী লেখনী, সাম্যবাদী দর্শন এবং সৃষ্টিশীল প্রতিভার খবর রাখতেন, তাঁকে চিনতেন এবং অনেকেই তাঁর কাজের ভূয়সী প্রশংসাও করেছিলেন।

নজরুলকে আন্তর্জাতিকভাবে মূল্যায়ন করা ও তাঁর কাজ সম্পর্কে অবগত থাকা সমসাময়িক প্রধান কবিদের মধ্যে নজরুলের সমকালের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ব্যক্তিত্ব হলেন নোবেলজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুলকে গভীরভাবে চিনতেন ও স্নেহ করতেন। তিনি নজরুলকে তাঁর 'বসন্ত' গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছিলেন এবং নজরুলের অনশন ভাঙাতে বিখ্যাত টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন । তিনি নজরুলকে বাংলা সাহিত্যের এক অবিনাশী শক্তি হিসেবে গণ্য করতেন।
নাজিম হিকমত; তুরস্কের এই মহান বিপ্লবী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কবি নজরুলের সমসাময়িক ছিলেন। নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতা এবং তুর্কি বিপ্লব নিয়ে লেখা 'কামাল পাশা' কবিতাটির কথা নাজিম হিকমত জানতেন। নজরুলের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও শোষিত মানুষের পক্ষে লেখার বৈপ্লবিক সুরের সাথে নাজিম হিকমতের দর্শনের এক আত্মিক মিল ছিল।
অবিভক্ত ভারতের অন্যতম প্রধান দার্শনিক কবি আল্লামা ইকবাল নজরুলের সমসাময়িক ছিলেন। তিনি নজরুলের উর্দু ভাঙা ফার্সি ও আরবি শব্দের মেলবন্ধনে তৈরি নতুন কাব্যশৈলী এবং ইসলামী পুনর্জাগরণের গান ও গজলগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন ।
আন্তর্জাতিক প্রগতিশীল লেখক ও কবিদের ফোরামে (যেমন—সোভিয়েত ইউনিয়নের 'রাইটার্স ইউনিয়ন') যখন নজরুলের ঔপনিবেশিক বিরোধী এবং বলশেভিক বিপ্লব দ্বারা অনুপ্রাণিত লেখাগুলোর রুশ ও ফরাসি অনুবাদ পৌঁছায়, তখন সমসাময়িক ল্যাটিন আমেরিকান কবি পাবলো নেরুদা এবং ফরাসি কবি লুই আরাগঁ নজরুলের বিপ্লবী চেতনার ভূয়সী প্রশংসা করেন ।
আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক ধারার এই বিশ্বখ্যাত কবি নজরুলের সমসাময়িক ছিলেন। সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ না থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি নজরুলের অগাধ পাণ্ডিত্য ও অনুবাদ (যেমন—হাফিজ ও ওমর খৈয়ামের অনুবাদ) এবং জিবরানের সুফি দর্শনের মেলবন্ধনের কারণে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সার্কেলে উভয়ের কাজের পারস্পরিক আলোচনা হতো ।
এ ছাড়া নজরুলের সমসাময়িক ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এবং কবি ও চিত্রশিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন নজরুলকে বিপ্লবী চেতনার এক অনন্য আইকন হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন ও চিনতেন।
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের এক বিস্ময়কর ও বৈপ্লবিক প্রতিভা । তিনি প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে সাহিত্যে এক সম্পূর্ণ নতুন যুগের সূচনা করেন। তাঁর কলম শুধু লাল বা নীল গোলাপ ফোটায়নি, বরং সাদা, কালো, হলুদ ও সবুজের মতো অজস্র বৈচিত্র্যময় ও বিপরীতধর্মী ভাবের ফুল ফুটিয়েছে। তিনি একাধারে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছেন, আবার প্রেমের সুধাও বিলিয়েছেন। এই ভিন্নধর্মী বৈশিষ্ট্য, অসাধারণ নজরুল-প্রতিভা, মানুষের জন্য অকাতর ভালোবাসা এবং দেশের জন্য জীবন বাজি রাখার অসীম সাহসই তাঁকে অন্য সব লেখকের চেয়ে আলাদা করে আমাদের 'জাতীয় কবি'র আসনে বসিয়েছে ।
নজরুলের সাহিত্যিক ধারা ছিল তৎকালীন প্রথাগত ধারা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি সাহিত্যকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি, বরং একে শোষণের বিরুদ্ধে হাতিয়ার করেছিলেন। তিনি আরবি, ফার্সি শব্দের সাথে বাংলা শব্দের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটান । তাঁর সাহিত্যিক ধারা প্রথাগত ধারা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কবির নিজের ভাষায়ঃ
"মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য।" — (বিদ্রোহী) ।

সঙ্গীতে বৈচিত্র্যতিনি ছিলেন অনন্য। তিনি প্রায় ৩,০০০ গান রচনা করেছেন । এর মধ্যে রয়েছে একই সাথে অগ্নিঝরা দেশাত্মবোধক গান, কীর্তন, শ্যামাসংগীত এবং ইসলামী গজল ।
রাগ ও তাল সৃষ্টিতে ছিল অলৌকিক প্রতিভা। বাংলা গানের ইতিহাসে সুর সংযোজন অনেকেই করেছেন, কিন্তু ধ্রুপদী সঙ্গীতের ব্যাকরণ ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন রাগ এবং নতুন তাল সৃষ্টি করার মতো দুঃসাধ্য কাজ নজরুলের আগে বা পরে আর কেউ করতে পারেননি।
নতুন রাগ ও তালের রূপকার: নজরুল সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রতিভায় ১৮টি নতুন রাগঃ বেণুকা, অরুণ ভৈরব, আশা ভৈরব, শিবানী ভৈরব, উদাসী ভৈরব, যোগিনী, শঙ্করী ইত্যাদি) এবং ১১টি নতুন তালঃ প্রিয়াছন্দ, মণিমালা ছন্দ, মঞ্জুভাষিণী, স্বাগতা, মন্দাকিনী, নন্দন তাল ইত্যাদি সৃষ্টি করেন।
তৎকালীন সময়ে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানি, টুইন রেকর্ড কোম্পানি এবং কলকাতা বেতারের সীমিত প্রযুক্তির যুগেও তিনি এই রাগ-তালগুলো সৃষ্টি করে সেগুলোর সফল রেকর্ডিং করিয়েছিলেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা ছাড়াই; সহজাত ঐশ্বরিক প্রতিভায় এই জটিল রাগ ও তালের জন্ম দেওয়া সমসাময়িক কোনো সুরকার বা লেখকের পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল। সঙ্গীত সাগরের এই একক সৃষ্টিতে নজরুল সত্যিই অনন্য ও একক সম্রাট।

মেহনতি মানুষের কবি নজরুল কেবল লেখার টেবিলে বসে সাহিত্যচর্চা করেননি, তিনি ছিলেন মাঠ-ঘাটের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের অকপট কণ্ঠস্বর। সমাজে শোষিত কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সরাসরি সাংবাদিকতা ও পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। তিনি অবিভক্ত বাংলায় প্রধানত ৩টি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন।
‘নবযুগ’ নামে ১৯২০ সালের ১২ জুলাই কমরেড মুজাফফর আহমদের সাথে যুগ্মভাবে প্রকাশিত সান্ধ্য দৈনিক পত্রিকা।
১৯২২ সালের ১১ আগস্ট প্রকাশিত ধূমকেতু পত্রিকা হলো তাঁর নিজস্ব অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা। ১৯২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত কৃষক-শ্রমিক দলের মুখপত্র ‘লাঙল’ (পরে 'গণবাণী' নামে) প্রকাশিত হয়। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময়ে 'গণবাণী', 'সেবক' এবং 'সওগাত' পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
নজরুল ছিলেন আপাদমস্তক একজন মানুষের কবি। শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য তিনি আমৃত্যু লড়েছেন। মানবতার অপমানে তাঁর কলম গর্জে উঠেছে বারবার।
সাম্যবাদ ও মানবতাবাদ: জাত-পাত, ধর্ম এবং ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ ভুলে তিনি মানুষের জয়গান গেয়েছেন । তাঁর কাছে মানুষের চেয়ে বড় কিছু ছিল নাঃ "গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই,
নহে কিছু মহীয়ান!" — (মানুষ)।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অসামান্য রূপকার নজরুল হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে অসাম্প্রদায়িক এক দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি দুই সম্প্রদায়কে একই মায়ের দুই সন্তান হিসেবে কল্পনা করেছেন।
"মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।
মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ॥" — (গান)

বড়দের জন্য যিনি বজ্রকঠিন কবিতা লিখতেন, শিশুদের জন্য তাঁর সৃষ্টি ছিল ভীষণ সরল, মেলোডিয়াস ও আনন্দময়। তিনি মননে, মানসে ও হৃদয়ে নিজেও এক চির-শিশু ছিলেন । শিশুদের কৌতূহল ও চঞ্চলতাকে তিনি দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।শিশুমনের অদম্য কৌতূহল ও বিশ্বকে জানার যে ব্যাকুলতা, তা তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর বিখ্যাত কবিতায়ঃ
"থাকব না কো বদ্ধ ঘরে দেখব এবার জগৎটাকে,
কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।" — (সংকল্প)

চিরচেনা গ্রাম-বাংলা আর একটি শিশুর সাথে কাঠবিড়ালির মান-অভিমানের মিষ্টি কথপোকথন নজরুলের চেয়ে সাবলীলভাবে আর কেউ ফুটিয়ে তুলতে পারেনি।
"কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও?
গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবি-নেবু? লাউ?"
— (খুকী ও কাঠবিড়ালি) ।

বাংলা সাহিত্য তো বটেই, বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেও নজরুল এখানে সম্পূর্ণ অনন্য। দেশের স্বাধীনতার জন্য, শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করে এতবার জেল খাটা এবং জেলের ভেতরে অনশন করার নজির আর কোনো লেখকের ইতিহাসে নেই। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলায় কবিকে দু'বার রাজদ্রোহের মামলায় দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগ করতে হয় । আলিপুর ও হুগলি সেন্ট্রাল জেলে তাঁকে সাধারণ কয়েদিদের মতো শিকল পরিয়ে, ডান্ডাবেড়ি দিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হতো। হুগলি জেলে বন্দিদের ওপর ব্রিটিশ সুপারিন্টেনডেন্টের অত্যাচারের প্রতিবাদে নজরুল টানা ৪০ দিন ঐতিহাসিক অনশন ধর্মঘট পালন করেন । তাঁর অবস্থা এতটাই আশঙ্কাজনক হয়েছিল যে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলং থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিখ্যাত টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেনঃ "Give up hunger strike, our literature claims you" ।

তাঁর আপসহীন লেখনীর কারণে ব্রিটিশ সরকার তাঁর ৫টি বিখ্যাত বই (যুগবাণী, বিষের বাঁশী, ভাঙার গান, প্রলয় শিখা ও চন্দ্রবিন্দু) পুরোপুরি নিষিদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত করে । তিনি তাঁর 'রাজবন্দীর জবানবন্দী' প্রবন্ধে অকপটে বলেছিলেনঃ "আমার হাতের বাঁশিতে সুর ফুটিয়াছিল,
আমি তো অপরাধ করি নাই।
সুর যাহার, অপরাধ তাহারই।"
— (রাজবন্দীর জবানবন্দী)

নজরুলের জীবন যেমন ছিল ঝোড়ো, তেমনই তাঁর শেষ জীবন ছিল চরম অবহেলা ও উপেক্ষায় ঘেরা। অসামান্য প্রতিভার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও নজরুলকে আজীবন চরম দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করতে হয়েছে। তৎকালীন সমাজ তাঁর প্রতিভার কদর করলেও আর্থিক নিরাপত্তা দিতে পারেনি।
পিকস ডিজিজ রোগে আক্রান্ত হন কবি। এটি মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল ও টেম্পোরাল লোব নামক অংশগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করার মাধ্যমে স্মৃতিশক্তি, ব্যক্তিত্ব এবং কথা বলার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই, ৪৩ বছর বয়সে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। জীবনের দীর্ঘ ৩৪টি বছর তিনি নির্বাক ও পঙ্গু অবস্থায় কাটিয়েছেন। সমাজ তাঁর দূরদর্শী বোধ ও দর্শনকে অনেক দেরিতে উপলব্ধি করেছে।

অন্যান্য লেখকদের সাথে নজরুলের লেখার পার্থক্য পরিস্কার ছিল। তৎকালীন অন্য লেখকদের লেখায় যখন ধ্রুপদী ভাবগাম্ভীর্য ও আধ্যাত্মিকতার প্রাধান্য ছিল, নজরুল তখন বাস্তবতার ধুলোবালি ও শোষিত মানুষের সপক্ষে সোজা ভাষায় কথা বলেছেন। অন্য লেখকেরা যেখানে রাজরোষ এড়াতে সতর্ক থাকতেন, নজরুল সেখানে বুক ফুলিয়ে রাজদ্রোহী হয়েছেন, বুকফাটা সত্য বলে জেল খেটেছেন, অনশন করেছেন। অন্য লেখকেরা যেখানে শব্দের অলংকার দিয়ে সৌন্দর্য সৃষ্টি করতেন, নজরুল সেখানে শব্দের বজ্রপাতে অন্যায়কে গুঁড়িয়ে দিতেন । সমাজ ও সমকালকে দেখার এই তীক্ষ্ণ "নজরুল বোধ" এবং তাঁর আপসহীন রূপটিই তাঁকে সাহিত্যের আঙিনায় এক নিঃসঙ্গ ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী বীর-এ পরিণত করেছে।
এতোকিছুর পরও, নজরুল থেকেছেন উপেক্ষিত। তিনি রাজনীতিও করেছিলেন কিছুদিন এবং নির্বাচনও করেছিলেন জনগণের মুক্তির আশায়। কিন্তু সেখানেও ট্র্যাজেডি। নজরুলের প্রথাবিরোধী আধুনিক লেখা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে তৎকালীন অভিজাত ও গোঁড়া লেখক সমাজ সহজে গ্রহণ করতে পারেনি। অনেকে তাঁর ভাষাকে 'ইতর' বা 'রুচিহীন' বলে উপহাস করেছেন । তাঁকে এক পক্ষ 'কাফের' এবং অন্য পক্ষ 'ইসলামপন্থী' বলে সাহিত্যিক আঙিনায় একঘরে করার চেষ্টা করেছে। অসামান্য প্রতিভার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন সাহিত্য সমাজ তাঁর চরম অর্থনৈতিক সংকটে পাশে দাঁড়ায়নি।
নজরুল কেবল কাগজ-কলমে মুক্তির কথা বলেননি, সাধারণ মানুষের অধিকারের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব করতে চেয়েছিলেন। ১৯২৬ সালে তিনি বর্তমান ঢাকা, ফরিদপুর ও ময়মনসিংহ নিয়ে গঠিত আসন থেকে 'কেন্দ্রীয় আইনসভা'র সদস্য পদে নির্বাচনে দাঁড়ান। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, যে বাঙালি সমাজ তাঁর গানে ও কবিতায় করতালি দিত, ভোটের রাজনীতিতে তারা কবিকে প্রত্যাখ্যান করে। রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের অসহযোগিতা এবং অর্থকড়ির অভাবে ঢাকার নবাব পরিবার ও বড় বড় পুঁজিপতি জমিদারদের (যেমন ঢাকার খাজা আবদুল করিম, ময়মনসিংহের গজনভি) টাকার খেলায় কবির শোচনীয় পরাজয় ঘটে । এই পরাজয় কবিকে মানসিকভাবে ভীষণ আঘাত করেছিল ।

বাংলা সাহিত্যের গণ্ডি পেরিয়ে যদি বৈশ্বিক মানদণ্ডে নজরুলের সাহিত্যকে বিচার করা হয়, তবে একটি চরম ও নির্মম সত্য সামনে আসে—বিশ্বসাহিত্যে নজরুল চরমভাবে কম মূল্যায়ন পেয়েছেন এবং অবহেলার শিকার হয়েছেন।
"...নজরুলের শক্তিশালী দ্রোহ, কালজয়ী সাম্যবাদ ও গভীর দর্শন সংবলিত সাহিত্য ইংরেজি, রুশ, উর্দু, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, জার্মান, ইতালীয়, তুর্কি, চীনা ও জাপানি সহ বিশ্বের অন্তত ১১টি প্রধান ভাষায় অনূদিত হলেও তা ছিল যৎসামান্য । পাবলো নেরুদা কিংবা নাজিম হিকমতের মতো আন্তর্জাতিক বিপ্লবী কবিরা বিশ্বজুড়ে যে বিপুল প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন (যেমন নোবেল পুরস্কার) পেয়েছেন, নজরুল সমমানের সৃষ্টি করা সত্ত্বেও অনুবাদের প্রাতিষ্ঠানিক অভাব ও বৈশ্বিক রাজনীতির কারণে তা পাননি। তাঁর সাহিত্যের এই আন্তর্জাতিক অবমূল্যায়ন আসলে বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেরই একটি বড় খামতি।"
নজরুলের সমসাময়িক কিংবা পরবর্তী অনেক বিশ্বমানের লেখকের লেখা যেভাবে ইংরেজি বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষায় অনুদিত হয়ে বিশ্বের দরবারে পৌঁছেছে, নজরুলের শক্তিশালী দ্রোহ, কালজয়ী সাম্যবাদ ও গভীর দর্শন সংবলিত সাহিত্য সেভাবে অনুদিত হয়নি।
কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ (বিশেষ করে তাঁর বিখ্যাত 'বিদ্রোহী' কবিতা, বেশ কিছু দেশাত্মবোধক গান, গল্প ও উপন্যাস) বিশ্বসাহিত্যের দরবারে বিভিন্ন সময়ে অনূদিত ও সমাদৃত হয়েছে । কবি নজরুল ইনস্টিটিউট এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুবাদকদের তথ্য অনুযায়ী, নজরুলের সাহিত্য প্রধানত ১১টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ভাষা এবং উপমহাদেশের প্রায় ৩৩টিরও বেশি আঞ্চলিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে ।
কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি চেতনা । দারিদ্র্য, সামাজিক অবহেলা, রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা, কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ এবং অনশনের তীব্র যন্ত্রণাকে জয় করে তিনি মেহনতি মানুষের জন্য যে অকাতর সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তাঁর বিচিত্র ধারার সৃষ্টি, মানবিক বৈশিষ্ট্য এবং অন্যায়ের মুখে সত্য বলার যে অমিত সাহস, তা আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই তিনি আমাদের জাতীয় কবি এবং যুগ যুগ ধরে বাঙালির মুক্তির পরম প্রেরণা ।

লেখক : কবি ও নাট্যকার।

১১৯ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন