উন্মুক্ত হচ্ছে ওসমানীর আকাশ
বিদেশি এয়ারলাইন্স ফিরলে বদলে যেতে পারে সিলেটের আকাশপথ
বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬ ৯:০১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
'আন্তর্জাতিক' নামটি বহু বছর ধরেই আছে। কিন্তু বাস্তবে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আকাশে উড়েছে মূলত দেশের নিজস্ব এয়ারলাইনসের বিমানই। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রানওয়ে সম্প্রসারণ, আধুনিক কার্গো ও ওয়্যারহাউস নির্মাণ, নতুন টার্মিনালসহ নানা অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও বিদেশি কোনো এয়ারলাইনসের নিয়মিত ফ্লাইট ছিল না ওসমানীতে।
দীর্ঘদিন ধরে সিলেটবাসী ও প্রবাসীদের অন্যতম দাবি ছিল—ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে প্রকৃত অর্থেই একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিণত করা। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। বর্তমান সরকারের উদ্যোগে চলতি বছরের শেষ নাগাদ একাধিক বিদেশি এয়ারলাইনস সিলেট থেকে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ওসমানীর আকাশে ফিরবে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের উপস্থিতি, আর সিলেটের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরাসরি যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
গত এক দশকে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক কার্গো ও ওয়্যারহাউস সুবিধা। নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনাল নির্মাণসহ আরও কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে।
এসব উন্নয়ন কাজের ফলে বড় আকারের উড়োজাহাজ ওঠানামার সক্ষমতা অর্জন করেছে বিমানবন্দরটি। কিন্তু অবকাঠামোগত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশি এয়ারলাইনসের অনুপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সরাসরি যুক্তরাজ্যের লন্ডন ও ম্যানচেস্টার, সৌদি আরব, কাতার, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ ও আবুধাবি রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
এ ছাড়া আগামী আগস্ট থেকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় সরাসরি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিদেশি এয়ারলাইনস হিসেবে প্রথম ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক 'ফ্লাই দুবাই'।
২০১৫ সালের ১ এপ্রিল সিলেট-দুবাই রুটে যাত্রা শুরু করে এয়ারলাইনসটি। শুরুতে সপ্তাহে পাঁচ দিন এবং পরে প্রতিদিনই ফ্লাইট পরিচালনা করত। যাত্রীচাহিদাও ছিল সন্তোষজনক। তবে নিজস্ব বাণিজ্যিক ও পরিচালনাগত কারণে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তারা সিলেট রুট থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও ফ্লাই দুবাই সিলেটে ফ্লাইট পরিচালনায় আগ্রহ প্রকাশ করেছে। জাতীয় সংসদে বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা জানিয়েছেন, সরকার এয়ারলাইনসটিকে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ফ্লাই দুবাই আবারও ওসমানীতে ফ্লাইট শুরু করতে পারে।
শুধু ফ্লাই দুবাই নয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আরেকটি জনপ্রিয় এয়ারলাইনস 'এয়ার আরাবিয়া'ও সিলেট থেকে ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা করছে। বছরের শেষ কিংবা আগামী বছরের শুরুতে সিলেট-দুবাই রুটে তাদের ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে ওমানভিত্তিক বাজেট এয়ারলাইনস 'সালাম এয়ার' আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেট-মাস্কট রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক হাফিজ আহমদ জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে সপ্তাহে তিনটি ফ্লাইট পরিচালনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে সালাম এয়ার। এ ফ্লাইট চালু হলে তুলনামূলক কম ভাড়ায় ওমানে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন সিলেট অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী।
সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সিলেট-ম্যানচেস্টার রুট পুনরায় চালু হয়েছে। উদ্বোধনী ফ্লাইটে আগত যাত্রীদের স্বাগত জানান বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।
এ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে। ভবিষ্যতে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও ইতিবাচক পর্যায়ে পৌঁছালে সিলেট-গুয়াহাটি রুটেও সরাসরি ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আরও কয়েকটি শহরের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তার মতে, এতে শুধু যাত্রী চলাচলই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি এয়ারলাইনসের ফ্লাইট চালু হলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন সিলেট অঞ্চলের লাখো প্রবাসী। টিকিটের মূল্য কমার পাশাপাশি যাত্রীদের জন্য বিকল্প এয়ারলাইনস বেছে নেওয়ার সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কার্গো পরিবহন সহজ হওয়ায় রপ্তানি বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সিলেট অঞ্চলের সাবেক সভাপতি আবদুল জব্বার জলিল বলেন, "ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যে সক্ষমতা রয়েছে, তার পূর্ণ ব্যবহার এতদিন সম্ভব হয়নি। বিদেশি এয়ারলাইনসের ফ্লাইট চালু হওয়া সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। সরকারের বর্তমান উদ্যোগ সফল হলে শুধু প্রবাসীরাই নন, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি, পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্য নতুন গতি পাবে।"
একসময় শুধু নামেই আন্তর্জাতিক ছিল ওসমানী বিমানবন্দর। এখন সেই বিমানবন্দর ধীরে ধীরে প্রকৃত আন্তর্জাতিক রূপ পেতে চলেছে। যদি ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ফ্লাই দুবাই, এয়ার আরাবিয়া ও সালাম এয়ারের মতো বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে, তাহলে ওসমানীর আকাশে ফিরবে আন্তর্জাতিক ব্যস্ততা।
এর মধ্য দিয়ে শুধু সিলেট নয়, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, পর্যটন, বিনিয়োগ ও প্রবাসীসেবায় সূচিত হতে পারে এক নতুন অধ্যায়ের।
১২৬ বার পড়া হয়েছে