সর্বশেষ

সারাদেশ

সুন্দরবনে ছোট সুমন বাহিনীর আত্মসমর্পনে দস্যুতার অবসান, নেপথ্যে 'অস্ত্রের রহস্য'

মাসুদ রানা, মোংলা
মাসুদ রানা, মোংলা

মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬ ২:১৪ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে আবারও বন ও জলদস্যুদের আত্মসমর্পণের আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় আট বছর তুলনামূলক শান্ত থাকার পর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সুযোগ নিয়ে সুন্দরবনে নতুন করে দস্যুবৃত্তির তৎপরতা দেখা দেয়। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন আবারও সক্রিয় হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় সুন্দরবনের আলোচিত ‘ছোট সুমন বাহিনী’ অন্ধকার জগত ছেড়ে আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। এই আত্মসমর্পণের খবরে উপকূলবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এলেও দস্যুদের কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদের উৎস এবং পূর্ববর্তী আত্মসমর্পণকারীদের পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সুন্দরবন থেকে জেলেরা নিরাপদে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে এবং অন্ধকার থেকে মুক্তি মিলবে। উল্লেখ্য, ছোট সুমন ২০১৮ সালেও সুন্দরবনের দস্যুতা ছেড়ে র‌্যাবের কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল।

বন বিভাগ, দস্যুদমন অভিযান সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এবং স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে তৎকালীন সরকারের উদ্যোগে সুন্দরবনের ৩২টি বাহিনীর ৩২৮ জন জলদস্যু বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করে, যার পর সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাময়িক স্থবিরতার সুযোগে সুন্দরবনে আবারও দস্যুবৃত্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

বর্তমানে সুন্দরবনের বিভিন্ন জোনে ৮ থেকে ৯টি নতুন ও পুনর্গঠিত দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব বাহিনীর নেতৃত্বে বা সক্রিয় সদস্যদের মধ্যে ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণ করা পুরোনো বন ও জলদস্যুদের একটি বড় অংশ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা সাধারণ ক্ষমা পেয়ে আত্মসমর্পণ করলেও গোপনে অপরাধের নেটওয়ার্ক বজায় রেখেছিল, যার ফলেই বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে সক্রিয় দস্যু বাহিনীগুলোর কাছে একে-৪৭, থ্রি নট থ্রি রাইফেল, একনলা বন্দুক, পিস্তল এবং দেশীয় তৈরি পাইপগানসহ বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়েছে। এসব অস্ত্র নিয়ে তারা সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

সাগর ও সুন্দরবনের খালে মাছ ও কাঁকড়া আহরণে যাওয়া জেলেদের অপহরণ এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। দস্যুরা মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করছে এবং দাবি পূরণ না হলে জেলে বহরে সশস্ত্র হামলা, লুটপাট ও অপহরণ চালানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জেলেদের গহীন বনে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও পাওয়া গেছে। এতে উপকূলীয় মৎস্যজীবী পরিবারগুলো চরম আতঙ্কে রয়েছে। অনেকেই জীবনের নিরাপত্তার কারণে সুন্দরবনে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন, যার প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়ছে।

এ অবস্থায় সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে কোস্ট গার্ড, র‌্যাব, পুলিশ ও বন বিভাগের সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী বিভিন্ন এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করছে। অভিযানে ইতিমধ্যে কয়েকজন দস্যু আটক এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।

এই অভিযানের চাপেই মূলত ‘ছোট সুমন বাহিনী’ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে। অস্তিত্ব রক্ষায় এবং আইনি জটিলতা এড়াতে তারা আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিচ্ছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তিনটি অস্ত্র এবং কয়েক রাউন্ড গোলাবারুদ প্রশাসনের কাছে জমা দিয়ে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করতে পারে।

তবে আত্মসমর্পণ ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহও রয়েছে। তাদের প্রশ্ন—সব অস্ত্র কি সত্যিই জমা দেওয়া হবে, নাকি কিছু অস্ত্র গোপনে রেখে দেওয়া হবে? অনেকের আশঙ্কা, নামমাত্র অস্ত্র জমা দিয়ে বাকি অস্ত্র গহীন বনে লুকিয়ে রাখা হতে পারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ছোট সুমনের প্ররোচনায় বহু তরুণ দস্যুবৃত্তিতে জড়িয়ে জীবন হারিয়েছে। অনেকে এখনো বিভিন্ন ডাকাতি ও অস্ত্র মামলায় কারাভোগ করছে। কিন্তু মূল নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা আত্মসমর্পণ করে পার পেয়ে গেলেও মাঠ পর্যায়ের সাধারণ সদস্যরা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখনও চরম দুর্ভোগে রয়েছে।

২০১৮ সালের সাধারণ ক্ষমার অপব্যবহারের অভিজ্ঞতা থেকে এবারও পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছেন উপকূলবাসী। তাদের মতে, আত্মসমর্পণের পর আবার নতুন করে বাহিনী গঠনের সুযোগ যেন না তৈরি হয়, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

সুন্দরবনের প্রান্তিক জেলে ও উপকূলীয় সচেতন মহলের দাবি, আত্মসমর্পণ যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা না হয়। প্রতিটি অস্ত্রের সঠিক হিসাব নিশ্চিত করা, দস্যুদের অর্থের উৎস ও নেপথ্যের সহযোগীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং আত্মসমর্পণকারীদের কঠোর নজরদারিতে রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে জেলেদের জানমালের স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের গোয়েন্দা শাখা জানায়, ছোট সুমনসহ তার পাঁচ সহযোগী অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করবে—এমন প্রস্তুতি চলছে। তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়নি। আইনগত প্রক্রিয়া শেষ করে সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

১২১ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন