সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশন: মানবসেবায় বদলে যাচ্ছে গোপালগঞ্জের জীবনমান
মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬ ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার জলিরপাড় ইউনিয়নের শান্তিপুর গ্রামের সোহেল মোল্লার ছেলে সাজ্জাদ মোল্লা (১২)। জন্ম থেকেই সে পা বাঁকা এবং মুখপ্রতিবন্ধী সমস্যায় ভুগছে। ছোট এই শিশুটি এখনো প্রতিনিয়ত কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করছে।
শিশু সাজ্জাদের মা শিউলী আক্তার জানান, ছেলের চিকিৎসার জন্য তারা ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশালসহ বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছেন, কিন্তু কোথাও সন্তোষজনক ফল পাওয়া যায়নি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, নিয়মিত ফিজিওথেরাপি ও স্পিচ থেরাপি দিলে সে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে। তবে শহরের ব্যয়বহুল চিকিৎসা তাদের পক্ষে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
এই অবস্থায় “সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশন” শিউলী আক্তারের জীবনে আশার আলো হয়ে আসে। মাত্র দুই মাস চিকিৎসা গ্রহণের পর সাজ্জাদ এখন অনেকটা স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছে এবং আগের চেয়ে স্পষ্টভাবে কথা বলতে শুরু করেছে। এখানে প্রতি ঘণ্টার ম্যাসেজের জন্য ১০০ টাকা নেওয়া হয়, যা তাদের মতো পরিবারের জন্য বড় সহায়তা।
একইভাবে, পাশের জেলা মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের কমলাপুর গ্রামের রুহিদাস বিশ্বাস (৫৫) স্ট্রোকজনিত প্যারালাইসিসে আক্রান্ত। তিনি জানান, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েও তেমন উন্নতি হয়নি। তবে এখানে দেড় মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি অনেকটাই উন্নতি অনুভব করছেন। এখানে সকাল–বিকাল দুই বেলা চিকিৎসা ও থাকা খাওয়ার জন্য প্রতিদিন মাত্র ৩০০ টাকা লাগে, যা তার সাধ্যের মধ্যে। দিনমজুর এই রোগী স্ত্রীকে নিয়ে সম্প্রীতির আবাসিক সেন্টারে অবস্থান করছেন এবং দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার আশা করছেন।
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার জলিরপাড় ইউনিয়নের বানিয়ারচর গ্রাম একসময় সাধারণ আর দশটি গ্রামের মতোই ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে এখানে পরিবর্তন এনেছে “সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশন”। আর্তমানবতার সেবায় নিরলস কাজের মাধ্যমে এটি মানবতার এক অনন্য গল্প সৃষ্টি করেছে।
কোনো প্রচার বা আড়ম্বর ছাড়াই একদল নিবেদিতপ্রাণ মানুষের নিঃস্বার্থ সেবার মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই ফাউন্ডেশন এখন স্থানীয়দের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয়, বরং স্ট্রোকজনিত প্যারালাইসিসে আক্রান্ত রোগী, শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশু ও অসহায় মানুষের জন্য নতুন জীবনের আশ্রয়স্থল।
গত সোমবার (১১ মে) সকালে মুকসুদপুর উপজেলার জলিরপাড় ইউনিয়নের বানিয়ারচর গ্রামে গিয়ে জানা যায়, সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশন ২০২৩ সালের জুন মাসে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে এটি শারীরিক প্রতিবন্ধী, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধী, ডাউন সিনড্রোম ও অটিজম আক্রান্ত শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে কাজ করছে। এখানে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০ জন রোগী চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেন।
এ কার্যক্রমে তিনজন চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপি সহকারী এবং ৩২ জন কর্মী নিরলসভাবে কাজ করে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
শুধু চিকিৎসাসেবাই নয়, এলাকার বেকার যুবকদের কর্মমুখী করতে কম্পিউটার প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষের সুবিধার কথা বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানটির সম্প্রসারণের জন্য সরকারি জায়গা বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সীমিত সামর্থ্য নিয়ে শুরু হওয়া এই ছোট উদ্যোগ আজ মানবসেবার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
সম্প্রতি সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশনের বানিয়ারচর কেন্দ্র পরিদর্শন করেন কোরিয়ার ‘ডু বিফোর’ সংস্থার বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রতিনিধি ডু ইল কিম ও ইয়ুন জং বেইক। তারা এই সেবামূলক কার্যক্রম দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এ সময় স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
ননীক্ষির গ্রামের কামাল শেখ (৫০) ও রিয়া মন্ডল (২৮) জানান, এই প্রতিষ্ঠানটির কারণে প্রতিবন্ধী ও স্ট্রোক আক্রান্ত রোগীরা এখন স্থানীয়ভাবেই চিকিৎসা পাচ্ছেন, যা আগে ছিল তাদের কাছে প্রায় অসম্ভব। গ্রামের মধ্যে এমন একটি প্রতিষ্ঠান থাকায় তারা শহরের সুবিধাও পাচ্ছেন, যা স্থানীয় রোগীদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।
বানিয়ারচর গ্রামের ৮০ বছর বয়সী অমল রায় বলেন, খেয়াঘাট সংলগ্ন একটি ছোট ভাড়া বাসায় শুরু হওয়া এই মানবিক উদ্যোগ এখন মানুষের আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছে। এখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা, ফিজিওথেরাপি, খাদ্য বিতরণ ও পুনর্বাসন সেবা দেওয়া হয়।
ফিজিওথেরাপি সহকারী অর্পিতা সরকার জানান, এখানে আসা অধিকাংশ রোগীই দরিদ্র। শহরের মতো সেবা স্থানীয়ভাবে পাওয়ায় তারা খুবই উপকৃত হচ্ছেন।
চিকিৎসক শুভ্রা শিকদার বলেন, তিনি ফিজিওথেরাপিতে ডিগ্রি নিয়ে নিজ এলাকার মানুষের সেবা দেওয়ার জন্য এখানে কাজ শুরু করেছেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীরা এখানে এসে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ফিরছেন, যা তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাভারঞ্জন শিকদার বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই তিনি মানবসেবায় নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। নিজ গ্রামে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পেরে তিনি গর্বিত। এটি দরিদ্র ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য বড় অবদান রাখছে। বর্তমানে এখানে ৫টি শয্যা থাকলেও সরকারি সহযোগিতা পেলে এটি ১৫ শয্যায় উন্নীত করা সম্ভব বলে তিনি জানান।
১৩২ বার পড়া হয়েছে