মানিকগঞ্জে সাড়ে তিন মাসে ১০ হত্যা ও ৫৯ মরদেহ উদ্ধার, জনমনে আতঙ্ক
বৃহস্পতিবার , ৭ মে, ২০২৬ ১০:০২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
মানিকগঞ্জ জেলার সাতটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গত সাড়ে তিন মাসে একের পর এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, হত্যাকাণ্ড, গণপিটুনি ও আত্মহত্যার ঘটনায় ১০টি হত্যাসহ মোট ৫৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জেলার জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পারিবারিক কলহ, জমি নিয়ে বিরোধ, মাদক, ব্যবসায়িক আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন কারণে সহিংস ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এর মধ্যে শুধু এপ্রিল মাসেই ৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
১৮ জানুয়ারি সিংগাইর উপজেলার জয়মন্টব এলাকায় গরু চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে দশানী গ্রামের তোতা মিয়ার ছেলে মজনু (২৭) এবং ছয়আনি গ্রামের বান্ধু মিয়ার ছেলে দীন ইসলাম (২২) নিহত হন।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার নতুন বসতি এলাকায় ২৭ মার্চ সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে ভাইদের হাতে বজলুর রহমান খান রাবিলকে ডেকে নিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়, পরে তিনি মারা যান।
এরপর ২৯ মার্চ সদর উপজেলার দিঘুলিয়া এলাকায় নদীপাড়ের ভুট্টাক্ষেত থেকে ইজিবাইকচালক রফিক মিয়ার (২৭) মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
৩ এপ্রিল শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নের আলোকদিয়া চরে বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে মিরাজ নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় আরও একজন গুরুতর আহত হন।
৭ এপ্রিল সদর উপজেলার বেতিলা-মিতরা ইউনিয়নের বার্থা এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় ৪০-৪৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তির রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
২৪ এপ্রিল সদর উপজেলার বনপারিল এলাকায় স্বর্ণের কানের দুলকে কেন্দ্র করে ৭ বছর বয়সী শিশু আতিকা আক্তারকে নাঈম নামের এক কিশোর হত্যা করে। এ ঘটনার পর উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে নাঈমের বাবা পান্নু মিয়া (৪৫) ও চাচা ফজলু মিয়া নিহত হন।
একই সময়ে পারিবারিক সালিশে শারীরিক ও মানসিকভাবে অপমানিত হয়ে ১৮ এপ্রিল নাজমা আক্তার (২৫) নামের এক গৃহবধূ আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
২৪ এপ্রিল সিংগাইর উপজেলায় পৈতৃক জমি নিয়ে সালিশ চলাকালে ছোট ভাই ওয়াহিদ খন্দকারের আক্রমণে বড় ভাই নজরুল খন্দকার (৬০) নিহত হন।
স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এসব ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সামাজিক অবক্ষয়ই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ও আত্মহত্যার প্রধান কারণ।
মানিকগঞ্জ জজ কোর্টের আইনজীবী বজলুর রশীদ বলেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রভাব বিস্তার এবং যোগ্য ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে না দেওয়া অস্থিতিশীলতার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি প্রশাসনের শৈথিল্যও পরিস্থিতি জটিল করছে।
সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদ হাসান বলেন, “শিক্ষা শুধু সার্টিফিকেটের জন্য হলে চলবে না। নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষার অভাবেই সমাজে বড় ধরনের অপরাধ বাড়ছে। শিক্ষার মূল চেতনা ধারণ করলে সামাজিক অনাচার অনেকাংশে কমে আসবে।”
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল হোসেন কচি বলেন, এসব ঘটনা রাজনৈতিক সহিংসতা নয়, বরং সামাজিক অবক্ষয়ের ফল। তার মতে, শুধু আইন প্রয়োগে সমাধান সম্ভব নয়, পরিবার ও সমাজের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
এদিকে মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম বলেন, অধিকাংশ ঘটনাই পারিবারিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের কারণে ঘটছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এসব অপরাধ রোধে শুধু পুলিশ নয়, সমাজের সব শ্রেণির মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
১২১ বার পড়া হয়েছে