সর্বশেষ

সাহিত্য

মহাকালের নদী ও একাকী নাবিক

রবীন্দ্র-কাব্যের বিবর্তন ও আধুনিকতার গহন পথরেখা

গাউসুর রহমান
গাউসুর রহমান

বৃহস্পতিবার , ৭ মে, ২০২৬ ১০:২৮ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
সময় এক প্রবহমান রহস্য। এই সময়ের বিশাল ক্যানভাসে মানুষ আসে, পদচিহ্ন রেখে যায়, আবার মহাকালের ধুলোয় মিশেও যায়। কিন্তু কিছু সত্তা থাকে যারা সময়ের বুক চিরে নতুন এক সময়ের জন্ম দেয়।

উনিশ শতকের শেষার্ধে যখন বাংলার আকাশ এক নবজাগরণের আলোয় উদ্ভাসিত, ঠিক তখনই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবির্ভাব। তবে তাঁকে কেবল সেই নির্দিষ্ট কালখণ্ডের ফ্রেমে আটকে রাখা এক ধরণের ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়। রবীন্দ্রনাথ কোনো স্থির জলরাশি নন, তিনি এক উত্তাল ও প্রবহমান নদী, যা প্রতিনিয়ত নিজের গতিপথ বদলেছে, গভীরতা মেপেছে আর শেষ পর্যন্ত গিয়ে মিশেছে আধুনিকতার এক অতল সমুদ্রে। তাঁর কাব্যযাত্রা কেবল শব্দের কারুকাজ ছিল না, তা ছিল এক আত্মার ক্রমাগত নির্মোক ত্যাগের কাহিনি—যেখানে রোমান্টিকতার মায়াবী কুয়াশা ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে অস্তিত্বের রূঢ় ও কঠিন সত্য।

অনেকেই প্রশ্ন করেন, রবীন্দ্রনাথ কি আধুনিক? নাকি তিনি সেই ফেলে আসা দিনের এক ঋষিপ্রতিম ছায়ামাত্র? সত্য বলতে, আধুনিকতার ধারণাটি তো কোনো নির্দিষ্ট তকমা নয়। এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি, একটি যন্ত্রণাবিদ্ধ চেতনার নাম। রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর কাব্য পরিক্রমা শুরু করেছিলেন, তখন তাঁর সামনে ছিল এক বিশাল ঐতিহ্য। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের চাদর মুড়ি দিয়ে তিনি ঘুমিয়ে থাকেননি। বিশ্বসাহিত্যের পরিমণ্ডলে যখন আধুনিকতার ঢেউ আছড়ে পড়ছে, রবীন্দ্রনাথ তখন নিজের অজান্তেই সেই ঢেউয়ের ভেতরে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। তবে তাঁর সেই আধুনিকতা কোনো বিজাতীয় অনুকরণ ছিল না; তা ছিল এক অত্যন্ত সচেতন ও অন্তর্মুখী বিবর্তন। ফরাসি দার্শনিক অঁরি বের্গসঁ যখন তাঁর ‘এলাঁ ভিতাল’ বা প্রবহমান প্রাণের তত্ত্ব দিচ্ছেন, তখন সুদূর বাংলার এক নিভৃত শান্তিনিকেতনে বসে কবিও অনুভব করছেন সেই গতির টান। জঁ-পল সার্ত্র কিংবা হাইডেগারের অস্তিত্ববাদের কথা আমরা পরে শুনেছি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের কবিতায় সেই যে নিঃসঙ্গ মানুষের হাহাকার আর সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর অকুতোভয় সাহস—তা কি কোনো অংশে সেই দার্শনিক গাম্ভীর্যের চেয়ে কম?

রবীন্দ্র-কাব্যের এই যে পালাবদল, তা বড় বিস্ময়কর। ‘কড়ি ও কোমল’ বা ‘মানসী’র সেই যে লাজুক, পেলব ও রোমান্টিক কবি—তিনিই আবার ‘পুনশ্চ’ বা ‘শেষ সপ্তক’-এর রুক্ষ, ঋজু ও আটপৌরে গদ্যের কারিগর। এই রূপান্তর তো কেবল আঙ্গিকের নয়, এ যেন এক মানুষের পুনর্জন্ম। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তিনি হয়তো উপলব্ধি করেছিলেন যে, প্রথাগত ছন্দের যে মিষ্টি ঝংকার, তা দিয়ে আধুনিক জীবনের জটিল মনস্তত্ত্বকে ধরা সম্ভব নয়। ১৯৩২ সালে যখন ‘পুনশ্চ’ প্রকাশিত হলো, তখন বাংলা কবিতার জমিনে এক বিশাল ভূমিকম্প ঘটে গেল। তিনি ভেঙে দিলেন ছন্দের নিগড়। টি. এস. এলিয়ট কিংবা এজরা পাউন্ড ইংরেজি কবিতায় যা করতে চেয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ নিজের মতো করে বাংলা কবিতায় সেই ‘মুক্ত ছন্দ’ বা গদ্যরীতির প্রবর্তন করলেন। একে কি কেবল একটি শৈল্পিক পরীক্ষা বলা যায়? হয়তো না। এটি ছিল কবিতার আত্মাকে মুক্তি দেওয়ার এক দার্শনিক চেষ্টা। তিনি দেখলেন, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছতা, ধুলোবালি আর আটপৌরে কথার ভেতরেও এক গভীর কাব্য লুকিয়ে আছে। আর সেই কাব্যকে প্রকাশ করতে গেলে অলঙ্কারের ভারী গয়নাগুলো খুলে রাখাই শ্রেয়। তাই তো তাঁর এই পর্বের কবিতায় আমরা দেখি এক বিরল বিনির্মাণ—যেখানে কবি নিজেই নিজের গড়া সুন্দর প্রতিমাকে বিসর্জন দিয়ে এক নতুন ও রূঢ় সত্যকে আবাহন করছেন।

রবীন্দ্রনাথের এই আধুনিক মনস্কতার মূলে ছিল এক দুর্নিবার গতির চেতনা। ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থের কথা ভাবলে আজও অবাক হতে হয়। সেখানে তিনি গতির যে দর্শন বুনেছেন, তা যেন স্থবিরতার বিরুদ্ধে এক মহাজাগতিক বিদ্রোহ। "হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোন্ খানে"—এই যে চঞ্চলতা, এই যে নিরন্তর এগিয়ে যাওয়ার আকুতি, এটাই তো আধুনিকতার প্রাণভোমরা। বের্গসঁ-র গতির দর্শন যেন তাঁর রক্তে মিশে গিয়েছিল। তিনি বুঝেছিলেন যে, স্থির থাকা মানেই মৃত্যু। জীবন মানেই বয়ে চলা, জরাজীর্ণতাকে পেছনে ফেলে নতুনের অভিমুখে যাত্রা। কিন্তু এই গতির আকাঙ্ক্ষা কেবল কোনো রোমান্টিক উচ্ছ্বাস ছিল না। সমকালীন বিশ্বরাজনীতি, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই বীভৎস তাণ্ডব রবীন্দ্রনাথকে এক গভীর বিষাদ ও সংশয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। ‘প্রান্তিক’ বা ‘নবজাতক’ কাব্যে সেই যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট। সভ্যতার ওপর থেকে তাঁর বিশ্বাস যখন টলমল করছিল, যখন তিনি দেখছিলেন যে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা আসলে এক ধ্বংসাত্মক মারণযজ্ঞের নামান্তর, তখন তাঁর কবিসত্তা এক বিশাল একাকীত্বের মধ্যে নিমজ্জিত হলো। পাশ্চাত্যের আধুনিকতাবাদীরা বিশ্বযুদ্ধের পরে যেমন এক ধরণের নিঃস্বতা বা ‘ওয়েস্টল্যান্ড’ (The Waste Land) দেখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথও তাঁর "সভ্যতার সংকট" প্রবন্ধে সেই একই হাহাকার প্রকাশ করেছিলেন। তবে তাঁর মহত্ত্ব এখানে যে, তিনি কেবল অন্ধকারের গল্প বলে থেমে যাননি, বরং সেই অন্ধকারের ওপারে এক আলোকবর্তিকার খোঁজ করে গেছেন আমৃত্যু।

রবীন্দ্রনাথের আধুনিকতা কেবল তাঁর আঙ্গিক বা দর্শনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা প্রোথিত ছিল এ দেশের মাটির গভীরেও। আমরা যদি একটু নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করি, তবে দেখব যে তাঁর শেষ জীবনের কবিতায় এক ধরণের সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রান্তিক মানুষের প্রতি গভীর মমতা ফুটে উঠেছে। একে যদি মার্কসীয় দৃষ্টিতে দেখা হয়, তবে দেখা যাবে তিনি তাঁর অভিজাত আভিজাত্যের খোলস ভেঙে বের হয়ে আসছেন। ‘ওরা কাজ করে’ কবিতার সেই শ্রমজীবী মানুষগুলোর কথা ভাবুন। বড় বড় সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে যায়, রাজাদের নাম মুছে যায় ইতিহাসের পাতা থেকে, কিন্তু যারা মেহনতি, যারা সভ্যতার চাকা সচল রাখে, তারাই টিকে থাকে। এই যে ঐতিহাসিক বস্তুবাদী সত্যকে পরম শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করা—এটিই তো আধুনিক রবীন্দ্রনাথ। আবার আধুনিক নাগরিক জীবনের যে নিঃসঙ্গতা এবং যান্ত্রিকতা, তাকে তিনি কী নিপুণভাবেই না মূর্ত করেছেন ‘বাঁশি’ কবিতায়। সেখানে ‘হরিপদ কেরানি’ কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি আধুনিক যন্ত্রসভ্যতায় পিষ্ট প্রতিটি মানুষের প্রতিনিধি। জীর্ণ মেসবাড়ি, ছাতার মতো ফুটো আকাশ আর ট্রামের একঘেয়ে আওয়াজ—এ যেন টি. এস. এলিয়টের ‘প্রুফ্রক’-এরই এক বাঙালি সংস্করণ। নাগরিক জীবনের এই যে পরাবাস্তব বা সুররিয়েলিস্টিক রূপ, তা রবীন্দ্র-কাব্যে এক অন্যমাত্রা যোগ করেছে। হরিপদ কেরানির সেই নিঃস্বতা আসলে আমাদের সবার আধুনিক অস্তিত্বের এক করুণ আরশি।

অনেকে বলেন রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানমনস্কতা নিয়ে। এটিও তাঁর আধুনিকতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি কেবল হূদয়ের কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন যুক্তিবাদী এক আধুনিক মানুষ। তাঁর ‘আকাশপ্রদীপ’ বা ‘নবজাতক’ কাব্যের পংক্তিতে পংক্তিতে জ্যোতির্বিজ্ঞান এর এক গভীর প্রভাব স্পষ্ট। সৃষ্টির রহস্যকে তিনি কেবল অলৌকিকতা দিয়ে দেখেননি। তিনি তাকে বিচার করেছেন বৈজ্ঞানিক কৌতূহল দিয়ে। ‘বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থে তিনি যে ব্রহ্মাণ্ডের কথা বলেছেন, তা কেবল তথ্যের সমাহার নয়, তা ছিল এক মহাজাগতিক জিজ্ঞাসা। তিনি অনুভব করেছিলেন যে আধুনিক মানুষকে যদি নিজের অস্তিত্ব বুঝতে হয়, তবে তাকে নক্ষত্রলোকের সেই অসীম বিস্তারের সাথে নিজেকে মেলাতে হবে। এই বিজ্ঞানচেতনা তাঁর কবিতাকে এক ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক নির্মোহতা দান করেছে, যা বাংলা সাহিত্যে বিরল।

আর জীবনের সেই চরম মুহূর্তগুলো? যখন মৃত্যু কড়া নাড়ছে দরজায়? রবীন্দ্রনাথ সেখানেও এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততার পরিচয় দিয়েছেন। হাইডেগারের সেই 'Being-towards-death' বা মৃত্যুর অভিমুখে মানুষের যাত্রা—এই দর্শনের এক জীবন্ত রূপ হলো ‘শেষ লেখা’ কাব্যগ্রন্থ। জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে তিনি জগতকে আর কোনো মায়াজাল হিসেবে দেখলেন না। মোহমুক্তির এক কঠিন ঘোষণা শোনা গেল তাঁর কণ্ঠে: "রূপনারাণের কূলে / জেগে উঠিলাম, / জানিলাম এ জগৎ / স্বপ্ন নয়।" এই যে মোহভঙ্গ, এই যে সত্যকে তার নগ্ন ও কঠিন রূপে স্বীকার করে নেওয়ার সাহস—এটাই তো প্রকৃত আধুনিকতা। তিনি লিখলেন, "কঠিনেরে ভালোবাসিলাম / সে কখনো করে না বঞ্চনা।" কী আশ্চর্য এই ঘোষণা! সারাজীবন যিনি সুন্দরের আরাধনা করলেন, জীবনের শেষলগ্নে এসে তিনি বলছেন যে কঠিনই সত্য। এই রূঢ় বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করার মধ্য দিয়েই রবীন্দ্রনাথ এক নিখাদ অস্তিত্ববাদী কবিরূপে আত্মপ্রকাশ করলেন। তাঁর মৃত্যুবোধে কোনো কান্না নেই, কোনো বিলাপ নেই; আছে এক নিরাসক্ত পর্যবেক্ষণ। যেন এক দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে ক্লান্ত পথিক ঘরের কোণে বসে নিজের ফেলে আসা পথটাকে একবার শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছেন।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এই বিবর্তন কি সমসাময়িক কবিরা মেনে নিয়েছিলেন? তিরিশের দশকের সেই তরুণ তুর্কিরা—বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ কিংবা অমিয় চক্রবর্তী—যাঁরা কল্লোল যুগের ধারক ছিলেন, তাঁরা রবীন্দ্র-প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তাঁদের কাছে আধুনিকতা মানেই ছিল এক ধরণের নেতিবাচকতা, যৌনতা আর বিষাদ। রবীন্দ্রনাথ তাঁদের এই নতুন পথের বিরোধী ছিলেন না, কিন্তু তিনি আধুনিকতার সংজ্ঞাটাকে একটু অন্যভাবে দেখতেন। তাঁর কাছে আধুনিকতা মানে কেবল ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণ বা বোদলেয়ারীয় অন্ধকার নয়। তাঁর মতে, আধুনিকতা হলো দৃষ্টির স্বচ্ছতা। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে জীবনের অন্ধকার বা কদর্যতাকে তুলে ধরাই শেষ কথা নয়, বরং সেই অন্ধকারের গভীর থেকে মানুষের চিরকালীন সংগ্রামের মহিমাকে উদ্ধার করাই প্রকৃত আধুনিকতা। এই যে এক ধরণের শুভবোধ বা সামঞ্জস্যের আদর্শ—এটিই ছিল রবীন্দ্রনাথের আধুনিকতার মূল ভিত্তি। তিনি যুগের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে নিজের শেকড়কে কখনও উপড়ে ফেলেননি।

একজন সত্যিকারের মহৎ শিল্পী যেমন হন, রবীন্দ্রনাথও ঠিক তেমনভাবেই ঐতিহ্যকে নবায়ন করেছিলেন। টি. এস. এলিয়ট তাঁর কালজয়ী প্রবন্ধে বলেছিলেন যে, ঐতিহ্যের প্রতি অন্ধ থাকা কোনো আধুনিকতা নয়, বরং ঐতিহ্যকে আত্মস্থ করে নিজের সমকালের সাথে তার এক সেতু নির্মাণ করাই হলো প্রকৃত প্রতিভা। রবীন্দ্রনাথ এই কাজটিই করেছেন তাঁর সারা জীবন ধরে। ‘গীতাঞ্জলি’র সেই মরমি আধ্যাত্মিকতা থেকে শুরু করে ‘শেষ লেখা’র সেই রূঢ় বাস্তববাদ—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা কেবল একজন কবির বিবর্তন নয়, এ যেন বাংলা সাহিত্যেরই এক হাজার বছরের বিবর্তন। তিনি নিজেকে প্রতিনিয়ত ভেঙেছেন, আবার গড়েছেন। তাঁর এই আত্ম-অতিক্রমণের স্পৃহা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের অবাক করে দেয়।

আজকের এই বিচ্ছিন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে যখন আমরা রবীন্দ্রনাথকে পড়ি, তখন মনে হয় তিনি যেন আমাদের মনের কথাগুলোই আগেভাগে লিখে দিয়ে গেছেন। তাঁর আধুনিকতা কোনো পুরোনো দিনের কঙ্কাল নয়, তা আজও সজীব ও স্পন্দমান। আধুনিক হওয়া মানে কেবল নতুন ধরণের পোশাক পরা বা আধুনিক আঙ্গিকে কথা বলা নয়; আধুনিক হওয়া মানে হলো এক নির্ভীক দার্শনিক প্রজ্ঞা অর্জন করা, যা দিয়ে সময়ের প্রতিটি সংকটকে চিনে নেওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের সেই নির্মোহ দৃষ্টি, সেই যুক্তি ও হৃদয়ের মেলবন্ধন আজও আমাদের পথ দেখায়। তিনি শিখিয়ে গেছেন যে জরাজীর্ণ প্রথাকে অস্বীকার করার সাহসই হলো মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।

 রবীন্দ্রনাথের কাব্য এক বিশাল ক্যানভাস, যেখানে মহাকালের রঙ দিয়ে জীবনের ছবি আঁকা হয়েছে। তিনি ছিলেন সেই একাকী নাবিক, যিনি উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে লড়াই করতে করতে দিগন্তের খোঁজে বেরিয়েছিলেন। তাঁর আধুনিকতা কোনো গন্তব্য নয়, তা এক চিরন্তন পথচলা। কাল থেকে কালান্তরে, বিবর্তন থেকে বিবর্তনের পথে তিনি আমাদের হাত ধরে নিয়ে চলেন এক গভীর অস্তিত্বের সন্ধানে। যেখানে দুঃখ আছে, মৃত্যু আছে, কিন্তু তার ওপরে আছে সত্যের এক চিরকালীন জ্যোতি। রবীন্দ্রনাথের আধুনিকতা আসলে তাঁর নিরন্তর আত্ম-আবিষ্কারের এক অমর গাথা, যা কালের সীমানা পেরিয়ে চিরকাল আধুনিক ও প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।

মহাকালের সেই নদী আজও বইছে। আমরা সেই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে কেবল কবির ফেলে আসা সুরটুকু শুনি না, বরং অনুভব করি সেই স্রোত আমাদের বর্তমানকেও ছুঁয়ে যাচ্ছে। এই যে সময়ের সাথে মানুষের লড়াই আর অস্তিত্বের গহন অন্বেষণ—এতেই রবীন্দ্রনাথ অমর। তিনি তো কেবল উনিশ শতকের নন, তিনি বিংশ শতকেরও নন, তিনি আসলে আমাদের আগামীরও এক অনিবার্য আশ্রয়। আধুনিকতার এই যে নিরন্তর বিবর্তন, তার শ্রেষ্ঠ রূপকার হিসেবে রবীন্দ্রনাথ আজও সেই ধ্রুবতারার মতোই উজ্জ্বল, যে তারাটি অন্ধকার রাতে পথ হারানো নাবিককে দেয় গন্তব্যের দিশা। তাই তাঁর কাব্য কেবল পড়ার জন্য নয়, তা হলো অনুভব করার জন্য—একাকী গোধূলিতে বা ঝোড়ো রাতের সেই অদ্ভুত নিঃসঙ্গতায়, যেখানে মানুষ কেবল নিজের মুখোমুখি দাঁড়ায়। সেখানেই রবীন্দ্রনাথ কথা বলেন আমাদের সাথে, কানে কানে বলে যান সেই সত্যের কথা—যা চিরপুরাতন হয়েও চিরকাল আধুনিক।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।

১২০ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন