সর্বশেষ

সারাদেশ

চর কালীবাড়ি ময়লাকান্দায় ৩০ বছরের বর্জ্য, বিপর্যস্ত ময়মনসিংহ

আওলাদ রুবেল, ময়মনসিংহ 
আওলাদ রুবেল, ময়মনসিংহ 

রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:২৫ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ময়মনসিংহ শহরের প্রায় ৩০০টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিষাক্ত ও বিপজ্জনক মেডিকেল বর্জ্যসহ ৩৩টি ওয়ার্ডের সব ধরনের আবর্জনা গত প্রায় ৩০ বছর ধরে শহরের চর কালীবাড়ি ময়লাকান্দা এলাকায় ফেলা হচ্ছে।

এতে একদিকে যেমন তীব্র দুর্গন্ধে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে ছড়িয়ে পড়ছে রোগব্যাধি ও মশা-মাছির উপদ্রব। দীর্ঘদিনেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিষ্কাশন সমস্যার কার্যকর সমাধান না হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।

শেরপুর, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশের প্রধান মহাসড়কের পাশেই এই বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকার কারণে এলাকাটি এখন “ময়লাকান্দা” নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে।

সিটি কর্পোরেশনের ৩৩টি ওয়ার্ডের সব ময়লা আবর্জনার পাশাপাশি প্রায় ৩০০টি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিকেল বর্জ্যও এখানে ফেলা হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে দুর্গন্ধ কিছুটা কম থাকলেও বর্ষাকালে এর মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়, ফলে আশপাশের এলাকায় ব্যাপকভাবে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে পরিবেশ দূষণ, মশা-মাছির উপদ্রব এবং বিভিন্ন রোগব্যাধি বাড়ছে। দুর্গন্ধের কারণে দ্রুতগতিতে যান চলাচলের ফলে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মনির জানান, “এই ময়লার দুর্গন্ধে ঘরে থাকা যায় না। না খাওয়ার শান্তি, না ঘুমের শান্তি। সবসময় দুর্গন্ধে পরিবেশ ভারী হয়ে থাকে। টাকা থাকলে অন্য জায়গায় চলে যেতাম, কিন্তু বাধ্য হয়েই এখানে থাকতে হচ্ছে।”

সোহরাব হোসেন বলেন, “এখানে প্রতিটি ঘরেই শিশু ও বয়স্ক রোগী রয়েছে। এই দুর্গন্ধে সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ছে, বিশেষ করে শ্বাসকষ্টের রোগী বেশি। এভাবে চলতে থাকলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা নিয়ে বড় হতে হবে।”

স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল মিয়া জানান, এই এলাকার মানুষের সঙ্গে কেউ আত্মীয়তার সম্পর্ক করতে চায় না। “ছেলে বা মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়। দূর-দূরান্ত থেকেও আত্মীয়রা এখানে আসতে চায় না। ফলে সামাজিক সম্পর্ক খুবই দুর্বল হয়ে গেছে,” তিনি বলেন।

বয়স্ক বাসিন্দা মোতালেব হোসেন জানান, খাবারের সময় মাছি খাবারে বসে এবং ঘরে সবসময় মশা-মাছির উপদ্রব থাকে। “সন্ধ্যার পর ঘরে বা বাইরে কোথাও থাকা যায় না। বর্ষায় দুর্গন্ধ আরও বেড়ে যায়, তখন এখানে টিকে থাকা খুবই কঠিন,” তিনি বলেন।

স্থানীয় পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সুমাইয়া বিনতে সামাদ জানায়, প্রতিদিন এই বর্জ্য এলাকা পেরিয়ে স্কুলে যেতে হয়। “দুর্গন্ধে বমি আসে, মাথা ব্যথা করে। পড়ায় মন বসে না। বাসায় ফিরেও একই অবস্থা হয়,” সে বলে।

বাস চালক রমজান ইসলাম জানান, এই মহাসড়ক দিয়ে নেত্রকোনা, শেরপুর ও কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন রুটে হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। দুর্গন্ধের কারণে অনেক চালক নাক চেপে গাড়ি চালান, আবার কেউ দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন বা ঘটান।

প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের সভাপতি অধ্যক্ষ লে. কর্নেল (অব.) ড. মো. শাহাব উদ্দীন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সিটি কর্পোরেশন এখানে বর্জ্য ফেললেও নাগরিক সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেই। “বিশ্বের অনেক দেশই বর্জ্যকে রিসাইক্লিং করে সম্পদে রূপান্তর করছে, অথচ আমরা তা পুড়িয়ে পরিবেশ দূষিত করছি। এতে মিথেনসহ বিভিন্ন গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে মানবদেহে মারাত্মক ক্ষতি করছে,” তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের আহ্বান জানান।

ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক রোকনুজ্জামান রোকন জানান, কাঁচা বর্জ্য পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। “শহরের বর্জ্য সেখানে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে ব্লিচিং পাউডার ছিটানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে বর্জ্যকে কেমিক্যাল প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করা হবে। চারপাশে সবুজ বনায়নও করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হবে,” তিনি বলেন।

প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ গ্রহণের প্রত্যাশা জানিয়েছেন ময়মনসিংহবাসী।

১২২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন