সর্বশেষ

মতামত

 শুধু ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ নয়, সমগ্র ব্যাংকিং খাত রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে জনআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা আবশ্যক 

ড. শাহজাহান খান OAM
ড. শাহজাহান খান OAM

শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬ ৩:২৫ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
রাষ্ট্রের আইন ও বিধি-বিধানের আওতায় যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক ও সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব, যাতে জনগণের আস্থা অটুট থাকে। কোনো ব্যাংকের মালিকানা, পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ বা অনিয়মের প্রমাণ থাকলে, তা দেশের প্রচলিত আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। অতীতে সরকারি সংস্থা ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ পরিস্থিতিকে খুবই জটিল করে তুলেছিল। এর ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, যা অর্থনৈতিক অবনতির মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ড. শাহজাহান খান

আমি ইসলামী ব্যাংকের একজন অন্যতম প্রাচীন হিসাবধারী ও শেয়ারহোল্ডার। বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কার্যক্রম আমি এই ব্যাংকের মাধ্যমেই সম্পন্ন করেছি। এটি ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যাংক। অন্য ব্যাংকের হিসাব বন্ধ করে আমি ইসলামী ব্যাংককেই একমাত্র ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করেছি। 

আজ পারিবারিক প্রয়োজনে অর্থ উত্তোলনের জন্য আমি টাকা স্থানান্তর করতে চাইলে আমাকে জানানো হয় যে, উত্তোলন সীমাবদ্ধতার কারণে ৫০ হাজার টাকার বেশি স্থানান্তর করা যাবে না। জীবনে এই প্রথম আমি নিজের অর্থ ব্যবহারে এমন সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হলাম। আমার নিজের অর্থের ওপর আমারই প্রবেশাধিকার নেই। কে আমাকে আমার অর্থ উত্তোলন করতে বাধা দিচ্ছে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমি একটি সৎ ও স্পষ্ট উত্তর চাই।

আমি জানতে চাই—আমার অপরাধ কী? আমি কী অন্যায় করেছি? কী এমন দোষ করেছি যার কারণে আমার কঠোর পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থের প্রয়োজনে আমি সেটি ব্যবহার করতে পারছি না? একটি স্বাধীন দেশের আইন মেনে চলা নাগরিক এবং সর্বোচ্চ করসীমায় কর প্রদানকারী হিসেবে কেন একটি নির্বাচিত সরকার আমার নিজের অর্থ ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে না? শুধু আমি নই, ব্যাংকের লক্ষ লক্ষ গ্রাহক—নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলিম, তরুণ-বৃদ্ধ—কয়েকজন বিতর্কিত নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির কারণে চরম দুর্ভোগের শিকার। কয়েকজন ব্যক্তির ভুল নিয়োগ এবং প্রমাণিত অপরাধীদের সমর্থন করার জন্য কেন সরকার এত বিপুল সংখ্যক নাগরিকের স্বার্থ বিসর্জন দেবে?

আবারও কিছু ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ওপর তাদের প্রভাব বিস্তার করে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের চেষ্টা করছে। মনে হচ্ছে, যেকোনো মূল্যে দেশের সবচেয়ে সফল ব্যাংকটির দখল নিতে তারা বদ্ধপরিকর, এমনকি এর পরিণতিতে যদি ব্যাংকটি আবারও এস আলমের মতো কুখ্যাত আর্থিক কারসাজিকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের মুকুটের রত্ন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের পথিকৃৎ, কোটি কোটি আমানতকারীর আস্থার প্রতীক এবং বিপুল বৈদেশিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণকারী একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান ছিল। এটি ছিল আর্থিক শৃঙ্খলার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

কিন্তু ২০১৭ সালে সবকিছু বদলে যায়। তৎকালীন সরকারের সমর্থনে  এবং রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্রিয় সহযোগিতায় ব্যাংকটি জোরপূর্বক দখল করা হয়। প্রতিষ্ঠাতা ও প্রকৃত শেয়ারহোল্ডারদের—যাদের মধ্যে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং দেশীয় কল্যাণমূলক ট্রাস্টও ছিল—পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে দিয়ে এস আলম গ্রুপের হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হয়।

এরপর যা ঘটেছে তা ছিল রাষ্ট্র-সমর্থিত আর্থিক লুটপাটের এক ক্লাসিক উদাহরণ। অনিয়মিত অভ্যন্তরীণ ঋণ, ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ প্রদান এবং বিপুল পরিমাণ মূলধন বিদেশে পাচারের মাধ্যমে ব্যাংকের সম্পদ খালি করে ফেলা হয়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে এমন একজন বিতর্কিত ও কথিত দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যিনি ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিবাদী সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ ধরনের নিয়োগ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এটি ব্যাংকের সুনাম ও আমানতকারী এবং বিশ্বস্ত শেয়ারহোল্ডারদের আস্থাকে ধ্বংস করার অন্যতম কারণ। তাঁর স্ত্রীর অতীত ইতিহাসও একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। প্রয়োজনে সরকার আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সৎ, দক্ষ ও সুপ্রতিষ্ঠিত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কাউকে এই পদে নিয়োগ দিতে পারত।

ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে চলমান অস্থিরতা আবারও দেশের আর্থিক খাতকে উদ্বেগজনক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের সচিবালয় অভিমুখে পদযাত্রা, মাত্র এক সপ্তাহে পাঁচ হাজার কোটি টাকার আমানত হ্রাস এবং নগদ সংরক্ষণ অনুপাতের আশঙ্কাজনক পতন দেশের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি। এই সংকট কোনো স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতির ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের সুশাসন সংকটের প্রত্যক্ষ ফলাফল, যার একমাত্র কার্যকর সমাধান হলো ব্যাংকটিকে তার বৈধ প্রতিষ্ঠাতা ও মূল শেয়ারহোল্ডারদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।

শেখ হাসিনার সরকারের আমলে এস আলম রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করে ভুয়া ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে ইসলামী ব্যাংক দখল করে। সরকারি সহযোগিতায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার সেই লুট হওয়া অর্থ অনুসন্ধান ও দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিল। এমন পরিস্থিতিতে একটি নির্বাচিত সরকার যদি জেনেশুনে ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিবাদী সরকারের আত্মবিনাশী পথ অনুসরণ করে, তবে তা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়।

একসময় এই ব্যাংকই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ, ৩০ শতাংশেরও বেশি, প্রবাসী আয় দেশে নিয়ে আসত। এটি বিশ্বের শীর্ষ এক হাজার ব্যাংকের তালিকায় স্থান পেয়েছিল। তারল্য সংকটে থাকা অন্যান্য ব্যাংককে সহায়তা করেছে। বাংলাদেশে এবং দেশের বাইরেও বহু ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেছে এবং লক্ষাধিক মানুষকে সুদমুক্ত ঋণ প্রদান করেছে। ক্রিকেটসহ বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে।

১৯৮৩ সালে যখন ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন অধিকাংশ মানুষ ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদেরও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের কার্যপদ্ধতি বা এর পণ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ছিল না। বিনিয়োগকারীরাও জানতেন না এটি সফল হবে কি না। তবুও ইসলামী মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ মানুষ, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে, সুদ এড়ানোর উদ্দেশ্যে ঝুঁকি জেনেই এই ব্যাংকে বিনিয়োগ করেছিলেন। তাঁদের অনুপ্রেরণা ছিল ইসলামের শিক্ষা। তাঁরা নিশ্চিত করেছিলেন যে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা ইসলামী আর্থিক নীতিমালা অনুসরণ করবে এবং ব্যাংক পরিচালনাকারীদের ইসলামী আদর্শ ও চরিত্র দৃঢ় হবে। ইসলামী ব্যাংকের এই মৌলিক আদর্শই ব্যাঙ্কেটির মুল চালিকা শক্তি। ইসলামী ব্যাংকের সাফল্যের মূল কারণ ছিল এর নেতৃত্ব, ব্যবস্থাপনা, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গ্রাহকদের ইসলামী চরিত্র ও মূল্যবোধ।

মূলত ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকট আইনের শাসন এবং সম্পত্তির অধিকারের প্রশ্ন। যখন কোনো রাষ্ট্র একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জোরপূর্বক শত্রুতাপূর্ণ দখলকে অনুমোদন দেয়, তখন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে এই বার্তা যায় যে, কোনো সম্পদই নিরাপদ নয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি ছিল দেশের অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার বড় ধাক্কা, কারণ তাদের বৈধ অংশীদারিত্বকে জোরপূর্বক খর্ব করা হয়েছে এবং রাষ্ট্র-সমর্থিত গোষ্ঠীর হাতে নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হয়েছে।

সংসদীয় বিতর্কেও পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছিল যে, ব্যাংক পরিচালনা করতে হবে অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের মাধ্যমে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও বিতর্কিত নিয়োগ থেকে মুক্ত রেখে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিরোধের অজুহাতে মূল শেয়ারহোল্ডারদের ফিরে আসা ঠেকানো একটি ভ্রান্ত যুক্তি। ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা কাঠামো ছিল দেশীয় উদ্যোক্তা, মধ্যপ্রাচ্যের উন্নয়ন তহবিল এবং প্রাতিষ্ঠানিক ট্রাস্টের সমন্বয়ে গঠিত একটি বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব। তাঁদের বৈধ অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ব্যাংককে রাজনৈতিককরণ নয়; বরং আইনের শাসন, বৈধ মালিকানা এবং তাদের নৈতিক ও আইনগত অধিকার পুনরুদ্ধার করা।

যদি ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকে, তবে সরকারকে অবশ্যই প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দেশের প্রচলিত আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক:  ইমেরিটাস অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া;
 সাবেক উপাচার্য, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা।

১৩৬ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন