গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবন: নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তারেক রহমান
শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৪:১৭ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বৃহস্পতিবার শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। উচ্চ ভোটার উপস্থিতি, নারী ও তরুণদের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং প্রধান দলগুলোর ফলাফল মেনে নেওয়ার ঘোষণা—সব মিলিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি ২১০টিতে জয় পেয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৭টি আসন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি, গণঅধিকার পরিষদ ১টি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি আসনে জয়লাভ করেছে। এছাড়া ১৪টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।
অন্যদিকে সরকারি সংস্থাগুলোর প্রাথমিক হিসাব বলছে, বিএনপি ২০২, জামায়াত ৬৪, এনসিপি ৫, গণঅধিকার ২, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১ এবং ১২টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন।
ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলনে জানান, তাদের দল দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনে আত্মবিশ্বাসী। ৩০০ আসনের সংসদে এককভাবে সরকার গঠন করতে প্রয়োজন ১৫১টি আসন। দুই শতাধিক আসন পেলে সংসদে সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়াও সম্ভব।
এবারের নির্বাচনের সঙ্গে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন’ বিষয়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। প্রস্তাবটি পাস হলে এক কক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিকে এবার প্রথমবারের মতো নির্বাচনী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনিও প্রথমবারের মতো প্রার্থী হয়ে জয়ী হয়েছেন। নির্বাচনের এক মাস আগে মায়ের মৃত্যুর পর তিনি দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং তার নেতৃত্বেই প্রচার ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগেই জানিয়েছেন, সরকার গঠনের সুযোগ পেলে তারেক রহমানই হবেন প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের ফলাফল ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, ভোটার মনস্তত্ত্বের পরিবর্তন এবং সংগঠনগত সক্ষমতার সমন্বিত প্রতিফলন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কার্যত একমুখী ছিল। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সীমিত প্রতিযোগিতায় বিরোধী ভোট অনেকাংশে একত্রিত হয়েছে, যার বড় সুবিধা পেয়েছে বিএনপি। অন্যদিকে জামায়াতও ইতিহাসের সর্বোচ্চ ভোট ও আসন পেতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তরুণ ভোটারদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। রাজনৈতিক ঐতিহ্যের চেয়ে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও নীতিগত প্রতিশ্রুতিকে তারা বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। মোট ভোটারের ৪৯ শতাংশ নারী; তাদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
সংখ্যালঘু ভোটাররাও কৌশলগত অবস্থান নিয়েছেন বলে জানা গেছে। সম্ভাব্য জয়ী বা স্থানীয়ভাবে নিরাপদ প্রার্থী বেছে নেওয়ার প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, সংসদ ও গণভোট মিলিয়ে ৬১ শতাংশের বেশি ভোটার ভোট দিয়েছেন। চূড়ান্ত হিসাবের পর এ হার আরও বাড়তে পারে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়া এবং সহিংসতার আশঙ্কা ছিল।
বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, কেন্দ্র দখলের চেষ্টা ও জাল ভোটের অভিযোগ কিছু স্থানে উঠলেও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো ফলাফল মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এবারের নির্বাচনে সংঘাত-সহিংসতায় কারও প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমান অল্প ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এগিয়ে রয়েছেন তার আসনে। ঢাকা-১৫ আসনে এগিয়ে রয়েছেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। খুলনা-৫ আসনে প্রাথমিক ফলাফলে পিছিয়ে আছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। ঢাকা-১১ আসনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও বিএনপির প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছিল। রংপুর-৪ আসনে সদস্য সচিব আখতার হোসেন এগিয়ে রয়েছেন।
দেশের ইতিহাসে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৫৫ শতাংশ। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে যথাক্রমে ৭৫ ও ৭৬ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে ৮৭ শতাংশ ভোটার অংশ নেন। পরবর্তী তিনটি নির্বাচনের ভোটার উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক ছিল। সহিংসতার দিক থেকেও এবারের নির্বাচন ব্যতিক্রমী; পূর্ববর্তী বিভিন্ন নির্বাচনে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও এবার এমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন আয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানায়। দেড় বছরের প্রস্তুতির পর বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হয় বহুল প্রত্যাশিত সংসদ নির্বাচন। একই সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়—সাদা ব্যালটে সংসদ নির্বাচন এবং গোলাপি ব্যালটে গণভোটে অংশ নেন ভোটাররা।
৪৪৭ বার পড়া হয়েছে