প্রথমবার মানুষের শরীরে এআই-নকশা করা ভাইরাস প্রয়োগ
শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ৬:৩৯ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের চিকিৎসায় প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে নকশা করা ভাইরাস পরীক্ষামূলকভাবে মানুষের শরীরে প্রয়োগ করেছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রের এক রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ভাইরাসটি তৈরি করেছে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক এআই প্রতিষ্ঠান র্যাডিক্যাল নিউমেরিকস। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চিকিৎসার উদ্দেশ্যে এআই-নকশা করা ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রয়োগের ঘটনা এটিই প্রথম।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুরুতর ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত এক মার্কিন রোগীর শরীরে পরীক্ষামূলকভাবে এই চিকিৎসা প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে ব্যবহার করা হয়েছে র্যাডিক্যাল নিউমেরিকসের নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল ‘ওমনি-১’ দিয়ে নকশা করা ভাইরাস।
ওমনি-১ মূলত ব্যাকটেরিওফাজ বা ফাজ নামের একধরনের ভাইরাস তৈরি করে। এই ভাইরাস মানুষের কোষে আক্রমণ না করে নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে ধ্বংস করতে পারে। প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর না হলে গুরুতর সংক্রমণের চিকিৎসায় বিকল্প হিসেবে ফাজ থেরাপি ব্যবহারের পদ্ধতি আগে থেকেই রয়েছে।
সাধারণত প্রচলিত ফাজ থেরাপিতে সংক্রমণ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে পারে—এমন প্রাকৃতিক ভাইরাস খুঁজে বের করতে হয়। তবে র্যাডিক্যাল নিউমেরিকসের এআই মডেল এ ক্ষেত্রে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। নতুন ভাইরাস অনুসন্ধানের পরিবর্তে বিদ্যমান ভাইরাসের নির্দিষ্ট অংশ পুনর্নকশা করেছে মডেলটি। এর উদ্দেশ্য, সংক্রমণের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়ার নির্দিষ্ট প্রজাতিকে আরও নির্ভুলভাবে শনাক্ত ও আক্রমণ করতে সক্ষম ভাইরাস তৈরি করা।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এআইনির্ভর এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে রোগীর সংক্রমণের ধরন বিশ্লেষণ করে কয়েক দিনের মধ্যেই চিকিৎসার উপযোগী ভাইরাস তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। এতে জটিল ও অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের চিকিৎসায় বিকল্প খুঁজে পেতে সময় কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রচলিত চিকিৎসায় সাড়া না পাওয়া বিশেষ পরিস্থিতির রোগীদের পরীক্ষামূলক চিকিৎসা দেওয়ার একটি কর্মসূচির আওতায় এই ভাইরাস প্রয়োগ করা হয়েছে। চিকিৎসার আগে রোগীর শরীর থেকে সংগ্রহ করা ব্যাকটেরিয়ার নমুনায় এআই-নকশা করা ভাইরাস পরীক্ষা করা হয়। র্যাডিক্যাল নিউমেরিকসের ভাষ্য, পরীক্ষাগারে ভাইরাসের মিশ্রণটি ওই নমুনায় থাকা অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছিল।
তবে রোগীর সুনির্দিষ্ট রোগনির্ণয়, চিকিৎসার পর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন কিংবা সংক্রমণ পুরোপুরি নির্মূল হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া চিকিৎসার ফলাফল এখনো কোনো বিশেষজ্ঞ-পর্যালোচিত গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়নি।
এআই দিয়ে ভাইরাস তৈরিতে নতুন সম্ভাবনা ও উদ্বেগ
জীববিজ্ঞানের গবেষণায় এআইয়ের ব্যবহার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আর্ক ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা জানান, এআই ব্যবহার করে তাঁরা এমন কিছু ভাইরাস নকশা করেছেন, যেগুলো আগে কখনো দেখা যায়নি এবং পরীক্ষাগারে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম।
ওই গবেষণায় এআই দিয়ে নকশা করা প্রায় ৩০০টি ভাইরাল জিনোম তৈরি ও পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১৬টি কার্যকর ভাইরাস পাওয়া যায়। তবে গবেষণাটি মানুষের শরীরে নয়, ব্যাকটেরিয়ার ওপর পরিচালিত হয়েছিল।
গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, নতুন ভাইরাস নকশার সক্ষমতাসম্পন্ন এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার জীববৈজ্ঞানিক নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম ভাইরাস তৈরিতে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের আশঙ্কা উদ্বেগজনক। স্ট্যানফোর্ডের গবেষকেরা তাঁদের পরীক্ষায় মানুষ বা প্রাণীকে আক্রমণকারী ভাইরাসের পরিবর্তে ব্যাকটেরিয়াকে লক্ষ্য করে এমন ভাইরাস তৈরিতে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
এআইনির্ভর জীববৈজ্ঞানিক গবেষণার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিটির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।
১২৬ বার পড়া হয়েছে