সর্বশেষ

আন্তর্জাতিক

চীনের মেগা বাঁধের পাল্টা প্রকল্প ভারতে, অরুণাচলে তীব্র বিক্ষোভ

ডেস্ক রিপোর্ট
ডেস্ক রিপোর্ট

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ৮:৫৯ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ব্রহ্মপুত্র নদের উজানে চীনের বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত এ প্রকল্প ঘিরে আদিবাসী আদি সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজেদের ভূমি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জীবিকা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের বিরোধিতায় বিক্ষোভ ও সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে।

চীনের সঙ্গে জলসম্পদ ও নিরাপত্তা নিয়ে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট (এসইউএমপি) নামের এই প্রকল্পের সম্ভাব্য উৎপাদনক্ষমতা ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। তবে প্রকল্পটি ঘিরে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে। তাঁদের আশঙ্কা, বিশাল জলাধার নির্মিত হলে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জীবিকা হারাতে পারেন তাঁরা।

তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নামে পরিচিত সিয়াং নদী অরুণাচল প্রদেশ হয়ে আসামে প্রবেশ করেছে। পরে অন্যান্য নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নামে বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে নদীটির উজানে বড় বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা শুধু ভারত নয়, ভাটির অন্যান্য অঞ্চলের পানিপ্রবাহ ও নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তিব্বতের মেডোগ কাউন্টিতে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের কাজ শুরু করে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য উৎপাদনক্ষমতা ৬০ হাজার মেগাওয়াট এবং ব্যয় প্রায় ১২ লাখ কোটি ইউয়ান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের আশঙ্কা, উজানে চীনের এই প্রকল্প বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানির নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে সিয়াং নদে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঘনমিটার ধারণক্ষমতার জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে ভারত। চীনের প্রকল্পে প্রস্তাবিত ৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ঘনমিটার কার্যকর জলধারণক্ষমতার বিপরীতে এই প্রকল্পকে কৌশলগত ভারসাম্য তৈরির উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ ও বিক্ষোভ

অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু প্রকল্পটি নিয়ে ছড়িয়ে পড়া উদ্বেগের বিষয়ে বলেছেন, জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট ঘিরে ভুল তথ্য ও ভুল ধারণা আমাদের লোকজনের মনে আতঙ্ক তৈরি করছে।’

এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ইংকিয়ং পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় বিক্ষোভকারীরা মুখ্যমন্ত্রীর গাড়িবহর আটকে দেন। প্রকল্পের বিরোধিতায় স্থানীয়দের ক্ষোভের বিষয়টি এতে আরও সামনে আসে।

আদি সম্প্রদায়ের শীর্ষ সংগঠন আদি বানে কেবাং প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিল এবং প্রি-ফিজিবিলিটি রিপোর্ট (পিএফআর) প্রত্যাখ্যানের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে, সিয়াং ইন্ডিজিনাস ফারমার্স ফোরাম ও অল আদি ইউথ অ্যাসোসিয়েশন ঐতিহ্যবাহী কেবাং ব্যবস্থার মাধ্যমে আলোচনা এবং দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে।

বিক্ষোভ ও সহিংসতার পর ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অরুণাচল প্রদেশে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর (সিআরপিএফ) দুই কোম্পানি র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (র‌্যাফ) পাঠিয়েছে।

তরুণদের ক্ষোভ বাড়ছে

পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিক তোঙ্গাম রিনা বলেন, সিয়াং নদে প্রকল্প নির্মাণের বিরোধিতা প্রায় চার দশক ধরে চলে আসছে। তবে সাম্প্রতিক প্রকল্পকে ঘিরে বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে, বিশেষ করে গত তিন বছরে আন্দোলন জোরালো হয়েছে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের ঘটনায় তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জি আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে।

তোঙ্গাম রিনা আরও বলেন, স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, নদী সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞান সরকারের চেয়ে বেশি। আন্দোলনকারীদের দেশবিরোধী হিসেবে আখ্যা দেওয়ার কারণেও ক্ষোভ বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আন্দোলনকারীদের মনোভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের বিক্ষোভকারীরা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। স্থানীয়দের একাংশের আশঙ্কা, চীন যদি পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ‘ওয়াটার বোম্ব’ পরিস্থিতি তৈরি করে, তবে সিয়াং নদে বাঁধ নির্মাণ করলেই সেই ঝুঁকি ঠেকানো সম্ভব হবে না।

ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ

প্রকল্প ঘিরে আলোচনায় ভূমিকম্পের ঝুঁকিও গুরুত্ব পাচ্ছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে চেংদু ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির প্রকাশিত এক সমীক্ষায় মেডোগ এলাকায় সক্রিয় পাইঝেন ফল্টের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে তীব্র ভূকম্পনের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়। কৌশলগত বিশ্লেষক ব্রহ্মা চেলানিও নেপালে ভয়াবহ বন্যার পর এ ধরনের ঝুঁকির বিষয়টি আবার সামনে এনেছেন।

এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে মানোহর পারিকর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের একটি গবেষণাপত্রে সিয়াংয়ের মতো বৃহৎ বাঁধকে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি জল-কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

সব মিলিয়ে, সিয়াং প্রকল্প ভারতের জন্য চীনের জলবিদ্যুৎ পরিকল্পনার মোকাবিলায় কৌশলগত উদ্যোগ হলেও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার, পরিবেশগত ঝুঁকি ও ভূমিকম্পের আশঙ্কা এর বাস্তবায়নকে জটিল করে তুলেছে।

১৫১ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
আন্তর্জাতিক নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০