নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা
মোংলায় নিয়ম অমান্য করে ব্যক্তিগত কোম্পানির স্পিডবোট পার্কিংয়ের অভিযোগ
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ৮:৪৩ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মোংলায় বন্দর কর্তৃপক্ষের সংরক্ষিত পানির জেটি অনুমোদন ছাড়া ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ফাস্ট মেরিন সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে। নিজস্ব জেটি বা বোট রাখার বৈধ অবকাঠামো না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বন্দরের পানির জেটি ও এর সঙ্গে নোঙর করা জাহাজে স্পিডবোট বেঁধে রাখছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বন্দরের সংরক্ষিত এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মোংলায় সরকারি স্থাপনা ব্যবহারের নিয়মনীতি উপেক্ষা করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্পিডবোট রাখার অভিযোগ উঠেছে। বৈদেশিক বাণিজ্যিক জাহাজে যাতায়াতকারী ব্যবসায়ী, জাহাজের এজেন্ট ও সার্ভেয়ারদের যাতায়াতের সুবিধা দেওয়ার আড়ালে ফাস্ট মেরিন সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড বন্দর কর্তৃপক্ষের সংরক্ষিত পানির জেটি ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ ঘটনায় বন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং কর্তৃপক্ষের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মোংলা বন্দরের বহির্নোঙর ও পশুর নদীতে চলাচলকারী বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের এজেন্ট, সার্ভেয়ার ও ব্যবসায়ীদের জরুরি যাতায়াতের সুবিধার্থে কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে ভাড়ায় স্পিডবোট পরিচালনা করছে। বর্তমানে এ কার্যক্রমে চারটি প্রতিষ্ঠান নিয়োজিত রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ফাস্ট মেরিন সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড, সি লিংক ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট কোম্পানি, নুরু অ্যান্ড সন্স এবং সালাম অ্যান্ড কোং। এর মধ্যে ফাস্ট মেরিন সার্ভিসের ছোট-বড় মিলিয়ে ছয়টি, সি লিংক ইন্টারন্যাশনালের চারটি, নুরু অ্যান্ড সন্সের একটি এবং সালাম অ্যান্ড কোংয়ের একটি স্পিডবোট রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠান চারটির ১২টি স্পিডবোট চলাচল করে। এসব স্পিডবোটের ভাড়া সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়ম মেনে স্পিডবোট পরিচালনা করতে হলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বোট সংরক্ষণের জন্য নিরাপদ জেটি, পন্টুন কিংবা নদীর তীরে স্থায়ী বা অস্থায়ী ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তাদের স্পিডবোট সংরক্ষণ করলেও ফাস্ট মেরিন সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে ব্যতিক্রমীভাবে বন্দরের সরকারি স্থাপনা ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব জেটি, পন্টুন কিংবা বোট ওঠানো-নামানোর বৈধ অবকাঠামো নেই। এ কারণে তারা মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের পানির জেটি ও আশপাশের স্থাপনা ব্যবহার করে স্পিডবোট বেঁধে রাখছে।
মোংলা বন্দরের পানির জেটি ও সংলগ্ন এলাকা সংবেদনশীল এবং নিরাপত্তাবলয়ের অন্তর্ভুক্ত। অভিযোগ রয়েছে, ফাস্ট মেরিন সার্ভিসের স্পিডবোটগুলো সরাসরি ওই জেটি এবং জেটির সঙ্গে নোঙর করা বন্দরের জাহাজের গায়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, জোয়ার-ভাটার তীব্র স্রোত ও নদীর গতিপ্রকৃতির কারণে এভাবে স্পিডবোট বেঁধে রাখা হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও নৌযানের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বন্দর বিধিমালা ও প্রযোজ্য অনুমোদনসংক্রান্ত শর্তের আলোকে সরকারি স্থাপনা বেসরকারি বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে স্পিডবোট রাখা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট নয়।
মোংলা বন্দর এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন্দরের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী দায়িত্ব পালন করে। তবে স্পিডবোট ও বোটচালকদের অভিযোগ, নিরাপত্তাকর্মীরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলেও ফাস্ট মেরিন সার্ভিসের স্পিডবোটগুলো প্রকাশ্যে সরকারি জেটিতে বেঁধে রাখার বিষয়টি বন্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
এ অবস্থায় সংরক্ষিত এলাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে ফাস্ট মেরিন সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেডের স্পিডবোট কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপক মুনসুরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। নিজস্ব জেটি না থাকা সত্ত্বেও বন্দর কর্তৃপক্ষের পানির জেটি ব্যবহারের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের পানির জেটি ব্যবহার করি, এর চাইতে বেশি কিছু বলতে পারব না। আপনি মালিকের সঙ্গে কথা বলুন।”
এরপর কোম্পানির মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মুঠোফোন নম্বর চাওয়া হলে তিনি কোনো বিস্তারিত তথ্য না দিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের একজন দাবি করেন, চারটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানই মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের নীতিমালা এবং নৌপরিবহন অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়ে এ ব্যবসা পরিচালনা করছে। ভাড়া ও পরিস্থিতি অনুযায়ী তাঁরা বন্দরের পানির জেটিসহ সুবিধাজনক বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রী ওঠানো-নামানোর কাজ করেন বলে জানান তিনি।
তবে ফাস্ট মেরিন সার্ভিসের নিজস্ব জেটি না থাকা এবং সরকারি স্থাপনা ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অনুমোদনপত্র বা নথি পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের অনুমোদন ও সরকারি স্থাপনা ব্যবহারের বৈধতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে সরকারি স্থাপনা ব্যবহারের বৈধতা যাচাই করা প্রয়োজন। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বন্দরের নিরাপত্তা ও সরকারি সম্পদ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
একই সঙ্গে কোন প্রতিষ্ঠান কী শর্তে স্পিডবোট পরিচালনা করতে পারবে, কোথায় বোট রাখবে এবং কোন স্থান থেকে যাত্রী ওঠানো-নামানো যাবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও তার যথাযথ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
১৬০ বার পড়া হয়েছে