বিরোধী দলে থেকেই দাফনে বাধা, ক্ষমতায় গেলে কী করবেন: তাসনিম জারা
সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ৫:৪৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
পিরোজপুরে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় একজন মানুষকে নিজের বসতভিটায় দাফন করতে বাধা দেওয়া হলে রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে দলটি কী করবে।
পিরোজপুরে ৮৭ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা। তাঁর অভিযোগ, নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের কথা বললেও অন্যদের ক্ষেত্রে সেই নীতি অনুসরণ করছে না দলটি।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন তাসনিম জারা।
পোস্টে তিনি জানান, গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে পিরোজপুরে ৮৭ বছর বয়সী মানিক পশারীর মৃত্যু হয়। তিনি সরকারি গেজেটভুক্ত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তবে তাঁর দাফনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা বাধা সৃষ্টি করেন বলে অভিযোগ করেন তাসনিম জারা।
তিনি লেখেন, সাধারণত কোনো মানুষের মৃত্যু হলে দাফনের প্রস্তুতিতে প্রতিবেশীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন। কেউ কবর খোঁড়েন, কেউ বাঁশ কিংবা চাটাইয়ের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু মানিক পশারীর মৃত্যুর পর স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল করেন এবং মাইক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে পিরোজপুরে দাফন করতে না দেওয়ার ঘোষণা দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাসনিম জারা মৃতের মেয়ে সীমু আক্তারের বক্তব্য তুলে ধরে জানান, প্রথমে বাড়িতে একটি কবর খোঁড়া হলেও কয়েকজন এসে সেটি ভরাট করে দেন। পরে সীমু আক্তার তাঁর ফুফুদের নিয়ে নতুন করে কবর খোঁড়েন। পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় অন্য কেউ কবর খুঁড়তে এগিয়ে আসেননি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে তাসনিম জারা লেখেন, ‘যে কোদাল পাড়ার ছেলেদের হাতে থাকার কথা, সেদিন তা ছিল মৃত ব্যক্তির মেয়ে আর বোনেদের হাতে।’
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত মধ্যরাতের পর পুলিশ পাহারায় পরিবারের সদস্যদের খোঁড়া কবরে মানিক পশারীকে দাফন করা হয়। ওই সময় প্রশাসনের কর্মকর্তা ছাড়া পরিবারের বাইরের কেউ উপস্থিত ছিলেন না বলেও দাবি করেন তিনি।
মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে প্রশ্ন
পোস্টে তাসনিম জারা উল্লেখ করেন, পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মানিক পশারীকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে তাঁকে গার্ড অব অনার ও পিরোজপুরে দাফন করতে না দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তবে দাফনের পর একই নেতা জামায়াতের নেতারা লাশের রাজনীতি করেন না বলে দাবি করেন বলে তাঁর পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে তা যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আদালত রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তাসনিম জারা। তাঁর মতে, কারও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে আপত্তি থাকলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় তা যাচাই করা যেতে পারে। কিন্তু দাফনে বাধা দিয়ে কিংবা মাইকে ঘোষণা দিয়ে এমন বিরোধের নিষ্পত্তি করা যায় না।
তিনি লেখেন, ‘মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন আপনি চাইলে তুলতে পারেন। তোলার জায়গাও আছে। যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান আছে, আদালত আছে।’
ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন
মৃত ব্যক্তির মর্যাদা ও পরিবারের শোকের বিষয়টি তুলে ধরে তাসনিম জারা বলেন, সাধারণত জানাজার আগে মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা তাঁর ভুলত্রুটির জন্য সবার কাছে ক্ষমা চান। কিন্তু পিরোজপুরের ঘটনায় মানিক পশারীর পরিবার সেই সুযোগও পায়নি বলে দাবি করেন তিনি। এমনকি নিজের গ্রামেও তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়নি বলে পোস্টে উল্লেখ করেন তাসনিম জারা।
জামায়াতের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি লেখেন, ‘পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে দেওয়া হবে না’—এমন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এমন ধারণা দেওয়া হচ্ছে, যেন ওই মাটির ওপর একক অধিকার রয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। একজন মানুষ নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শায়িত হতে পারবেন কি না, সেটিও অন্যদের অনুমতির ওপর নির্ভর করতে পারে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে জামায়াতের বিরোধিতার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তাসনিম জারা। তাঁর অভিযোগ, এখন দলটির নেতাকর্মীরা কে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন এবং কার দাফন কোথায় হবে, তা নির্ধারণ করতে চাইছেন।
তাসনিম জারা আরও বলেন, একসময় জামায়াতের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার স্লোগান দেওয়া হতো। এমন বক্তব্য কতটা অন্যায়, তা তাঁদের বোঝার কথা। কিন্তু বিরোধী দলে থাকা অবস্থাতেই তাঁরা সেই অভিজ্ঞতা ভুলে গেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পোস্টের শেষাংশে জামায়াতের ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাসনিম জারা। তাঁর ভাষ্য, দলটি নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও মানবিক মর্যাদার কথা বললেও অন্যদের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করছে না।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় একজন মৃত ব্যক্তিকে নিজের বসতভিটায় দাফন করতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠলে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা হাতে পেলে দলটি কী করবে।
তবে তাসনিম জারার এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জামায়াত নেতাদের নতুন কোনো বক্তব্য তাঁর ওই ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করা হয়নি।
১০৯ বার পড়া হয়েছে