সৌদি আরবে ৬ মাসে ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড, তালিকায় বাংলাদেশিরাও
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ৯:৪২ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
সৌদি আরবে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৫৯ জন বিদেশি নাগরিক, যাঁদের মধ্যে বাংলাদেশিরাও রয়েছেন। ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের (ইএসওএইচআর) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে। সম্প্রতি পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশিরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। তবে ওই দুই ব্যক্তি প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত নন।
সৌদি আরবে চলতি বছরও উচ্চ হারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশটিতে অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য নথিবদ্ধ করেছে ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস (ইএসওএইচআর)। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো এবারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব।
সংস্থাটির পরিসংখ্যান বলছে, বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসনামলে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত মোট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা দুই হাজারে পৌঁছেছে। পূর্ববর্তী যেকোনো শাসনামলের তুলনায় এই সংখ্যা সর্বোচ্চ।
জার্মানির বার্লিনভিত্তিক স্বাধীন, অলাভজনক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ইএসওএইচআর সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। সংস্থাটির যুক্তরাজ্যের লন্ডন ও লেবাননের বৈরুতেও প্রতিনিধি ও সহযোগী শাখা রয়েছে।
ইএসওএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ১০৮ জনের মধ্যে ৫৯ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক। অর্থাৎ মোট মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ৫৪ শতাংশ কার্যকর হয়েছে বিদেশিদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে সৌদি নাগরিক ছিলেন ৪৯ জন, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৪৬ শতাংশ।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, জর্ডান, সোমালিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া, বেনিন, ইরাক, কুয়েত, কেনিয়া, উগান্ডা ও আফগানিস্তানের নাগরিক রয়েছেন। সব মিলিয়ে ১৭টি দেশের নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য নথিবদ্ধ করেছে সংস্থাটি।
সম্প্রতি মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তবে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড প্রথম ছয় মাসের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত নয়। ওই সময়ে কতজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইএসওএইচআরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রধান কারণ ছিল মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধ। এ ধরনের অপরাধে ৭১ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
হত্যাকাণ্ডের মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ২৫ জনের। এ ছাড়া রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় ৯ জন এবং অন্যান্য অপরাধে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৯ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক। মোট মৃত্যুদণ্ডের হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশ। এ ধরনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিদেশিদের মধ্যে ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান ও ইয়েমেনের নাগরিকের সংখ্যা বেশি ছিল।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে কার্যকর হওয়া ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৮৩টি, অর্থাৎ প্রায় ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ, এমন অপরাধে দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সম্পর্ক ছিল না।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি ভিত্তি বিশ্লেষণ করে ইএসওএইচআর জানিয়েছে, প্রথম ছয় মাসে ৮৪ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ‘তাজির’ শাস্তির ভিত্তিতে। এটি এমন একধরনের শাস্তি, যেখানে বিচারকের বিবেচনামূলক ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ সংখ্যা মোট মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
এ ছাড়া ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৯১টি মামলার বিষয়ে সাজা কার্যকরের আগে ইএসওএইচআর বা সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো সংস্থা আগাম তথ্য জানতে পারেনি কিংবা তা নথিবদ্ধ করতে পারেনি। এ হার প্রায় ৮৪ দশমিক ২ শতাংশ।
সংস্থাটির মতে, এসব তথ্য সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মামলার তথ্য সংগ্রহে প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি তুলে ধরে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলাতেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব। এ ধরনের মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তিদের বিচার করেছে দেশটির বিশেষায়িত ফৌজদারি আদালত। এসব মৃত্যুদণ্ড মোট সংখ্যার প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।
আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল গত জুনে সৌদি আল-ফারাজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা। আইনবহির্ভূত আটকাদেশ-সংক্রান্ত জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ এর আগে তাঁর আটকাদেশকে বেআইনি ও অযৌক্তিক বলে বিবেচনা করেছিল।
এ ছাড়া গত ৯ এপ্রিল আলী আল-সুবাইতি নামের এক অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি কর্তৃপক্ষ। তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলোর মধ্যে একটি ছিল মাত্র ১২ বছর বয়সে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া।
ইএসওএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, শৈশবে সংঘটিত কথিত অপরাধের জন্য সৌদি আরবে এখনো অন্তত পাঁচজন মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন। জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ তাঁদের কয়েকজনের আটকাদেশকে বেআইনি ঘোষণা করে মুক্তির আহ্বান জানিয়েছিল। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাঁদের জীবন রক্ষা কিংবা জাতিসংঘের সুপারিশ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ করেছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশের অভিযোগে দণ্ডিত আরও ৪৯ জন মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শেখ সালমান আল-আওদা ও শেখ হাসান আল-মালিকি রয়েছেন। ২০১৮ সাল থেকে সরকারি কৌঁসুলিরা তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে আসছেন। তবে তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়া এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।
সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বিদেশি বন্দীদের পরিস্থিতিও নথিবদ্ধ করেছে ইএসওএইচআর। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, খামিস মুশাইত কারাগারে ৫৮ জন ইথিওপীয়, নাজরান কারাগারে পাঁচজন ইথিওপীয় ও পাঁচজন সোমালীয় এবং তাবুক কারাগারে আটজন মিসরীয় বন্দী মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এসব বন্দীর মামলায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন অভিযোগ পেয়েছে সংস্থাটি। এর মধ্যে রয়েছে পেশাদার দোভাষীর অনুপস্থিতি, আইনি সহায়তা না পাওয়া, বিচারিক প্রক্রিয়া বুঝতে না পারা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া।
ইএসওএইচআরের সঙ্গে কথা বলা বন্দীরা জানিয়েছেন, তাঁরা প্রতিনিয়ত মৃত্যুদণ্ডের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় থাকা বন্দীদের কয়েক দিনের জন্য অন্যদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা হয়েছে। বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর তাঁদের হঠাৎ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ইএসওএইচআরের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যান সৌদি আরবে দ্রুতগতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রবণতা অব্যাহত থাকার বিষয়টি তুলে ধরে। সংস্থাটির অভিযোগ, আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা ও জনসমক্ষে ঘোষিত আইনি প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে। এর মধ্যে নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন এবং শিশু অধিকার সনদের অধীনে থাকা প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
অন্যায্য বিচার, নির্যাতন, বৈষম্য ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগের মধ্যেও সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উচ্চ হার অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তাদের মতে, চলমান পরিস্থিতি দেশটির বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার চর্চা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।
১১১ বার পড়া হয়েছে