কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাটে শিশুদের কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ছে লালনের গান
সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৪৮ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন স্মরণোৎসব ঘিরে যখন ভক্ত-সাধুদের সমাগম, তখন উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত জনপদে শিশুদের কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ছে মরমি সাধক ফকির লালন শাহের মানবতার গান। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে ‘মায়ের তরী’ নামে একটি সংগঠনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা নয়টি গুরুগৃহে চর্চা হচ্ছে লালনগীতি, বাউল, মুর্শিদি, মারফতি ও ভাওয়াইয়া গান। সংগীতচর্চার পাশাপাশি এসব গানের মধ্য দিয়ে শিশুদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে গান, সাধুসঙ্গ ও নানা আয়োজনে স্মরণ করা হচ্ছে মরমি সাধক ফকির লালন শাহকে। তাঁর ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে ভক্ত-অনুরাগীদের মিলনমেলায় মুখর আখড়াবাড়ি। তবে লালনের গান ও দর্শন এখন আর ছেঁউড়িয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা অববাহিকার প্রত্যন্ত গ্রামেও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে তাঁর সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার বাণী।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের সিংহীমারী গ্রামের সেবালয় গুরুগৃহে দেখা যায়, একতারা ও দোতরা হাতে গান অনুশীলন করছে শিশুরা। সুরের সঙ্গে তারা শিখছে গানের কথা ও অন্তর্নিহিত দর্শন। বিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি এমন সংগীতচর্চা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করে তুলছে।
সেবালয় গুরুগৃহের প্রধান গুরু নারায়ণ রায় বলেন, লোকগানের নিয়মিত চর্চা শিশুদের নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখে। গানের কথা ও অর্থ বুঝিয়ে শেখানো হলে সংগীতের পাশাপাশি তাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধও গড়ে ওঠে।
সেবালয়ের মতো একইভাবে লোকসংগীতের চর্চা চলছে সাহসালয়, মায়ালয়, সান্ত্বনালয়, সুরালয়, সহজালয়, কর্মলয়, স্মৃতিলয় ও আপনালয় গুরুগৃহে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিশুরা লালনগীতি, বাউল, মুর্শিদি, মারফতি ও ভাওয়াইয়া গানের পাশাপাশি বেহালা, একতারা, দোতরা, সারিন্দা, তবলা, বাঁশি ও খমকের মতো লোকবাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখছে।
শিশুদের মধ্যে লোকসংগীতের চর্চা ছড়িয়ে দেওয়া এবং স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের এ উদ্যোগের নাম ‘মায়ের তরী’। নরওয়ের কবি, লেখক ও লোকগবেষক উয়েরা সেথের দীর্ঘদিনের লোকসংস্কৃতিচর্চা এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে ২০১৬ সালে স্থানীয় শিল্পী ও সংগঠকদের নিয়ে সংগঠনটি গড়ে তোলেন। বাংলার লোকসংগীতের প্রতি অনুরাগ থেকে তিনি লালনের ৫৩টি গান নরওয়েজীয় ভাষায় অনুবাদ করে বই প্রকাশ করেছেন।
মায়ের তরীর নির্বাহী পরিচালক সুজন কুমার বেদ বলেন, লোকসংগীতের মধ্য দিয়ে শিশুদের মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য সংরক্ষণ করাই সংগঠনটির লক্ষ্য। বর্তমানে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের নয়টি গুরুগৃহে লোকগান ও লোকবাদ্যযন্ত্রের চর্চা চলছে।
সংগঠনটির অন্যতম সংগঠক ইউসুফ আলমগীর বলেন, লালনের দর্শনকে শুধু ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তাঁর মানবিক বাণীর পূর্ণ বিস্তার ঘটে না। নদীভাঙন ও বন্যায় বিপর্যস্ত জনপদের শিশুদের কাছে এসব গান পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে লালনের দর্শন নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
কুড়িগ্রাম লালন একাডেমির সাধারণ সম্পাদক শিবলী সাদিক আতিকের মতে, লালনের গান কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সম্প্রদায়ের সম্পদ নয়; এটি বাঙালির মানবিক চেতনার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য।
কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজার রহমান টিউটরও মনে করেন, প্রত্যন্ত জনপদে লোকসংস্কৃতির এমন চর্চা জাতীয় পর্যায়ে ঐতিহ্য সংরক্ষণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, লোকসংগীতের মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলা এবং লোকঐতিহ্যকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে মায়ের তরী। এ উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করতে ভবিষ্যতে লোকশিল্পীদের জন্য আনন্দাশ্রম বা আনন্দলয় প্রতিষ্ঠা, হারিয়ে যাওয়া গান ও শিল্পীদের জীবনকথা সংরক্ষণে ডিজিটাল সংগ্রহশালা তৈরি এবং একটি লোকসংগীত ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
ছেঁউড়িয়ার লালন স্মরণোৎসব মরমি সাধকের সাধনা ও দর্শনকে স্মরণ করার ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। অন্যদিকে, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার তীরবর্তী জনপদে মায়ের তরীর গুরুগৃহগুলো তাঁর দর্শনকে শিশুদের চর্চার মধ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে। এভাবেই আখড়াবাড়ির গণ্ডি পেরিয়ে লালনের মানবতার গান পৌঁছে যাচ্ছে উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামে, নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে খুঁজে নিচ্ছে নতুন ঠিকানা।
১৮০ বার পড়া হয়েছে