সর্বশেষ

সারাদেশ

শরীয়তপুরে পিআইও ইস্রাফিলের বিরুদ্ধে ঘুষ-বাণিজ্যের পাহাড়সম অভিযোগ

মেহেদী হাসান, শরীয়তপুর
মেহেদী হাসান, শরীয়তপুর

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:১৪ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. ইস্রাফিল হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া, কাজ না করে বিল পরিশোধ এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, জাজিরার পাশাপাশি নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। তবে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইস্রাফিল হোসেন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল ইমরান।

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. ইস্রাফিল হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ ও বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পের বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে তাঁকে নির্ধারিত হারে কমিশন দিতে হয়। এমনকি কোনো কোনো প্রকল্পের কাজ আংশিক সম্পন্ন হলেও কিংবা কাজ না করেই বিল পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে।

ইস্রাফিল হোসেন জাজিরা উপজেলার পাশাপাশি নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলায়ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয় কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যের অভিযোগ, তিনটি উপজেলায় বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে বছরে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ঘুষ হিসেবে আদায় করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের ব্যাংক হিসাব এবং সম্পদের তথ্য যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।

বিশেষ করে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর), গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা—নগদ অর্থ), গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা—চাল) এবং গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা—গম) কর্মসূচির বরাদ্দ থেকে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব কর্মসূচির আওতায় কোনো প্রকল্পের কাজ আংশিক সম্পন্ন হয়েছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ না করেই বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে জাজিরা উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের জন্য গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচিতে ১ কোটি ১২ লাখ ২৩ হাজার ২২ টাকা এবং গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা—নগদ অর্থ) কর্মসূচিতে ১ কোটি ২৫ লাখ ২১ হাজার ১৩৮ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কাবিখা কর্মসূচির আওতায় ৭৪ দশমিক ৬২৯৩ মেট্রিক টন চাল এবং সমপরিমাণ গম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব বরাদ্দের বিপরীতে যেসব কাজ বাস্তবায়নের কথা, তার কিছু কাগজে-কলমে সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে কাজ হয়নি। একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলাতেও।

জাজিরা উপজেলার পালেরচর ইউনিয়নে সরেজমিনে গিয়ে কয়েকটি প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাথুরিয়া সাদেক মুন্সীকান্দি হযরত আয়শা (রা.) মহিলা মাদ্রাসা ও এতিমখানার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে সেখানে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এর পরও প্রকল্পের বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

একই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে মাছবাজারের ইটের রাস্তা থেকে আলাই মাদবরের বাড়ির দিকে হেরিংবোন রাস্তা নির্মাণে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২ নম্বর ওয়ার্ডের পালেরচর আ. গণি উচ্চবিদ্যালয়ের তৃতীয় তলার দেয়ালের ওপর রেলিং নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ লাখ ৪৬ হাজার ১০২ টাকা। এসব প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন না হলেও বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে মোহাম্মদ বেপারীর বাড়ির কাছে ডাবল ইটের রাস্তা থেকে শাহজাহান মাস্টারের বাড়ির দিকে রাস্তা ইটের সলিং করার জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাথুরিয়া মধু মাদবরকান্দি কালাই পাগলের মাজার খানকাহ শরিফের মাঠ ভরাটের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ৭ দশমিক ১৯৭ মেট্রিক টন চাল। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কাজও বাস্তবে করা হয়নি, অথচ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

স্থানীয় রফিক মাঝি, ইয়াসিন মাদবরসহ কয়েকজনের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন না করেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ঘুষের বিনিময়ে বিল উত্তোলন করেছেন। তাঁদের দাবি, এভাবে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও অনেক প্রকল্পে দৃশ্যমান উন্নয়ন হচ্ছে না।

পালেরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন ফরাজীসহ কয়েকটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ শেষ করে বিল-ভাউচার জমা দেওয়ার পরও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে ঘুষ দিতে হয়।

তাঁদের ভাষ্য, প্রতি ১ লাখ টাকার কাঁচা রাস্তার প্রকল্পে ১২ হাজার টাকা এবং ইটের সলিংয়ের ক্ষেত্রে প্রতি লাখে ১৫ হাজার টাকা দিতে হয়। এর বাইরে কার্যালয়ের খরচ বাবদ দিতে হয় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। চাহিদামতো অর্থ না দিলে বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর করা হয় না বলেও অভিযোগ তাঁদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক চেয়ারম্যান বলেন, প্রকল্পের অর্থ থেকে কমিশন কেটে নেওয়ার কারণে নির্ধারিত বরাদ্দে মানসম্মত কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে জনপ্রতিনিধিদের নিজেদের অর্থও ব্যয় করতে হয়।

স্থানীয় কানিজ ফাতেমা, ফজলুর রহমান ও মাহবুব আলমসহ কয়েকজনের অভিযোগ, বিভিন্ন প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণকাজ, আংশিক বাস্তবায়ন এবং শ্রমিকের পরিবর্তে যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া একই স্থানে একাধিক প্রকল্প দেখানো, প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে অর্থ উত্তোলন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি স্থাপনে অনিয়ম এবং অস্তিত্বহীন প্রকল্পের বিপরীতে বিল তোলার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের কর্মকর্তা বা কর্মচারী না হয়েও বাদশা নামে এক ব্যক্তি কার্যালয়ের অধিকাংশ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। টিআর, কাবিটা, কাবিখা—চাল ও গম কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিল তৈরি, জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং কমিশন আদায়ের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পিআইও ইস্রাফিল হোসেন ও বাদশাকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তাঁদের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বিল উত্তোলন কঠিন হয়ে পড়ে বলেও দাবি করেছেন কয়েকজন জনপ্রতিনিধি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বাদশার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান, শ্মশানঘাট, গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ, মেরামত এবং সংস্কারের জন্য সরকারি ও বিভিন্ন সংস্থার বরাদ্দ করা অর্থের একটি বড় অংশ অনিয়মের মাধ্যমে তছরুপ হচ্ছে।

তাঁদের দাবি, উন্নয়ন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তার জন্য বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার অর্থ উপজেলা এবং জাতীয় সংসদ সদস্যদের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ত্রাণ, দুর্যোগ ও পুনর্বাসন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বিভিন্ন বরাদ্দও উপজেলা পর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়। এসব বরাদ্দ থোক, সাধারণ ও বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে পরিচিত।

উপজেলার অনুকূলে বরাদ্দ করা অর্থ সমন্বয় কমিটির সভার মাধ্যমে বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রকল্পে বণ্টন করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব জনপ্রতিনিধিদের ওপর থাকলেও কাজের তদারকির দায়িত্ব উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার। অভিযোগকারীদের দাবি, এই তদারকির দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করায় বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

এ ছাড়া ইস্রাফিল হোসেনের বিরুদ্ধে নিয়মিত কার্যালয়ে উপস্থিত না থাকা এবং প্রায়ই দেরিতে অফিসে আসার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাজিরা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. ইস্রাফিল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তবে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।

জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল ইমরান বলেন, অভিযোগের বিষয়ে তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১৭৩ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০