সর্বশেষ

সারাদেশ

কলাপাড়ায় শিশু জিসানকে 'রক্তের নাতি' দাবি করলেন বিএনপি নেতা চুন্নু

এ এম মিজানুর রহমান বুলেট, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
এ এম মিজানুর রহমান বুলেট, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৯:১৯ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ১৩ বছর বয়সী শিশু জিসান হাওলাদারকে মারধরের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। উপজেলা বিএনপির সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান চুন্নু তালুকদার শিশুটিকে নিজের ‘রক্তের নাতি’ দাবি করে বলেছেন, চুরির অভিযোগে তাকে শাসন করতে গিয়ে ভুল হয়েছে। তবে শিশুটির মা নাজমা বেগমের অভিযোগ, চুরির অপবাদ দিয়ে তাঁর ছেলে ও তাঁকেও মারধর করা হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার চাকামইয়া ইউনিয়নে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে উপজেলা বিএনপির সদস্য আবদুল হাই তালুকদারের বাড়ি থেকে একটি মানিব্যাগ চুরির অভিযোগ ওঠে একই এলাকার মৃত বাচ্চু হাওলাদারের ছেলে জিসানের বিরুদ্ধে।

অভিযোগের পর জিসানকে তাঁর বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তাঁর মা নাজমা বেগমও সেখানে যান। মানিব্যাগ চুরির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে উপজেলা বিএনপির সম্পাদক হাফিজুর রহমান চুন্নু তালুকদার সেখানে যান। পরে শিশুটিকে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মারধর করা হয়। ঘটনাটি গোপনে মুঠোফোনে ধারণ করেন জিসানের মা। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জিসানের বিরুদ্ধে এলাকায় আগে চুরির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় দোকানি রাসেল অভিযোগ করেন, তাঁর স্ত্রীর জানাজার সময় তাঁর দোকান থেকে বিস্কুটসহ বিভিন্ন জিনিস জিসান নিয়ে গিয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দা মুজাফফর গাজীও দাবি করেন, সম্প্রতি জিসান তাঁর পকেট থেকে টাকা নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় এক নারী প্রত্যক্ষদর্শী ফরিদা বেগমের ভাষ্য, ঘটনার সময় চুন্নু তালুকদার শুকনো বাঁশের কঞ্চি দিয়ে জিসানকে কয়েকবার আঘাত করেন। পরে তাঁর স্ত্রী নাজমুন নাহার কঞ্চিটি ধরে ফেলেন। ফরিদা বেগম বলেন, জিসানের বিরুদ্ধে আগে থেকেই চুরির অভিযোগ থাকায় ক্ষোভ থেকে তাকে শাসন করা হয়েছিল। তবে শিশুকে মারধর করাও ভুল হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

চুন্নু তালুকদারের স্ত্রী নাজমুন নাহার বলেন, জিসান তাঁদের পরিবারের আত্মীয় এবং তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে তার পরিবারের পাশে রয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, জিসান তাঁদের বাড়ির নারিকেল, কাঁঠাল, শসা ও পুকুরের মাছসহ বিভিন্ন জিনিস চুরি করেছে। ওই রাতেও মানিব্যাগ চুরির খবর পেয়ে তাঁর স্বামী সেখানে যান। প্রথমে পুলিশকে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পুলিশ না নেওয়ায় কয়েকটি আঘাত করা হয়। পরে তিনি জিসানকে আর মারতে দেননি বলে দাবি করেন।

নাজমুন নাহারের ভাষ্য, জিসানের মা নিজেই ছেলেকে শাসন করতে বলেছিলেন। তিনি জিসানকে পরিবারের সদস্য ও নাতির মতোই দেখেন বলেও দাবি করেন।

অন্যদিকে জিসানের দাবি, সে ওই রাতে আবদুল হাই তালুকদারের বাড়িতে গিয়েছিল তাঁর কাজের লোক আতিকের সঙ্গে। সে মানিব্যাগ চুরি করেনি। একটি খালি মানিব্যাগ পেয়েছিল, কিন্তু তাতে কোনো টাকা ছিল না। তাকে অন্যায়ভাবে মারধর করা হয়েছে বলে দাবি করে জিসান।

আবদুল হাই তালুকদার বলেন, জিসানকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে আসার পর শিশুটির মা মানিব্যাগ ও কিছু কাগজপত্র ফেরত দেন। মানিব্যাগে ৫ হাজার টাকা থাকলেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। জিসানকে কেন মারধর করা হয়েছে—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নাতির অধিকার থেকে তাকে শাসন করা হয়েছিল, তবে মারধর করা ভুল হয়েছে। জিসানের মাকে মারধরের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

অভিযুক্ত হাফিজুর রহমান চুন্নু তালুকদারও জিসানকে নিজের ‘রক্তের নাতি’ দাবি করেন। তিনি বলেন, জিসানের বিরুদ্ধে আগে যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলো তিনি পারিবারিকভাবে সামাল দিয়েছেন এবং তার পরিবারকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে আসছেন। তাঁর দাবি, জিসানের মা নিজেই তাঁকে শাসন করতে বলেছিলেন।

চুন্নু তালুকদার আরও বলেন, ঘটনার রাতে তিনি চাকামইয়া এলাকায় দায়িত্বে থাকা পুলিশের এএসআই মিজানকে ফোন করেছিলেন। শিশুটির বয়স কম হওয়ায় পুলিশ তাকে না নেওয়ায় তিনি কী করবেন—এমন প্রশ্ন তুলে শেষ পর্যন্ত রাগের মাথায় মারধর করার কথা স্বীকার করেন। তবে শিশুটিকে গোয়ালঘরে বেঁধে রাখা এবং তার মাকে মারধরের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

এ বিষয়ে কলাপাড়া থানার এএসআই মিজান বলেন, ঘটনার রাতে চুন্নু তালুকদার তাঁকে ফোন করেছিলেন। তবে তিনি তখন অন্য এলাকায় সাক্ষ্য দিতে অবস্থান করছিলেন। তাই তাঁকে থানার ডিউটি অফিসারকে বিষয়টি জানাতে বলেছিলেন। শিশুকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়ার কথা তিনি অস্বীকার করেন।

জিসানের মা নাজমা বেগম বলেন, ছেলের বিরুদ্ধে ছোটখাটো চুরির অভিযোগ থাকায় তিনি মাঝেমধ্যে তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতেন। চুন্নু তালুকদার তাঁদের আত্মীয়—এ কথাও তিনি স্বীকার করেন। তবে ওই রাতে চুরির অভিযোগ তুলে তাঁর ছেলে ও তাঁকে মারধর করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ঘটনার সময় কৌশলে ভিডিও ধারণ করেছিলেন বলেও জানান নাজমা।

বর্তমানে জিসান ও তাঁর মা কলাপাড়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নাজমা বেগম ঘটনার বিচার দাবি করার পাশাপাশি জমি-সংক্রান্ত কাগজপত্র ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, তিনি ঘটনাটি শুনেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১০৭ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০