মোংলায় চুরির মহোৎসব, নেপথ্যে পুলিশের মাসোয়ারা সিন্ডিকেট!
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩:১০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
মোংলা পৌর শহরে আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে চুরির ঘটনা, যার ফলে চরম আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার মাসোয়ারা সিন্ডিকেট এবং অপরাধীদের শেল্টার দেওয়ার কারণেই এই চুরির মহোৎসব চলছে।
মোংলা পৌর শহর এখন চোর ও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের বসতঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হানা দিচ্ছে সংঘবদ্ধ চোর চক্র। লুট হচ্ছে সর্বস্ব, আর সাধারণ নাগরিকদের কাটাতে হচ্ছে নির্ঘুম রাত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই চুরির উৎসবের নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় চোর ও তাদের গডফাদারদের সাথে পুলিশ ফাঁড়ির কতিপয় কর্মকর্তার গোপন আঁতাত। শেল্টারদাতাদের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোয়ারা নেওয়ার কারণে পুলিশ কার্যত কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় এমন চুরির ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগের তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক সপ্তাহে মোংলা পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকায় চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চোরের দল রাতের আঁধারে তালা ভেঙে ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে চম্পট দিচ্ছে। বাদ যাচ্ছে না ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও। এর ফলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই চোর আতঙ্কে রাতে ঘুমাতে পারছেন না, নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে এলাকার বাসিন্দাদের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মোংলা উপজেলা ও পৌর শহরের মধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক ভাঙারি (পুরাতন মালামালের) দোকান রয়েছে। চোরেরা বিভিন্ন স্থান থেকে মূল্যবান মালামাল চুরি করে সরাসরি স্থানীয় ভাঙারি দোকানগুলোতে বিক্রি করছে। আর এই চোরাই মাল নিরাপদে কেনাবেচার জন্য ভাঙারি ব্যবসায়ীদের প্রতি মাসে পুলিশকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি ভাঙারি দোকান থেকে পুলিশের ধার্য করা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা প্রতি মাসে আদায় করতে ফাঁড়ির কনস্টেবল বা কর্মকর্তা নিজেই কালেকশন করে থাকে। এলাকায় সুস্থভাবে ব্যবসা করতে হলে ক্ষুদ্র বা বড় ভাঙারি দোকানের মালিককেও বাধ্য হয়ে প্রতি মাসে পুলিশকে বিভিন্ন অঙ্কের তাদের বরাদ্দকৃত টাকা মাসোহারা দিতে হয়। যারা বড় দোকানদার, তাদের ক্ষেত্রে মাসোয়ারার অঙ্ক আরও বেশি।
শহরের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও সাধারণ বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা ট্যাক্স দিয়েও শান্তিতে ঘুমাতে পারছি না। ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা রাতে পাহারার নামে আদায় করতে নামে। যদি চোরদের শেল্টারদাতাদের কাছ থেকে মাসোয়ারা খায়, তবে আমরা সাধারণ মানুষ কার কাছে যাব? রাতে পাহারা দিয়েও চুরির হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রশাসন হয়েও ভাঙারি দোকানের পাশাপাশি এলাকার মদের দোকানগুলো থেকেও পুলিশের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দেশি মদের দোকানের মালিক সরোয়ারের কাছ থেকে নেওয়া হয় ১৫ হাজার টাকা, আর মোংলা বাসস্ট্যান্ডের বার থেকে নেওয়া হয় ৪০০০ টাকা দিতে হয়, যাতে প্রকাশ্যে তারা মদ বিক্রি করতে পারে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যবসায়ীরা জানায়।
প্রশাসনকে মাসিক মাসোয়ারা দেওয়ার বিনিময়ে এই অলিখিত ‘নিরাপত্তা’ পাওয়ার কারণেই চোরাই মালের রমরমা ব্যবসা চলছে এবং চোরেরা বড় বড় চুরি করতে সাহস পাচ্ছে। এ বিষয়ে এলাকার সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী এবং পুলিশের সাথে কথা বলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।
এলাকাবাসীর চরম ক্ষোভের প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কারা এই চুরির পেছনে জড়িত এবং কারা চোরদের আশ্রয়-প্রশ্রয় (শেল্টার) দিচ্ছে, তা প্রশাসনের অজানা নয়। কিন্তু ওইসব শেল্টারদাতাদের কাছ থেকে ফাঁড়ির কতিপয় পুলিশ সদস্য নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোয়ারা (মাসিক বকশিশ) তুলছেন।
মাসোয়ারার বিনিময়ে চোরচক্র এক প্রকার অলিখিত ‘নিরাপত্তা’ পাওয়ায় কোনোভাবেই এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে দু-একজন ধরা পড়লেও মূল হোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে।
ভাঙারি ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ করে আরও বলেন, আমরা তো ব্যবসা করতে বসেছি। পুলিশ এসে টাকা দাবি করলে না দিয়ে উপায় কী? চাঁদা না দিলে চুরির মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া বা দোকান বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। যেমন, গরিব ভাঙারির মালিককে বাধ্য হয়ে প্রতি মাসে ১৫০০ টাকা গুনতে হয় ফাঁড়ির পুলিশকে, নাহলে তাকে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না। এরকম প্রতিটি দোকান থেকে তাদের মাসিক টাকা দিতে হয়।
এ ব্যাপারে মোংলা ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাস গ্রাম ও শহরের চুরি বৃদ্ধির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, মাসিক মাসোহারা বা চাঁদা নেওয়ার এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট। শুনেছি আগে যারা ছিল তারা আদায় করত, আমি এখানে জয়েন করার পর থেকে সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কেউ প্রমাণ দিতে পারলে সেই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে মোংলা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মোঃ রেফাতুল ইসলাম জানান, শহরে চুরির ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশি তৎপরতা আরও জোরদার করা হচ্ছে। মোংলা শহরকে অপরাধমুক্ত রাখতে পুলিশ সর্বদা কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি কিছু চুরির ঘটনার সূত্র ধরে আমরা ইতিমধ্যে মাঠে নেমেছি এবং চোর চক্রকে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। তবে পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মাসোয়ারা নেওয়া বা চোরদের আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে কোনো পুলিশ সদস্যের সুনির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধী যেই হোক, তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।
চুরির এই ভয়াবহ সিন্ডিকেট ভেঙে শহরবাসীর স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবনযাত্রা ফিরিয়ে দিতে এবং অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক আইনি ব্যবস্থা নিতে মোংলা থানা পুলিশ ও ঊর্ধ্বতন মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী মোংলাবাসী।
২৫৩ বার পড়া হয়েছে