শূন্য দশমিক শূন্য দুই সেন্ট
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২:১০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
পর্দার ক্ষতিকর নীলচে আলো সুমনের চোখের মণিকে প্রায় নিথর করে ফেলেছে। চারপাশের পৃথিবীর সব স্বাভাবিক অস্তিত্ব সেই আলোর তীব্রতায় ফিকে হয়ে গেছে বহু আগেই। ঘরের কোণে ঝুলতে থাকা দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দও ডুবে গেছে মাউসের যান্ত্রিক ক্লিক ও কীবোর্ডের অবিরাম খটখট শব্দে। দীর্ঘ সময় ধরে একইভাবে প্লাস্টিকের গ্রিপ ধরে থাকায় হাতের তালুতে জমেছে বিষাক্ত ঘাম, যার আর্দ্রতায় মাউসপ্যাডটি স্যাঁতসেঁতে, চিটচিটে হয়ে উঠেছে।
ল্যাপটপের উজ্জ্বল মনিটরে ভেসে ওঠে চার বছরের নিষ্পাপ শিশুর ছবি—ক্ষুদ্র দুই হাতে রক্তারক্তি কাটা দাগ, চোখে হিমশীতল ভীতি। স্ক্রিনের ঠিক ডান পাশে রয়েছে কয়েকটি বিকল্প অপশন। সুমনের অভ্যস্ত আঙুলগুলো নিমেষেই বেছে নেয় 'Self-harm, Severe'। বক্সে টিক চিহ্ন বসিয়ে 'নেক্সট' বাটনে চাপ দিতেই চোখের সামনে ফুটে ওঠে আরেকটি বীভৎস দৃশ্য। উন্নত বিশ্বের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদমকে 'সহিংসতা', 'যৌনতা' কিংবা 'রক্তপাত' চিনতে শেখানোর জন্য সুমনদের মতো হাজারো মানুষকে প্রতিদিন অন্তত তিন থেকে চার হাজার এমন বীভৎস ছবি ও ভিডিও পার হতে হয়। এ এক আত্মাহীন প্রসেসিংয়ের কারখানা। প্রতিটি ধ্বংসাত্মক ছবি ও মানসিক নির্যাতনের বিনিময়ে মেলে সামান্য কয়েক পয়সা—মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য দুই সেন্ট।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের একসময়ের অন্যতম সেরা মেধা আজ এই চারকোণা প্লাস্টিকের ফ্রেমের ভেতরে বন্দি। যে মস্তিষ্ক একদা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জটিল সমীকরণ সমাধান করত, তা আজ সুদূর কোনো ধনী দেশের এআই কোম্পানির সার্ভারে সস্তা ময়লা পরিষ্কারকের কাজ করছে। প্রগতির নামে গড়ে ওঠা এই আধুনিক দাসত্বে মানুষের মেধা ও অনুভূতির কোনো মূল্য নেই।
পাশের ঘর থেকে ভেসে আসে মায়ের ভারী, কষ্টকর নিঃশ্বাসের শব্দ। টেবিলের পাশে ধুলো জমে থাকা রক্তচাপের ওষুধের খালি পাতা দুদিন ধরে এমনি পড়ে আছে, নতুন ওষুধ কেনার অর্থ সুমনের হাতে নেই। একটানা আঠারো ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনির পরও পেমেন্ট অ্যাকাউন্টে জমা পড়া সামান্য অর্থ আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চার্জ এবং পেমেন্ট গেটওয়ের গ্যাঁড়াকলে পড়ে বাষ্প হয়ে যায়। পকেটে যা অবশিষ্ট থাকে, তা দিয়ে বেঁচে থাকার ন্যূনতম চাহিদাটুকুই মেটে না।
টেবিলে রাখা স্মার্টফোনের পর্দা নিভে নিঃশব্দ হয়ে যায়। বন্ধুদের বিকেলের আড্ডা, স্বজনদের উৎসবের নিমন্ত্রণ, কিংবা একসময়ের প্রিয় মানুষের খোঁজ নেওয়া—সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে নিতে সুমন আজ তীব্র নিঃসঙ্গ অবয়বে পরিণত হয়েছে। কতদিন সে সূর্যোদয় দেখেনি, তার কোনো হিসাব নেই। পুরো বিশ্বে কর্মব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠলে সুমনের দিন শুরু হয়—তীব্র দুপুরে, ঘুমভাঙা চোখ, শ্রান্ত শরীর নিয়ে শুরু করে ভার্চ্যুয়াল কাজ।
হঠাৎ করেই সুমনের অবশ আঙুলগুলো মাউসের ওপর স্থির হয়ে যায়। স্ক্রিনে এবার ভেসে উঠেছে মেডিকেল ইমেজিংয়ের কিছু জটিল ফাইল। মানুষের মস্তিষ্কের অতি সূক্ষ্ম নিউরনের ছবি দেখে টিউমার চিহ্নিত করার কঠিন কাজ। পদার্থবিজ্ঞানের মেধা দিয়ে জটিল সব অ্যানাটমি বুঝে ডেটা লেবেল করার এই কাজটির মূল্যও এখানে নির্ধারণ করা হয়েছে একজন অদক্ষ দিনমজুরের চেয়ে কম দামে।
সুমন ল্যাপটপের বন্ধ হয়ে যাওয়া কাচের স্ক্রিনে নিজের আবছা প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। উস্কোখুস্কো চুল, অগোছালো দাড়ি, চোখের নিচে গভীর কালচে গর্ত, আর একটানা বসে থাকার ফলে ধনুকের মতো বেঁকে যাওয়া মেরুদণ্ড। নিউরনের ছবির দিকে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ তার মনে হয়, স্ক্রিনে দৃশ্যমান ওই মারণ টিউমার আসলে কোনো অচেনা রোগীর নয়, ওটা তার নিজের অস্তিত্বের ভেতরেই ধীরে ধীরে বাসা বেঁধেছে। এক নিঃশব্দ শূন্যতা, যা তার চিন্তাশক্তি, মানবিক আবেগ এবং পুরো মানবীয় অস্তিত্বকে তিল তিল করে গিলে খাচ্ছে।
কার্সর 'সাবমিট' বাটনের ওপর এসে থমকে থাকে। সুমনের চোখ যায় কীবোর্ডের ঠিক কোণায় অবস্থিত 'পাওয়ার' বোতামের দিকে। দ্বিধা, তীব্র ক্লান্তি আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা একসাথে তার ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। সুমনের আঙুল এবার সাবমিট বাটনে যায় না; তা শক্ত হাতে চেপে ধরে পাওয়ার বোতামটি। মনিটর এক লহমায় কালো হয়ে যায়। ঘর জুড়ে নেমে আসে এক নিশ্ছিদ্র, পরম শান্ত অন্ধকার।
ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে মায়ের কাশির তীব্র শব্দ কানে ভেসে আসে। কাশির সাথে মিশে থাকে এক গ্লাস পানির আকুল আর্জি। মাসের পর মাস যন্ত্রের দাসত্বে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া সুমনের হাত দুটো কয়েক সেকেন্ড মেঝের ওপর স্থির হয়ে থাকে। এরপর, হয়তো বহু বছর পর, মাউসের ওপর থেকে হাত সরিয়ে মানুষটি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
অন্ধকার ঘর ছেড়ে সুমন মায়ের বিছানার পাশে গিয়ে বসে। পরম মমতায় হাত রাখে মায়ের জরাজীর্ণ, শীতল কপালে। মায়ের ক্লান্ত ও স্নেহময় চোখে চোখ পড়তেই সুমনের হৃদয়ের গভীরে জমাট বেঁধে থাকা বরফ তরল হয়ে গলতে শুরু করে।
পাশের ঘরে টেবিলের ওপর বন্ধ ল্যাপটপটি পড়ে আছে একখণ্ড মৃত লোহার টুকরোর মতো—তার সমস্ত যান্ত্রিক ক্ষমতা হারিয়ে। জানালার বাইরে ভোরের স্নিগ্ধ আলো ফুটতে শুরু করে, পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয় চারপাশ। এআইয়ের ডিজিটাল দুনিয়া, প্রসেসিং ডেটা এবং শূন্য দশমিক শূন্য দুই সেন্টের এই অমানবিক দৌড় থমকে যায় মানবীয় স্নেহের কাছে। যন্ত্রের জয়রথ থেমে যায় জীবন্ত মানুষের হৃদস্পন্দনের কাছে।
১৬৮ বার পড়া হয়েছে