৯ দিন কিভাবে ছিলেন বেঁচে ফিরে আসা দুই শ্রমিক
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২:৫৩ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে টানেলের ভেতর নয় দিন আটকে থেকেও বেঁচে ছিলেন দুই জলবিদ্যুৎকর্মী। ৪ সেপ্টেম্বর উদ্ধার করা হয় কবির মহার্জন ও সঞ্জয় সাহকে। টানেলের ভেতরে আটকে থাকা বাতাসের একটি স্তরই শেষ পর্যন্ত তাঁদের বেঁচে থাকার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। তাঁদের উদ্ধারের ঘটনা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা অন্য শ্রমিকদের উদ্ধারে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে।
গত ২৬ আগস্ট নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকায় ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানে। লাংটাং লিরুং পর্বতের কাছে হিমবাহ ধসে বিপুল পরিমাণ কাদা ও পানির স্রোত নেমে আসে। এতে উপত্যকার ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব প্রকল্পে প্রায় ৯০০ কর্মী কাজ করছিলেন। দুর্যোগে নেপাল ও পার্শ্ববর্তী তিব্বতে ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত হন এবং অনেকে নিখোঁজ হন।
দুর্যোগের সময় আপার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে আশ্রয় নিয়েছিলেন কবির মহার্জন ও যন্ত্রপাতি বিভাগের ফোরম্যান সঞ্জয় সাহ। তাঁরা টানেলের প্রায় ১৬০ মিটার ভেতরে এমন একটি স্থানে আটকা পড়েন, যেখানে কিছুটা বাতাস জমে ছিল। সেই বাতাসের স্তর তাঁদের নয় দিন টিকে থাকতে সহায়তা করে।
দুর্যোগের দিন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কাজে যাওয়ার আগে স্ত্রী হিরা শোভা মহার্জনকে ফোন করেছিলেন কবির। তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁকে টানেলের ভেতরে যেতে হবে এবং সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে না।
এর প্রায় এক ঘণ্টা পরই হিমবাহ ধসে পড়ে। পাহাড় থেকে নেমে আসা কাদা ও পানির প্রবল স্রোতে আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়।
কাঠমান্ডুতে নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যবেক্ষণ করছিলেন। একের পর এক প্রকল্পের সংকেত মনিটর থেকে অদৃশ্য হতে থাকলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে আপার ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পের কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সে সময় সঞ্জয় সাহ প্রকল্পের পাওয়ার হাউসের নিয়ন্ত্রণকক্ষে কাজ করছিলেন। তিনি এক তলা থেকে আরেক তলায় গিয়ে সহকর্মীদের সতর্ক করার চেষ্টা করেন। তবে বাইরে বেরিয়ে আসা অনেক কর্মীও প্রবল পানির স্রোত থেকে রক্ষা পাননি।
পরে উদ্ধারকারীরা জানতে পারেন, প্রকল্পের একটি জরুরি সিঁড়ি ব্যবহার করা গেলে ভেতরে থাকা আরও অনেক শ্রমিক বের হতে পারতেন। কিন্তু কর্মীদের অনেকে ওই পথ সম্পর্কে জানতেন না।
উদ্ধারকারীরা পরে প্রকল্পের চারটি প্রবেশপথের মধ্যে তুলনামূলক নিরাপদ একটি পথকে অগ্রাধিকার দেন। পথটি কিছুটা উঁচু হওয়ায় বন্যার পানির সরাসরি প্রভাব সেখানে তুলনামূলক কম ছিল। সেই পথের প্রায় ১৬০ মিটার ভেতরেই আটকা ছিলেন কবির ও সঞ্জয়।
নয় দিন তাঁদের কাটাতে হয় সম্পূর্ণ অন্ধকারে, কাদা ও পানির মধ্যে। সঞ্জয় নিজের মনোবল ধরে রাখতে হিন্দু ধর্মীয় প্রার্থনা করতেন। আর কবির টানেলে জমে থাকা কাদামিশ্রিত পানি পান করে বেঁচে ছিলেন বলে তাঁর স্ত্রী জানিয়েছেন।
এদিকে কবিরের স্ত্রী বারবার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো সাড়া পাননি। পরে ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রকল্পের ছবি দেখে তিনি ধরে নিয়েছিলেন, তাঁর স্বামী হয়তো আর বেঁচে নেই। এরপরও তিনি দুই সন্তানকে সাহস জোগাতে থাকেন।
দুর্যোগের পর উদ্ধারকারীরা ধারণা করেন, ধ্বংসস্তূপের বিভিন্ন অংশে বাতাস আটকে থাকতে পারে। তাই কোথায় আগে খনন করা হবে, তা নিয়ে তাঁদের সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বাতাস আটকে থাকার সম্ভাবনা থাকায় আপার ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
তবে উদ্ধারকাজ ছিল অত্যন্ত কঠিন। ধ্বংসস্তূপ ভেজা ও নরম থাকায় সেখানে ভারী যন্ত্রপাতি নেওয়া যাচ্ছিল না। প্রথমে উদ্ধারকারীদের কাজের জন্য স্থিতিশীল জায়গা তৈরি করতে হয়।
দুর্যোগের তিন দিন পর বড় পরিসরে খনন শুরু হয়। টানেলের প্রবেশপথগুলো কাদা, পাথর, কাঠ ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষে বন্ধ হয়ে ছিল। কোনো কোনো জায়গায় ১৫ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ জমে ছিল।
উদ্ধারকারীরা ড্রিলিং, নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধীরে ধীরে পথ তৈরি করতে থাকেন। একপর্যায়ে ওপর থেকে সরু একটি ছিদ্র করে টানেলের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়।
কিন্তু টানা বৃষ্টি উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তোলে। কয়েক দফা বৃষ্টিতে খনন করা অংশ আবার পানি ও ধ্বংসাবশেষে ভরে যায়। প্রায় ছয় দিন পর উদ্ধারকারীরা টানেলের চাপা পড়া প্রবেশপথের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হন। তবে তখনও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না।
উদ্ধারের আগের রাতে উদ্ধারকারীরা কাদা ও ধ্বংসাবশেষের একটি শক্ত স্তরের সামনে আটকে যান। পরে টানেলের কিছুটা ওপরে থাকা একটি প্রাকৃতিক পানিপথ ব্যবহার করে উচ্চচাপের পানি দিয়ে ধ্বংসাবশেষ সরানোর চেষ্টা করা হয়।
এর মধ্যেই আবার বৃষ্টি শুরু হয় এবং ধ্বংসস্তূপের একটি অংশ ধসে পড়ে। এতে কয়েকজন উদ্ধারকারীও কিছু সময়ের জন্য আটকে যান। পরে ধাতব পাত ও তারের কাঠামো ব্যবহার করে উদ্ধারকাজের পথটি শক্ত করা হয়।
দুর্যোগের দশম দিনের ভোর ৪টার দিকে উদ্ধারকারী দল টানেলের ভেতর থেকে সম্ভবত কোনো শব্দ পাওয়ার খবর পায়। উদ্ধারকারীরা বারবার যন্ত্রপাতি বন্ধ করে নীরব হয়ে সেই শব্দ শোনার চেষ্টা করেন। তাঁরা ভেতরে চিৎকার করে জানতে চান, সেখানে কেউ আছেন কি না।
একপর্যায়ে তাঁরা বুঝতে পারেন, শব্দের উৎস মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিটার দূরে। পরে আলো ফেলতেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একটি হাত দেখা যায়।
আরও কয়েক মিটার কাদা সরানোর পর সকাল ৭টার দিকে সেনাসদস্যরা ছোট একটি গর্ত তৈরি করতে সক্ষম হন। তখন ভেতর থেকে শোনা যায়, ‘আমরা এখানে আছি।’
অবশেষে উদ্ধারকারীরা কবির ও সঞ্জয়কে টানেল থেকে বের করে আনেন। দুজনই এতটাই দুর্বল ছিলেন যে নিজেরা দাঁড়াতে পারছিলেন না। সঞ্জয়কে একজন উদ্ধারকারী বহন করে বাইরে নিয়ে আসেন। কবিরকে স্ট্রেচারে করে বের করা হয়।
দুই শ্রমিকের উদ্ধারের খবর শুনে কবিরের দুই ছেলে আনন্দে চিৎকার করে ওঠে—বাবা ফিরে এসেছেন।
হাসপাতালে নেওয়ার পর কবিরের পায়ে গুরুতর সংক্রমিত একটি ক্ষত পাওয়া যায়। চিকিৎসকেরা তাঁর অস্ত্রোপচার করেন। পরে স্ত্রী তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে কবির তাঁকে চিনতে পারেননি। তিনি বিভ্রান্ত হয়ে জানতে চান, তিনি কোথায় আছেন।
তবে স্বামীকে জীবিত ফিরে পাওয়াতেই খুশি হিরা শোভা। তাঁর ভাষায়, কবির যেন নতুন জীবন পেয়েছেন।
নয় দিন ধ্বংসস্তূপের নিচে থেকেও কবির ও সঞ্জয়ের বেঁচে থাকার ঘটনা এখন নেপালের উদ্ধারকাজে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। সোমবার পর্যন্ত প্রায় ১২১ শ্রমিক বিভিন্ন টানেলের ভেতরে আটকে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল। ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে বাতাসের স্তর শনাক্ত করে পরিকল্পিতভাবে উদ্ধার অভিযান চালানোর সম্ভাবনাও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
১৩২ বার পড়া হয়েছে