সিকিমে ভূমিধসে তিস্তার প্রবাহে বাধা, সতর্কতা
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২:৫৯ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ভারতের সিকিমের মাঙ্গান জেলায় ভূমিধসে চিয়াকুং নদীর ওপর মাটি-পাথরের স্তূপ জমে তিস্তা নদীর প্রবাহ আংশিকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে সেখানে প্রাকৃতিক বাঁধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাঁধের পেছনে পানি জমে থাকায় সেটি ভেঙে গেলে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের তিস্তা অববাহিকার বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
শনিবার গভীর রাতে উত্তর সিকিমের নাগা বনাঞ্চলের থেং টানেলসংলগ্ন এলাকায় বড় ধরনের ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে চিয়াকুং নদীতে পড়ে। এতে চিয়াকুংয়ের পাশাপাশি তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহও আংশিকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।
ভূমিধসের ফলে বিপুল পরিমাণ মাটি, কাদা ও বড় পাথর নদীতে জমে একটি প্রাকৃতিক বাঁধের মতো তৈরি হয়েছে। এর পেছনে পানি জমতে শুরু করায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছে প্রশাসন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিস্তার পানিপ্রবাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। চিয়াকুং নদীতেও ক্ষীণ স্রোতে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। সঙ্কলং ও ফিদাং এলাকায় তিস্তার পানির স্তরও আপাতত স্বাভাবিক রয়েছে।
তবে ভূমিধসের কারণে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে ঠিক কত পরিমাণ পানি জমেছে এবং নদীর কতটা অংশ অবরুদ্ধ হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নতুন করে ভূমিধস হলে অথবা ভারী বৃষ্টিতে জমে থাকা পানি হঠাৎ বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলে নিচের দিকে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে প্রশাসন।
মাঙ্গান ও চুংথাং প্রশাসন যৌথভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ঘটনাস্থলে চুংথাং থানা ও থেং চেকপোস্টের পুলিশ সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। মাঙ্গানের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের নদীর তীর থেকে দূরে থাকতে এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সিকিমের স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথোরিটি এবং স্টেট ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টারের পক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রণকক্ষও চালু করা হয়েছে।
ভূমিধসের প্রভাব পড়েছে থেং টানেলের বিপরীত দিকে নাগা বনাঞ্চলের নাগা-তোসা সড়কেও। নতুন কাটা পাহাড়ি সড়কের একটি বড় অংশ ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সেখানেও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে তিস্তার পানির স্তর বাড়ায় পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পং, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলার তিস্তা অববাহিকার বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বাসুসুবা, গজলডোবা, বাগরাকোটসহ তিস্তাসংলগ্ন এলাকায় মাইকিং করে স্থানীয়দের সতর্ক করা হচ্ছে। নদীর তীর এড়িয়ে চলার পাশাপাশি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঝুলন্ত সেতু ও নদীসংলগ্ন রাস্তা ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
২০২৩ সালের বন্যার স্মৃতি
সিকিমে ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি নতুন নয়। ২০২৩ সালে আকস্মিক বন্যায় সিকিমের চুংথাং এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সে সময় তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যার পানিতে সেতু ও বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সিকিম ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে ভারী বৃষ্টিতে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন নদী ও পাহাড়ি এলাকায়ও ভূমিধস ও বন্যার ঘটনা ঘটে। জাতীয় সড়কে ধস, সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং পর্যটকদের আটকে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
এবারের ঘটনায় তাই সিকিমের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের তিস্তা অববাহিকাতেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টির সঙ্গে ভূমিধসের ঘটনা ঘটলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সেই বাধা হঠাৎ ভেঙে গেলে নিচের দিকে দ্রুত পানি ও ভূমিধসের ধ্বংসাবশেষ নেমে আসার ঝুঁকি থাকে।
তিস্তা নদী সিকিম থেকে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ফলে উজানে বড় ধরনের আকস্মিক পানি প্রবাহ তৈরি হলে এর প্রভাব নিম্নাঞ্চলেও পড়তে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্দিষ্ট করে বলার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা একই সঙ্গে সিকিমের হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদগুলোর ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করছেন। হিমবাহ গলে অতিরিক্ত পানি জমে এসব হ্রদ তৈরি হয়। কোনো কারণে হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে নিচের দিকে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। ২০২৩ সালের বন্যার পর সিকিমে এ ধরনের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছিল।
বর্তমানে প্রশাসনের প্রধান নজর ভূমিধসের কারণে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক বাধা এবং এর পেছনে জমে থাকা পানির পরিস্থিতির দিকে। পরিস্থিতি পরিবর্তন হলে তিস্তা অববাহিকার নিচের দিকের এলাকাগুলোতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
১৩০ বার পড়া হয়েছে