আঞ্চলিক কূটনীতিতে প্রকৌশল ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তে জোর দিচ্ছে বুয়েট
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬ ৬:২৪ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ সহযোগিতা এবং দেশের সাইবার নিরাপত্তা শিল্পের বিকাশ—কৌশলগত এই তিন খাতে বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খুঁজতে নতুন একটি কাঠামো নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। ‘ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোম্যাসি’ নামের এই উদ্যোগে শুধু সমস্যা চিহ্নিত নয়, বরং প্রয়োজনীয় তথ্য, সংশ্লিষ্ট পক্ষ, সম্ভাব্য পদক্ষেপ ও বাস্তবায়নের সময়সীমাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জটিল জাতীয় ও আঞ্চলিক সমস্যাগুলো সমাধানে প্রকৌশল জ্ঞান, তথ্য-উপাত্ত ও কূটনৈতিক সক্ষমতাকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। এ লক্ষ্যে বুয়েটের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (সিইআরএম) এবং যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে তিন দিনের ‘ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোম্যাসি ওয়ার্কশপ ২০২৬’।
২৫ থেকে ২৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত এ কর্মশালায় সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, নাগরিক সমাজ, উন্নয়ন সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা অংশ নেন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের প্রাথমিক সহায়তায় আয়োজিত কর্মশালায় গঙ্গার পানি, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা এবং সাইবার নিরাপত্তা শিল্প—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বাস্তব কর্মপথ তৈরির চেষ্টা করা হয়।
আয়োজকদের মতে, ‘ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোম্যাসি’র মূল লক্ষ্য কেবল সমস্যা নিয়ে আলোচনা বা সুপারিশ তৈরি করা নয়। কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য, কার সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সক্ষমতা ও স্বার্থ, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাব্য ফলাফল—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছানোই এ কাঠামোর উদ্দেশ্য।
গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত পানি কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কর্মশালায় এ বিষয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য তথ্য ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের পানির প্রয়োজন ও বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে ন্যূনতম নিশ্চিত পানি প্রবাহের একটি কাঠামো তৈরির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পানি প্রবাহ বাড়ানোর বা পানি অগমেন্টেশনের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হয়েছে।
তবে এ ধরনের উদ্যোগের আগে বাংলাদেশের পানির প্রকৃত চাহিদা নির্ধারণ জরুরি। কৃষি, শিল্প, পরিবেশ ও জনজীবনের জন্য কত পানি প্রয়োজন, নদীর প্রবাহ কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ফারাক্কা পয়েন্টে বাংলাদেশের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় প্রবাহ কত—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন রয়েছে।
এ কারণে আগামী ৯০ দিনের কর্মসূচিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও গবেষণায় থাকা তথ্য একত্র করা এবং সম্ভাব্য আলোচনায় ভারতের অবস্থান কী হতে পারে, তা বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার টেবিলে রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি পরিমাপযোগ্য তথ্য ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি থাকলে বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়তে পারে।
আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বিদ্যমান নির্ভরতার বাইরে নতুন সুযোগ খোঁজার কথা বলা হয়েছে কর্মশালায়। দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতায় উল্লেখযোগ্যভাবে যুক্ত। তবে একটি মাত্র প্রবেশপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভবিষ্যতে বিকল্প সংযোগ তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে পূর্বাঞ্চলীয় সংযোগ এবং বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ সহযোগিতার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ জন্য জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদা ও তথ্য আদান-প্রদানের ওপর সমীক্ষা, আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গ্রিড কোড সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি চুক্তি করার বিষয়ে বাংলাদেশের আইনগত ও ক্রয়সংক্রান্ত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
দেশে সাইবার নিরাপত্তা খাতে স্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও স্টার্টআপের সম্ভাবনা থাকলেও পণ্যের মান ও কার্যকারিতা নিয়ে আস্থার ঘাটতি রয়েছে বলে কর্মশালায় উঠে এসেছে।
এ সমস্যা কাটাতে ব্যাংক, সাইবার নিরাপত্তা স্টার্টআপ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সহযোগিতামূলক একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় সাইবার নিরাপত্তা পণ্যের মান ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য মূল্যায়ন কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বড় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থাকে ‘অ্যাঙ্কর পার্টনার’ হিসেবে যুক্ত করে স্থানীয় সাইবার নিরাপত্তা প্রযুক্তির জন্য বাজার তৈরির বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশের প্রয়োজন অনুযায়ী দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কর্মশালায় জটিল সমস্যা সমাধানে ছয় ধাপের একটি কাঠামো অনুসরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সমস্যা নির্ণয়, পরিস্থিতি ও সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য পথ নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ও উপকরণ চিহ্নিত করা, ফলাফল পরিমাপ এবং বাস্তবায়নযোগ্যতা নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া একই তথ্যকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার কারণ, পরিবর্তন আনার সবচেয়ে কার্যকর জায়গা এবং প্রচলিত কাঠামোর বাইরে নতুন সমাধান তৈরির উপায়—এই তিনটি প্রশ্নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বুয়েটের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এবারের কর্মশালা ছিল একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বুয়েটের নেতৃত্বে একটি স্থায়ী ‘ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোম্যাসি’ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ, প্রয়োগভিত্তিক গবেষণা, নিয়মিত কর্মশালা এবং সরকারি ও শিল্পখাতকে নীতিগত ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে এ উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে কর্মশালায় তৈরি প্রস্তাবগুলো বাস্তব নীতি ও কার্যক্রমে কতটা রূপ নেয় তার ওপর। আগামী ৯০ দিনের কর্মসূচিকে সেই বাস্তবায়নের প্রথম পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পানি, বিদ্যুৎ ও সাইবার নিরাপত্তার মতো কৌশলগত খাতে এসব উদ্যোগ যদি পরিমাপযোগ্য ফলাফল তৈরি করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে প্রকৌশল ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি নতুন মডেল হিসেবে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোম্যাসি’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
১৩৫ বার পড়া হয়েছে