ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার জার্নি
মতভেদ পেরিয়ে চুয়াডাঙ্গার উচ্চশিক্ষার স্বপ্নের সূচনা
বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬ ৫:১৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
২০১০ সালের কয়েকটি ধারাবাহিক বৈঠক, দীর্ঘ দেড় মাসের মতভেদ এবং শেষ পর্যন্ত ঐকমত্য—এসবের মধ্য দিয়েই চুয়াডাঙ্গায় ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তব রূপ নিতে শুরু করে। সেই সময়ের বৈঠক, জমি নির্বাচন, উদ্যোক্তাদের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক-সামাজিক সমন্বয়ের অজানা ইতিহাস তুলে ধরেছেন ফারূক মাহমূদ।
সময়টা ২০১০। কোনো কোনো দিন ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে আলাদা করে লেখা থাকে না। তবু ভবিষ্যতের অনেক অধ্যায়ের বীজ রোপিত হয় সেদিনই।
চুয়াডাঙ্গা সরকারি এতিমখানা রোডে অবস্থিত ড্রিমল্যান্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজে এমনই এক দিনের সাক্ষী হয়েছিল কয়েকটি ধারাবাহিক বৈঠক। যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জেলার শিক্ষা-ভবিষ্যৎ।
২০১০ সালে সেই দিনের প্রথম বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় আট কবরের তিনতলা ভবনে পিকচার গ্যালারি নির্মাণকে কেন্দ্র করে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান হক জোয়ার্দার ছেলুন, পৌর মেয়র রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দার টোটোন, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম মালিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা আশু বাঙালী এবং ড্রিমল্যান্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ।
প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টার ওই বৈঠকে আট কবর স্মৃতি কমপ্লেক্সের জন্য শতাধিক ছবি বাছাই, ক্যাপশন নির্ধারণ এবং গ্যালারি সাজানোর পরবর্তী কার্যক্রম নিয়েই আলোচনা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোনো বিষয়ে সেখানে আলোচনা হয়নি।
সেদিন সংসদ সদস্যের সফরসঙ্গী ও অনুসারীদের মধ্যে আলিম উদ্দীন লষ্করও উপস্থিত ছিলেন। তবে বৈঠকের বিষয়বস্তুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না হওয়ায় আলিম উদ্দীন লষ্করকে স্কুল ক্যাম্পাসের ভেতরে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ফলে পরদিন সকালে আলিম উদ্দীন লষ্কর, আব্দুর রাজ্জাক, আলী ইকবাল জোয়ার্দার বাবু ও সাংবাদিক ইসলাম রাকিব ড্রিমল্যান্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়ে ফারুক আহমেদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে মিলিত হন।
সেখানে উঠে আসে চুয়াডাঙ্গায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগে সংসদ সদস্যের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হলেও উদ্যোক্তাদের মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়।
একপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছিল, অন্য পক্ষ চাইছিল একটি বেসরকারি পলিটেকনিক বা কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
এই বিভক্ত অবস্থানের কারণে সংসদ সদস্য জনাব সোলায়মান হক জোয়ার্দার ছেলুনও তাঁদের সঙ্গে নতুন কোনো বৈঠকে বসতে সম্মত হননি। তাঁর অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট, “আগে সবাই একমত হও, তারপর আলোচনা হবে।” এভাবেই প্রায় দেড় মাস বদ্ধ সময় অতিবাহিত হয়।
পরিস্থিতির খুঁটিনাটি জানার জন্য ফারুক আহমেদ যোগাযোগ করেন ওই দলের অন্য একজন সদস্য মনিরুল ইসলাম বাবুলের সঙ্গে। একই দিনে ঘণ্টাখানেকের ব্যবধানে পরবর্তী বৈঠকের জন্য বাবুলও স্কুলে আসেন এবং তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেন।
জনাব বাবুলের মতে, চুয়াডাঙ্গায় তাঁর পারিবারিক উদ্যোগে একটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন; পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাও অব্যাহত থাকা উচিত।
অর্থাৎ লক্ষ্য ছিল শিক্ষা বিস্তার। কিন্তু অগ্রাধিকারের প্রশ্নে ছিল সুস্পষ্ট ভিন্নতা। জনাব বাবুল আগে চান কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ফারুক আহমেদ সন্ধ্যায় একান্ত বৈঠকের জন্য ফোন করেন সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব সোলায়মান হক জোয়ার্দার ছেলুনকে। বৈঠকের সময়ও মেলে সন্ধ্যায়। শুরু হয় একান্ত আলোচনা।
সেখানে আলিম উদ্দীন লষ্কর গং এবং মনিরুল ইসলাম বাবুল—এই দুই পক্ষের মতামত নিয়ে আলোচনা হয়। সেই বৈঠকে চুয়াডাঙ্গায় বিশ্ববিদ্যালয় করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তখন ফারুক আহমেদ জনাব ছেলুনকে অবগত করেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সাড়ে পাঁচ বিঘা জমি বায়না করা হয়েছে। এই জমির দাম ৭৬ লাখ টাকা ধার্য করা হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এই জমির মালিক ড. আব্দুস সবুর (যিনি বর্তমানে সচিব পদমর্যাদায় পাট ও বস্ত্র অধিদপ্তরের মহাপরিচালক) তিন লাখ টাকা কমিয়ে ৭৩ লাখ টাকা ধার্য করেন। জমিটি কেনার জন্য সহযোগিতা করেন এতিমখানা রোডে নোবেল ভিলার মালিক এবং ন্যাচারাল গ্রুপের পরিচালক জনাব আব্দুল কাদের। তিনি বনানীর অফিস থেকে ফারুক আহমেদকে নিয়ে ড. আব্দুস সবুরের গুলশানের বাসায় নিয়ে উভয়পক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির দরদাম চূড়ান্ত করেন। দলিললেখক (মৌরি) নিজামের জামাই কবিরউদ্দিন ৮ লাখ টাকা নগদ উসুলে জমির বায়নানামা সম্পন্ন করেন।
এই বিষয়টি জনাব সোলায়মান হক জোয়ার্দার ছেলুনকে জানানো হলে তিনি আলিম লষ্কর, আব্দুর রাজ্জাক, অধ্যাপক আব্দুল মোত্তালেব, অধ্যাপক হারুন অর রশিদকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে নিতে বলেন।
মিটিং শেষে রাত ৯টার দিকে চুয়াডাঙ্গা বড় বাজারে আলী ইকবাল জোয়ার্দার বাবুর দোকানে সবাইকে আসতে বলেন ফারুক আহমেদ। সেখানে যথারীতি হাজির হন আলিম উদ্দীন লষ্কর, আব্দুর রাজ্জাক, আলী ইকবাল জোয়ার্দার বাবু, ইসলাম রাকিব এবং ফারুক আহমেদ।
সংসদ সদস্যের বার্তা সবাইকে পৌঁছে দেন ফারুক আহমেদ। প্রায় দেড় মাসের জটলা এবং মতভেদ দূর করে শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম।
কদিন পরে ফারুক আহমেদ সাতগাড়ির বায়না করা জমির টাকা ফেরত নেন জনাব আব্দুল কাদেরের কাছ থেকে।
যেহেতু জফরপুর এলাকায় জনাব আব্দুর রাজ্জাক ১৫ বিঘা ৬ শতক জমি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বাকিতে রেজিস্ট্রেশন করে দিতে সম্মত হন; তাই সংসদ সদস্য জনাব সোলায়মান হক জোয়ার্দার ছেলুনের পরামর্শে ড. আব্দুস সবুরের জমি বায়না বাবদ প্রদত্ত আট লাখ টাকা ফেরত দেন এবং বিডিআর ক্যাম্পের বিপরীতে ট্রাস্টের জমিতে বিশ্ববিদ্যালয় করার জন্য প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জনাব সোলায়মান হক জোয়ার্দার ছেলুনের বাসায় সেদিনের সন্ধ্যাটা কেবল একটি বৈঠকের বিষয় ছিল না; ছিল একটি জেলার উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে একই সুতায় গাঁথার প্রত্যাশা।
কখনো কখনো মনে হয়, ইতিহাসের বহু বাঁক যেমন নীরবে তৈরি হয়, তেমনি চুয়াডাঙ্গার শিক্ষা-অভিযাত্রার সেই অধ্যায়ও শুরু হয়েছিল তারুণ্যের শক্তি, প্রবীণের ধীশক্তির সমন্বয় এবং সমঝোতার প্রত্যাশাকে কেন্দ্র করে।
১৫২ বার পড়া হয়েছে