কুষ্টিয়ায় ওয়ালিউল বারী চৌধুরী স্মরণসভা
‘মফস্বল সাংবাদিকতার মহীরুহ ছিলেন তিনি’
রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬ ৭:০১ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
কুষ্টিয়ার প্রথিতযশা সাংবাদিক, সংগঠক ও সমাজসেবক ওয়ালিউল বারী চৌধুরীর স্মরণে কুষ্টিয়ায় স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বক্তারা বলেছেন, নির্ভীক ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজসেবা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অবদান কুষ্টিয়ার মানুষের কাছে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁরা ওয়ালিউল বারী চৌধুরীর জীবন ও কর্ম সংরক্ষণে তাঁর নামে একটি স্থাপনা বা পাবলিক লাইব্রেরি নির্মাণ এবং তাঁকে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রামাণ্যচিত্র তৈরির প্রস্তাব দেন।
কুষ্টিয়া শহরের দিশা কনফারেন্স হলে গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় এ স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। আন্দোলনের বাজার ডিজিটালের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, চিকিৎসক, শিক্ষক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াত করেন দৈনিক নয়া দিগন্তের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি আ ফ ম নুরুল কাদের। পরে প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক তৌহিদী হাসানের সঞ্চালনায় স্মরণসভা শুরু হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন দৈনিক আন্দোলনের বাজার পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক আনিসুজ্জামান ডাবলু।
স্মরণসভায় বক্তারা ওয়ালিউল বারী চৌধুরীর সাংবাদিকতা, সামাজিক কর্মকাণ্ড, সাংগঠনিক ভূমিকা এবং কুষ্টিয়ার সংবাদপত্রের ইতিহাসে তাঁর অবদান নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন।
দৈনিক কালের কণ্ঠের স্টাফ রিপোর্টার তারিকুল হক তারিক বলেন, কুষ্টিয়ায় নির্ভীক সাংবাদিকতার চর্চায় ওয়ালিউল বারী চৌধুরীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সাংবাদিকতা শেখার সময় তাঁর কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা নিজের পেশাজীবনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলেও স্মৃতিচারণ করেন তিনি।
মাওলানা আবুল কাশেম বলেন, মফস্বল সাংবাদিকতায় ওয়ালিউল বারী চৌধুরী ছিলেন অনন্য। তাঁর সাংবাদিকতা ছিল নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ। দৈনিক কুষ্টিয়ার সহকারী সম্পাদক আলী আহসান মুজাহিদ বলেন, তাঁর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ও তাঁর কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা জীবনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।
দৈনিক কুষ্টিয়ার কাগজ পত্রিকার সম্পাদক নুর-আলম দুলাল বলেন, তাঁর সাংবাদিকতার হাতেখড়ি ওয়ালিউল বারী চৌধুরীর কাছেই। তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত বিভিন্ন স্মৃতিও তুলে ধরেন তিনি।
কে.জি. মোস্তফা বলেন, সাংবাদিকতার পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডেও ওয়ালিউল বারী চৌধুরীর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। কুষ্টিয়ার উন্নয়ন ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব তৈরিতে তাঁর ভূমিকা ছিল।
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রেজাউল ইসলাম বলেন, সমাজসেবায় ওয়ালিউল বারী চৌধুরী মানুষের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার প্রত্যাশার চেয়ে কিছু দেওয়ার মানসিকতাকে গুরুত্ব দিতেন। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ এবং কুষ্টিয়ায় তাঁর নামে একটি স্থাপনা তৈরির প্রস্তাব দেন তিনি।
কুষ্টিয়ার মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাজী রফিকুর রহমান বলেন, ওয়ালিউল বারী চৌধুরী ছিলেন তাঁর প্রতিবেশী। তাঁর হাত ধরেই তিনি এপেক্স ক্লাবে যুক্ত হন। তিনি বলেন, ওয়ালিউল বারী চৌধুরী ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর কাছ থেকে জীবনে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে।
এপেক্স ক্লাব কুষ্টিয়ার আজীবন সদস্য প্রকৌশলী আতিকুর রশিদ বলেন, কুষ্টিয়ার বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওয়ালিউল বারী চৌধুরীর সম্পৃক্ততা ছিল। মানুষের প্রয়োজনে তিনি সবসময় এগিয়ে আসতেন।
কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মুকুল খসরু বলেন, বাইরে থেকে ওয়ালিউল বারী চৌধুরীকে কঠোর মনে হলেও ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন নরম হৃদয়ের মানুষ। তাঁর সঙ্গে কাটানো বিভিন্ন সময়ের স্মৃতিও তুলে ধরেন তিনি।
পরিবেশবিদ খলিলুর রহমান মজু বলেন, তাঁর সময়ে ইস্পাত পত্রিকার ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা ছিল। তাঁর মতে, ওয়ালিউল বারী চৌধুরীর মৃত্যুতে কুষ্টিয়া একজন অভিভাবককে হারিয়েছে।
কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক ও ব্যবসায়ী এসএম কাদেরী শাকিল বলেন, ব্যবসায়ী মহলে তাঁর পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে ওয়ালিউল বারী চৌধুরীর ভূমিকা ছিল। বিপদে-আপদে তিনি মানুষের পাশে দাঁড়াতেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন কনসালট্যান্ট ও সমাজসেবক ডা. এ.এস.এম. মুসা কবির বলেন, ওয়ালিউল বারী চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ মানুষ। তাঁর নামে কুষ্টিয়ায় একটি পাবলিক লাইব্রেরি নির্মাণের প্রস্তাব দেন তিনি।
রাজনীতিবিদ ও কুষ্টিয়া পৌরসভার সাবেক কমিশনার নাফিজ আহমেদ খান টিটু বলেন, ১৯৮৬ সাল থেকে ওয়ালিউল বারী চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর পরিচয়। একজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর মতো মানুষ খুব কমই দেখেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। সাংবাদিকদের তাঁর আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান নাফিজ আহমেদ খান।
দিশার নির্বাহী পরিচালক রবিউল ইসলাম বলেন, দৃঢ়তা, আপসহীনতা ও সংকল্পের দিক থেকে ওয়ালিউল বারী চৌধুরী ছিলেন অনন্য। তাঁর স্মৃতি ধরে রাখতে তাঁর আদর্শ ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ড অনুসরণ করা প্রয়োজন।
বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও কুষ্টিয়া কোর্টের সাবেক জিপি অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান মাসুম বলেন, ওয়ালিউল বারী চৌধুরী এপেক্স ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হওয়া এবং ১৯৭১ সালে কলম সৈনিক হিসেবে ভূমিকা রাখার কথাও স্মরণ করেন তিনি। তাঁর মতে, ওয়ালিউল বারী চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশমুখী চিন্তা-চেতনার একজন মানুষ।
বোধোদয় কুষ্টিয়ার সভাপতি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব লালিম হক বলেন, সমাজসেবায় ওয়ালিউল বারী চৌধুরী নীরবে অনেক অবদান রেখে গেছেন। তাঁর কর্ম ও অবদান নিয়ে আরও বেশি চর্চা হওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ওয়ালিউল বারী চৌধুরীর ভাই ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী বলেন, কুষ্টিয়ায় মফস্বল সাংবাদিকতার মহীরুহ ছিলেন তাঁর ভাই। সাংবাদিক সমাজের দায়িত্ব হলো কাঙাল হরিনাথ থেকে ওয়ালিউল বারী চৌধুরী পর্যন্ত সাংবাদিকতার ধারাবাহিক ইতিহাস রচনা ও সংরক্ষণ করা।
তিনি বলেন, ষাটের দশকের আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সময় কুষ্টিয়া কলেজের নেতাদের আশ্রয় দেওয়ার মতো সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন ওয়ালিউল বারী চৌধুরী। ভীতি বা প্রলোভন কোনো কিছুই তাঁকে তাঁর অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি।
দৈনিক বাংলাদেশ বার্তা পত্রিকার সম্পাদক আব্দুর রশিদ চৌধুরী তাঁকে কিংবদন্তি সাংবাদিক হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যক্তিগতভাবে যাঁর সঙ্গে ওয়ালিউল বারী চৌধুরীর একবার পরিচয় হয়েছে, তাঁর সঙ্গে তিনি সহজেই আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারতেন। সাংবাদিকদের তাঁর আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান তিনি।
ওয়ালিউল বারী চৌধুরীর মেয়ে ওয়ালিনা চৌধুরী বলেন, তাঁর বাবা ছিলেন রাশভারী ও সময়নিষ্ঠ মানুষ। বাবার নাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অ্যাসাইনমেন্টে দেখে আনন্দ ও গর্ব অনুভব করার স্মৃতিও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মেয়ে হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় সম্মানিত বোধ করেন বলেও জানান ওয়ালিনা চৌধুরী।
স্মরণসভায় বক্তারা বলেন, সাংবাদিকতা, সমাজসেবা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ওয়ালিউল বারী চৌধুরীর অবদান কুষ্টিয়ার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন ও কর্ম আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে তাঁর নামে একটি স্থাপনা বা লাইব্রেরি নির্মাণ এবং একটি পূর্ণাঙ্গ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ইস্পাত পত্রিকার সাংবাদিক বকুল চৌধুরী, সংবাদের জেলা প্রতিনিধি মিজানুর রহমান লাকী, বাংলাভিশনের জেলা প্রতিনিধি হাসান আলীসহ অনেকে।
১২৭ বার পড়া হয়েছে