নদীভাঙনে বিলীন ঘর-জমি, প্রধানমন্ত্রীর কাছে টেকসই বাঁধের আকুতি
সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬ ৫:১৯ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বরিশালের বাবুগঞ্জ, মুলাদী, হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ ও সদর উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে বছরের পর বছর ধরে চলা নদীভাঙনে হাজারো মানুষ বসতভিটা, আবাদি জমি ও জীবিকার উৎস হারাচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে টেকসই নদীশাসন ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ছাড়া এই সংকট থেকে মুক্তির কোনো পথ নেই। প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল সফরকে কেন্দ্র করে নতুন করে সমাধানের আশা দেখছেন নদীপাড়ের মানুষ।
"প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হলে দুই হাত ধরে শুধু একটাই কথা বলতাম—নদীভাঙন বন্ধ করুন, আমাদের বাঁচান। বাপ-দাদার জমি গেছে, কবরস্থান গেছে, এখন শেষ সম্বল বসতভিটাও নদীতে চলে যাবে। তখন আমরা কোথায় যাব?"- এভাবেই নিজের দীর্ঘদিনের কষ্টের কথা তুলে ধরেন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার লোহালিয়া গ্রামের বাসিন্দা আজাহার মোল্লা। আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে তাঁর পরিবারের প্রায় সব কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। হারিয়ে গেছে পারিবারিক কবরস্থানও। এখন শেষ আশ্রয়টুকুও ঝুঁকির মুখে।
একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানান পাশের সিংহেরকাঠী গ্রামের কামাল সরদার। তাঁর ভাষ্য, নদীভাঙনের কারণে পাঁচবার বাড়ি সরাতে হয়েছে। বর্তমানে নতুন করে বসতি গড়ার মতো জায়গাও আর অবশিষ্ট নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাবুগঞ্জ উপজেলার সিংহেরকাঠী, লোহালিয়া ও রফিয়াদি গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা গত কয়েক বছরে ভয়াবহ নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা ভাঙনে তিন কিলোমিটারজুড়ে এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং শত শত পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। অনেক পরিবার এখনও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। বর্ষা এলেই নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গত এক সপ্তাহের টানা বৃষ্টি ও নিম্নচাপের প্রভাবে নদীর পানি কমতে শুরু করলে কয়েকটি স্থানে আবারও ভাঙন দেখা দিয়েছে, যা উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জামাল হোসেন পুতুল বলেন, গত প্রায় এক দশক ধরে আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে মীরগঞ্জ ফেরিঘাট থেকে ছোট মীরগঞ্জ হয়ে ময়দানেরহাট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা ঝুঁকিতে রয়েছে। বিষয়টি বহুবার পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের কাছে তুলে ধরা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। মাঝে মাঝে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয়নি বলে তাঁর দাবি।
তিনি জানান, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অন্তত ১৭টি পরিবারকে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পে পুনর্বাসন করা হয়েছে। তবে এখনও শত শত পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের অপেক্ষায় রয়েছে।
বরিশাল অঞ্চলের চারপাশ দিয়ে প্রবাহিত কীর্তনখোলা, পদ্মা, মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ, তেঁতুলিয়া, সন্ধ্যা, কালাবদরসহ বিভিন্ন নদীর অব্যাহত ভাঙনে প্রতি বছর জেলার ভৌগোলিক চিত্র বদলে যাচ্ছে। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের প্রায় ১০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পরিবেশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন, নদীতীর কেটে মাটি নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসনের অভাব নদীভাঙনের অন্যতম কারণ।
মেহেন্দিগঞ্জ ও হিজলা উপজেলায় পদ্মা, মেঘনা, কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙনে প্রতিবছর নতুন নতুন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একইভাবে মুলাদী ও বাবুগঞ্জে সন্ধ্যা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। বাবুগঞ্জের কেদারপুর, চাঁদপাশা, দেহেরগতি, রহমতপুর ও জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
অন্যদিকে কীর্তনখোলা নদীর ভাঙনে বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া ও শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চরবাড়িয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা কাইউম হোসেন বলেন, নদীভাঙনে তিনি তিনবার বসতবাড়ি হারিয়েছেন। বর্তমানে যে জায়গায় বসবাস করছেন, সেটিও ঝুঁকিতে রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের বরিশাল বিভাগীয় আহ্বায়ক রফিকুল আলম বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিবছর বরিশালে ব্যাপক নদীভাঙন হচ্ছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য কয়েকটি বড় প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত বাস্তবায়ন শুরু হবে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল সফরকে কেন্দ্র করে নদীভাঙনকবলিত জনপদের মানুষের প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর বাসিন্দারা আড়িয়াল খাঁ, মেঘনা, কীর্তনখোলা ও সন্ধ্যা নদীর তীর রক্ষায় দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের আশা, এই সফরের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের দীর্ঘদিনের নদীভাঙন সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের ঘোষণা আসবে।
১২৩ বার পড়া হয়েছে